সজল প্রতি সকালে তার ছেলে সূর্য কে ঘুম থেকে উঠানোর পর একবার কপালে একটা চুমু খায় আর বলে “তোর মা বেঁচে থাকলে ঠিক এভাবে প্রতি সকালে তোকে চুমু খেত”। সূর্য সজলের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। কারন তার ভালবাসার একমাত্র চিহ্ন সূর্য।
আজকের সকাল টা অবশ্য সূর্যের জন্য স্পেশাল। কারন আজ তার জন্মদিন। আজকে সূর্য ৫ বছর পূর্ণ করল। সূর্যের জন্মদিন টা সজল আর ৫ জনের মত খুব ঘটা করে পালন করেনা। এর কারন অবশ্য সূর্যের কাছে জানা নেই। সূর্য তাতে তেমন একটা নাখোশ ও না। কিন্তু কেন জানি আজ সূর্যের খুব জানতে ইচ্ছে করেছে কিভাবে সে তার মাকে হারিয়েছে। হয়তো এতদিন সূর্যের ব্যাপারটা বুঝার বয়স হয়নি তাই জিজ্ঞেস করেনি।
-বাবা জন্মদিনে একটা গিফট চাইবো, দিবা?
-তোর জন্মদিনে তুই গিফট চেয়েছিস আর আমি দেয়নি এরকম কখনো হয়েছে?
-না বাবা আজকের টা একটু ভিন্ন তাই। দিবা? প্রমিজ করে বল?
-আচ্ছা বল প্রমিজ।
-বাবা আমার মাকে কেমন করে হারিয়েছি আমাকে বলবে একটু?
সজলের মাথায় বাজ পড়ে। সূর্য কোনদিন এ প্রশ্ন করেনি। কিন্তু আজকে হঠাৎ কেন?
হয়তো বড় হচ্ছে। তাই তারও জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু একদিন না একদিন সূর্য জানবে। তাই নাহয় আজকেই জানুক।
৬ বছর আগেঃ
সজল আর অহনার পরিচয় তাদের এক কমন ফ্রেন্ড এর মাধ্যমে। কোন এক গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে টিপিক্যাল বাঙ্গালিয়ানা কায়দায় তাদের চোখাচোখি হচ্ছিল। পুরো প্রোগ্রাম ধরে ঘুরে ঘুরে দুজনেরই বারবার চোখ পড়ছিল। সজলের কাছে ব্যাপারটা ‘লাভ এট ফার্স্ট সাইট’ টাইপের। তাই সে সুযোগ খুঁজছিল কিভাবে তার সাথে কথা বলা যায়। অহনাকে কোন কিছু বুঝতে দেয়ার আগেই সজল তার কাছে গিয়ে বলল-
-ওয়ান্না ডান্স ওয়িথ মি?
‘একে তো নাচুনি বুড়ি, তার উপর ঢোলের বারি’। অহনা কেন জানি চাচ্ছিল সজল কাছে আসুক আর তার সাথে কথা বলুক। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। তাই অহনাও দেরি করল না। হাত ধরে নেচেই ফেলল।
একসময় তাদের বন্ধু সুমন এসে তাদের পরিচয় করিয়ে দিল। পরিচয় থেকে ভাল লাগা। আর ভাল লাগা থেকে প্রেম ভালবাসা। খুব ভাল ভাবেই দুজনের প্রেম চলছিল। তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। পড়ালেখা দুজনেরই প্রায় শেষ শেষ অবস্থা। তারা বিয়ে করবে। তাদের একটা সংসার হবে। তাদের ঘর আলো করে ছোট্ট ছোট্ট পিচ্চি আসবে ইত্যাদি। এত সব স্বপ্নের মাঝে তারা হারিয়ে যেত অন্য এক ভালবাসার জগতে। একদিন এরকম এক মুহূর্তে তারা দুজনেই একটা ভুল করে বসে।
ঠিক এক দেড় মাস পর অহনা খেয়াল করে তার মধ্যে একটা অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। বিচলিত হয়ে পড়ে অহনা। কি করবে সে? কিছু করার আগেই তো সজলকে বলা উচিত। কিন্তু সজল যদি বিশ্বাস না করে? এরকম ক্ষেত্রে তো তাই হয়ে থাকে। এরকম দুয়েকটা প্রমান ও তার কাছে আছে। কিন্তু সজল তো ওরকম না। সে অহনাকে ভালবাসে। অনেক ভালবাসে। অহনা সব খুলে বলে সজলকে। দুজনে মিলে বেশ কিছু টেস্টের পরে নিশ্চিত হয় হ্যাঁ অহনা সজলের বাচ্চার মা হতে চলেছে।
-এ বাচ্চা আমি রাখবনা।
-অহনা, তুমি এসব কি বলছ?
-যার অস্তিত্ব পৃথিবীর কেউ মেনে নিবে না, সমাজ স্বীকৃতি দিবে না তা আমি কেমন করে রাখি বল সজল?
-আই ডোন্ট কেয়ার আবউট সমাজ।
-কিন্তু লাঞ্ছনা গঞ্জনা সব তো আমাকেই সহ্য করতে হবে।
কিন্তু সজলের মুখ দেখে অহনা কোন মতেই ভরসা পাচ্ছে না। কারন এই অবস্থায় সে যে পরিমান বিচলিত, সজলের চোখে মুখে তার ছিটেফুটাও নেই।
-অহনা, ক্লোজ ইউর আইস।
-কেন?
-কর না প্লিজ।
অহনা চোখ বন্ধ করে খুলতেই দেখল সজল তার নি’ডাউন করে বলছে-
-ওয়িল ইউ মেরি মি?
অহনার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল। ভালবাসার মানুষকে সে এই মুহূর্তে এভাবে কাছে পাবে সে ভাবতেই পারেনি। অহনার চোখ মুখ দেখেই সজল তার অনামিকায় ছোট্ট একটা আংটি পড়িয়ে দিল। কিছু বন্ধুর সহযোগিতায় তারা বিয়েও করে ফেলল। কিন্তু ফলাফল তাদের আগেই জানা ছিল। তাদের কারোরই পরিবার তাদের বিয়ে মেনে নিল না। দুজনে মিলেই ছোট্ট একটা বাসা নিল। দুজনেরই ছোট ছোট আয় পাশাপাশি সজলের পার্ট টাইম ইনকাম দিয়ে খুব ভালভাবেই চলছিল তাদের সংসার। আর আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল তাদের দুজনেরই স্বপ্ন।
-জান আমি আমার বাচ্চার না ঠিক করেছি। ছেলে হলে রাখব সূর্য আর মেয়ে হলে নীলা।
-তাই। তা এরকম কেন?
আকাশে যখন মেঘ জমবে হয়তো আমাদের মন খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু সূর্য যখন কিরণ দিবে আর নীল আকাশ দেখা যাবে তখন আমাদের মনের মেঘ সরে যাবে। আমরা আমাদের সকল আশা স্বপ্ন আবার ফিরে পাব।
আস্তে আস্তে দিন যায় আর সজল অহনার সূর্য/নীলা ও বড় হতে থাকে। হঠাৎ একদিন অহনার ব্লিডিং শুরু হল। কিন্তু এরকম তো হওয়ার কথা ছিল না। কারন অহনার তখন ষষ্ট মাসে পদার্পণ। সজল দেরি না করে হসপিটাল নিয়ে গেল। ডাক্তারদের সব হিসেব নিকেশ ভুল প্রমানিত করে স্বাভাবিক ডেলিভারির মাধ্যমে পৃথিবীতে আসল সজল অহনার সন্তান সূর্য। প্রিম্যাচুর হওয়াতে দুবার তার হার্টবিট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন ঠিকমত নিঃশ্বাস নিচ্ছে সূর্য।
হঠাৎ সূর্যের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায় সজল।
-কি হল বাবা বললে না তো মাকে কেমন করে হারালাম?
সজলের চোখ চিকচিক করতে লাগলো। চোখের কোনায় অশ্রু জমাট বেঁধেছে সজলের। কিন্তু আজ সূর্য চেপে ধরেছে। তাকে বলতেই হবে। সজল সূর্যকে বুকে চেপে ধরেছে।
“এই পৃথিবীতে তুই যেদিন প্রথম নিঃশ্বাস নিয়েছিলি, সেদিনই তোর মা শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছিল”।
বিদ্রঃ ভাষার ব্যবহারে আমি তেমন উন্নত নই। সে জন্য দুঃখিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ১০:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




