২০০৫ সাল। মাত্র ক্রিকেট খেলাটা বুঝতে শুরু করেছি। জিম্বাবুয়ে বনাম বাংলাদেশ ৫ ম্যাচের একটা ওয়ানডে সিরিজ চলছিল তখন। প্রথম দুই ম্যাচ হেরে যাওয়ার পরেও বাকি তিন ম্যাচে ঘুরে দাড়িঁয়ে সিরিজটা জিতে নিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর জিম্বাবুয়ের মত ছোট দলগুলোর সাথে বাংলাদেশ নিয়মিত জেতা শুরু করলো। কিন্তু বড় দলগুলোর সাথে আগের মতই গো-হারা অব্যাহত থাকে।
টিভিতে খেলা দেখার তেমন ব্যবস্থা ছিলনা। রেডিওতে খেলা শুনতাম। একমাত্র ভরসা বাংলাদেশ বেতার। আর ধারাভাষ্যে আছেন খোদাবক্স মৃধা। আর কি চাই! ক্লাসের মধ্যে কানে হেডফোন লাগিয়ে খেলা শুনতাম। হাবিবুল বাশার কিংবা আশরাফুল চার-ছয় মারলে কিংবা বিপক্ষের কোন উইকেট পড়লে আনন্দে ফেটে পড়তাম। কৌশলে ক্লাসরুমের বাকিদের কাছেও আপডেট চলে যেত। ক্লাসে হুজুর কি পড়াচ্ছেন সেটার চেয়ে বাংলাদেশের জিততে আর কত লাগবে সেদিকে ছিল সবার নজর।
একসময় কালেভদ্রে শক্তিশালি দলগুলোর বিরুদ্ধে একটা দুইটা ম্যাচ জেতা শুরু করলাম। সারা বিশ্ব এটাকে অঘটন হিসেবে দেখতো। কিন্তু আমরা ফেঁটে পড়তাম চরম উল্লাসে। মনে পড়ে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাওয়া জয়টার কথা। খেলাটা রাতে হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দেখার সুযোগ হয়নাই। পরদিন ভোরে পত্রিকা পড়তে গিয়ে প্রথম পৃষ্ঠায় বড় অক্ষরে লাল কালিতে ছাপানো হেডলাইনটা যখন পড়লাম, মনে হলো যেন আমার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবে। টাইগাররা হারিয়ে দিয়েছে সুপার পাওয়ার অস্ট্রেলিয়াকে! ওইদিন যে কতগুলা পত্রিকা পড়লাম তার কোন সংখ্যা নাই। রাস্তার পাশের সেলুনে, চালের আড়তে কিংবা কোন ফার্নিচারের দোকানে। বাংলাদেশের জয়ের গল্প পড়তে এত ভালো লাগে কেন! এটাকেই কি বলে দেশপ্রেম!

তখন কি একবার ভেবিছিলাম একদিন বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ে-স্তর অতিক্রম করে আরো অনেক উপরে উঠবে! তথাকথিত সুপার পাওয়ারদের বলে কয়ে রোজ রোজ হারাবে! একজন অধিনায়ক মাশরাফির আবির্ভাব ঘটবে! যিনি অধিনায়কত্বের নতুন সংজ্ঞা লিখবেন! কেউ এরকম কল্পনা করে থাকলে সেটাকে দিবাস্বপ্ন হিসেবে চিন্তান করেই মনে মনে লজ্বা পেত। কিন্তু কেমন করে যেন সেই আকাশ-কুসুম কল্পনাই বাস্তবে ধরা দিল।
২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাংলাদেশের ক্রিকেটে অন্যতম একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। গ্রুপ পর্যায়ের প্রতিটি ম্যাচ ধারাবাহিকভাবে অসাধারন খেলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। আত্মবিশ্বাসের পারদ উঠে অনেক উচুঁতে। বিশ্বাস জন্মায়, আমরা আসলেই পারি। এর প্রমান পাওয়া যায়, বিশ্বকাপ শেষে টানা তিনটা তিনটা ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ একে একে হারায় পাকিস্তান, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে। তারই ধারাবাহিকতায় শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপ-২০১৬ এর ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। আর একটা সাধারন খেলা কিভাবে একটা জাতিকে জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত করে সেটা চাক্ষুষ দেখে সারা বিশ্ব।
বাংলাদেশের যে জয়রথ শুরু হয়েছে সেটা চলতেই থাকবে। হীণম্মন্যতার যে কঠিন দেওয়াল বাংলাদেশের মানুষকে ঘিরে রেখেছে, ক্রিকেটের মাধ্যমে সেটা ভাঙা সম্ভব হবে। তারপর ক্রিকেট ছাড়িয়ে বিজ্ঞান, শিল্প, সমাজসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও এদেশের মানুষ সারা বিশ্বের দরবারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সারা বিশ্ব বারংবার অবাক তাকিয়ে থাকবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৩:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




