somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

ডঃ এম এ আলী
সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

রাজনীতি নাকি ক্ষমতানীতি

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রাজা কোথায়?
রাজমুকুট আজ জাদুঘরের কাঁচে
রাজদণ্ড ইতিহাসের ধুলোমাখা পৃষ্ঠায়
বহু দেশেই রাজতন্ত্রের সিংহাসন বহু আগেই
নেমে গেছে মানুষের নির্মিত প্রজাতন্ত্রের পথে
তবু আমরা বলি রাজনীতি।

কেন বলি?
শব্দটি এত পরিচিত
যে পরিচয়ের আড়ালে প্রশ্নটি হারিয়ে যায়
যেন শব্দ মানেই সত্য
যেন অভিধান মানেই চূড়ান্ত অর্থ।

কিন্তু একবার একটু থামুন
শব্দের শরীরে কান পাতেন
তার পুরোনো অর্থের দরজা খুলে দেখুন
জিজ্ঞেস করোন রাজ কোথায়?
রাজা কোথায়?
আর রাজনীতি আজ কার নীতি?

যদি রাজ মানে রাজা হয়
তবে আজকের প্রজাতন্ত্রে
রাজা নেই, রাজমুকুট নেই
বংশের অধিকারে রাষ্ট্রের চাবি নেই
আছে সংবিধান,আছে আইন,আছে নির্বাচন,
আছে প্রতিষ্ঠান,আছে নাগরিকের ভোট,
আছে জনতার সম্মতি ও প্রত্যাখ্যানের অধিকার।

তবু আছে আর একটি জিনিস
যা রাজা না থাকলেও থেকে যায়
যা সিংহাসন ভাঙলেও মরে না
যা পতাকা বদলালেও বদলায় না
তা হল ক্ষমতা।

ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা
ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার
ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা
ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়াস
ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ
ক্ষমতার কাছে জবাবদিহি
রাষ্ট্রের প্রতিটি স্পন্দনে
তারই অদৃশ্য পদধ্বনি।

বিরোধী দল কেন পথে নামে?
কেন ভোট চায়?
কেন মানুষের দরজায় দরজায় যায়?
শুধু কি একটি নীতি বলার জন্য?
না‌- নীতিকে বাস্তব করার জন্য
তাকে পৌঁছাতে হয় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।

আর ক্ষমতাসীন দল কেন আবার
মানুষের কাছে ফিরে যায়?
কেন চায় পুনরায় জনসমর্থন?
কারণ ক্ষমতা শুধু পাওয়া নয়
ক্ষমতায় থাকার বৈধতাও
নতুন করে অর্জন করতে হয়।

তবু রাজনীতিকে
শুধু ক্ষমতার লড়াই বললে
সত্যের অর্ধেকই বলা হয়।
কারণ রাজনীতি শুধু
কে ক্ষমতায় যাবে তা নয়
কী করবে সে,
কাদের জন্য করবে,
কাদের ওপর তার সিদ্ধান্তের ভার পড়বে,
কোন অধিকার রক্ষা পাবে,
কোন সম্পদ কোথায় যাবে,
কোন আইন মানুষের জীবন বদলাবে
সেই প্রশ্নও রাজনীতির।


তবু প্রশ্নটি থেকে যায়
কে সিদ্ধান্ত নেবে?
তারপর কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে?
তারপর আরও গভীরে
কার স্বার্থে?
কার ওপর তার প্রভাব?
কার কণ্ঠস্বর শোনা যাবে?
কার কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাবে জনসমুদ্রের গর্জনে?
আর শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে
নিয়ন্ত্রণ করবে কে?
দেখুন ,প্রশ্নগুলোর কেন্দ্রে রাজা নেই।
আছে ক্ষমতা।

ক্ষমতা শুধু মন্ত্রীর দপ্তরে বসে থাকে না
সংসদের আসনেও তার সম্পূর্ণ শরীর ধরা পড়ে না
ক্ষমতা কখনো থাকে
কোন প্রশ্নটি আজ আলোচনায় আসবে তার মধ্যে
কখনো থাকে
কোন প্রশ্নটি আলোচনার বাইরে থাকবে তার মধ্যে।
কোন দাবি গুরুত্ব পাবে,
কোন মানুষের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকের কানে পৌঁছাবে,
কোন গোষ্ঠীর স্বার্থ
রাষ্ট্রের টেবিলে স্থান পাবে
এই নীরব বাছাইয়ের মধ্যেও
ক্ষমতা কাজ করে।

ক্ষমতা কখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া
কখনো সিদ্ধান্ত ঠেকানো
কখনো প্রশ্ন তোলার অধিকার
কখনো প্রশ্নটিই মুছে দেওয়ার অদৃশ্য সামর্থ্য।

তাই রাজনীতি যদি হয়
মানুষের সম্মিলিত জীবনের সেই বিশাল ক্ষেত্র
যেখানে স্বার্থের সংঘাত, আদর্শের দ্বন্দ্ব
সহযোগিতার হাত, অধিকারের দাবি
ন্যায়ের অনুসন্ধান
এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত
পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে
তবে সেই সমস্ত প্রবাহের গভীরে
একটি স্রোত বারবার ফিরে আসে
ক্ষমতার স্রোত।

শব্দের দীর্ঘ জীবন
তার জন্মের অর্থকে অতিক্রম করে
মানুষের মুখে মুখে শব্দ নতুন অর্থ পায়,
নতুন ইতিহাস পায় ,নতুন জীবন পায়।
রাজনীতি ও তাই
আজ আর কেবল রাজার নীতি নয়।
এটি সরকার, সংসদ,নির্বাচন,দল,
বিরোধিতা,রাষ্ট্র,জনস্বার্থ, নীতি ও অধিকার
মানুষের সম্মিলিত জীবন পরিচালনার
এক বিস্তৃত নাম।
তবু প্রচলিত হওয়া
আর ধারণাগতভাবে স্বচ্ছ হওয়া
এক কথা নয়।
এইখানেই একটি নতুন শব্দ দরজায় এসে দাঁড়ায়
ক্ষমতানীতি।

এ কি রাজনীতির বিকল্প? হয়তো নয়।
এ কি রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ?
তাও নয়।বরং এটি
একটি প্রশ্নের প্রদীপ
যে আলোয় আমরা ফিরে তাকাই
পরিচিত রাজনীতির মুখের দিকে
এবং জিজ্ঞেস করি;
এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে
ক্ষমতার প্রবাহ কোথায় যাচ্ছে?


কার হাতে ক্ষমতা জমছে?
কে সিদ্ধান্তের টেবিলে বসছে?
কে টেবিলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে?
কে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারছে?
কার কথা রাষ্ট্র শুনছে?
কার কথা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে?
আর ক্ষমতা ;
কীভাবে অর্জিত হচ্ছে?
কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে?
কীভাবে কুক্ষিগত হচ্ছে?
কীভাবে সীমাবদ্ধ হচ্ছে?
কীভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলো শুধু সরকার বদলের প্রশ্ন নয়।
এগুলো রাষ্ট্রের প্রশ্ন,সমাজের প্রশ্ন,
প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন,মানুষের স্বাধীনতার প্রশ্ন,
ন্যায়ের প্রশ্ন।

আর তাই
ক্ষমতানীতি হয়তো কোনো নতুন সিংহাসন নয়
যেখানে রাজনীতি’কে বসিয়ে
পুরোনো শব্দকে নির্বাসনে পাঠাতে হবে।
বরং এটি একটি জানালা
যে জানালা খুলে দিলে
আমরা রাজনীতির পরিচিত দৃশ্যের পেছনে
দেখতে পাই ক্ষমতার অদৃশ্য স্থাপত্য।
দেখতে পাই;
নির্বাচনের পেছনে ক্ষমতা
আইনের পেছনে ক্ষমতা
সম্পদ বণ্টনের পেছনে ক্ষমতা
নীতিনির্ধারণের পেছনে ক্ষমতা
সম্পদ ভোগের ক্ষমতা
সম্পদ পাচারের ক্ষমতা
প্রতিষ্ঠানের সীমারেখায় ক্ষমতা,
এমনকি নীরবতার মধ্যেও ক্ষমতা।

তাই প্রশ্নটি হয়তো নয়
রাজনীতি থাকবে,
নাকি ক্ষমতানীতি আসবে?
বরং প্রশ্নটি আরও গভীর
রাজনীতি বলতে
আমরা আসলে কী বুঝি?
রাজাকে?রাষ্ট্রকে?নীতিকে?নির্বাচনকে?দলকে?
নাকি মানুষের সম্মিলিত জীবনে
ক্ষমতা অর্জন,ক্ষমতা প্রয়োগ,ক্ষমতা বণ্টন,
ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা ভোগ
এবং ক্ষমতার কাছে
জবাবদিহির সেই অনন্ত প্রক্রিয়াকে?

রাজা আসবে,রাজা যাবে।
সরকার বদলাবে,দল বদলাবে,
নীতি বদলাবে,ক্ষমতার কেন্দ্রও কখনো
এক হাত থেকে অন্য হাতে যাবে।

কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যাবে
কে সিদ্ধান্ত নেবে?কীভাবে নেবে?কার জন্য নেবে?
কার ওপর তার ভার পড়বে?
এবং কে তাকে প্রশ্ন করবে?
এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে
হয়তো রাজনীতির পুরোনো নামটি
আরও গভীর হয়ে ওঠে।
‘রাজনীতি’ তখন শুধু শব্দ নয়
একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।
আর ‘ক্ষমতানীতি’ একটি নতুন প্রশ্ন
একটি চিন্তার দরজা।

একটি আয়না, যেখানে রাজনীতির পরিচিত মুখের পেছনে
আমরা দেখতে পাই মানুষের সম্পর্ক,স্বার্থ,অধিকার,
সংঘাত,সহযোগিতা এবং ক্ষমতার অবিরাম চলাচল।
তাই আজ রাজাকে নয় ক্ষমতাকে দেখুন
সিংহাসনকে নয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রকে দেখুন।
শুধু ক্ষমতায় কে বসেছে তা নয়
ক্ষমতা কীভাবে কাজ করছে
তা দেখুন।

আর সেই দেখার মুহূর্তে
যদি একটি নতুন শব্দ
আমাদের চিন্তাকে আরও তীক্ষ্ণ করে
তবে তাকে প্রশ্ন হিসেবে
উচ্চারণ করাই যায়
রাজনীতি নয়- ক্ষমতানীতি?
হয়তো উত্তর আজই চাই না।
কারণ কখনো কখনো একটি শব্দের চেয়ে
একটি সঠিক প্রশ্নই সমাজের চিন্তার ভিতরে
বেশি দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

আর সেই প্রশ্নের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি
রাজা নয়, রাষ্ট্র নয় শুধু;
মানুষের সম্মিলিত জীবনে
ক্ষমতার যে অবিরাম নীতি
রাজনীতীর আড়ালে
তারই কি আর-এক নাম
ক্ষমতানীতি!

তাই এখন রাজনীতি
শব্দটির বিলুপ্তি ঘটিয়ে
সেখানে বসাতে হবে
ক্ষমতানীতি ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:০০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাজনীতিতে ফেরার টিকিট কি এবার ক্রেমলিনে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১০


বিশ্বজুড়ে থরথর কম্পন শুরু হয়ে গেছে। মার্কিন মুল্লুক থেকে মহাখালী, সবাই আজ বাকরুদ্ধ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিস্ফোরণ ঘটেছে। বিশ্বস্ত সূত্রে, অর্থাৎ ভারতীয় কয়েকটি বেনামী ফেসবুক পেজ এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ আগস্ট ২০২৪: জনঅভ্যুত্থান, নাকি নেপথ্যে ক্ষমতার আরেক সমীকরণ?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৩


৫ আগস্ট ২০২৪: জনঅভ্যুত্থান, নাকি নেপথ্যে ক্ষমতার আরেক সমীকরণ?

একটি সরকার পতনের দিনকে আমরা কীভাবে পড়ব- জনতার বিজয় হিসেবে, নাকি রাষ্ট্রক্ষমতার নেপথ্যে ঘটে যাওয়া এক জটিল ক্ষমতা- হস্তান্তর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষের কবিতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৫


(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত নতুন সংস্করণ)

অমিত রায় সম্পর্কে তার বন্ধু সহিস বলত, "অমিতের বুদ্ধির আলোটা সূর্যের মতো সবাইকে আলো দিতে আসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার সোভিয়েত শৈশব

লিখেছেন চারাগাছ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১





বাংলা ব্লগের জগতে সহব্লগাররা যারা আমাকে অনেকদিন ধরে চেনেন, তারা জানেন—আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।
শুনতে একটু অদ্ভুত লাগে, তাই না?

রাশিয়ায় আমি কোনোদিন যাইনি।

তবু আমার একটা রাশিয়ান শৈশব ছিল।

আমার সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এটা একটা ফাকিবাজি পোষ্ট

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫



বাংলাদেশে একটার পর একটা বিষয়বস্তু সামনে আসে, আর সবাই সেটা নিয়ে ঝাপায়ে পড়ে। দেখে বিমলানন্দ অনুভবস করি। ''অনুভবস'' বললাম, কারন ছাত্রাবস্থায় আমরা বন্ধুরা কোন বিষয়ে ওভার-ক্যাজুয়ালি ফানি আলাপ করলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×