somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জমি বিক্রয়ে কত প্রকার বেইমানী হয়, এজন্য কি সিস্টেম দায়ী নয়?

১২ ই মে, ২০১৫ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক.
বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ জেলার কালেক্টর ছিলেন বৃটিশ অফিসার হেনরি বেভারেজ। এই এলাকার দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি বই লিখেছিলেন। বইয়ের নাম দি হিস্ট্রি অব বাকেরগঞ্জ। এতে এই বরিশাল অঞ্চলের মানুষের আচার আচরণ আর সংস্কৃতি তুলে ধরেছিলেন। বইয়ের একটি অধ্যায়ে বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। আমার মনে একটি ঘটনা দাগ কেটে যায়। ঘটনাটি এই রকম-জমিজমা নিয়ে দুটি পরিবারের মধ্যে বিবাদের শুরু। এই নিয়ে প্রচন্ড শত্রুতা। পরে শত্রুকে ফাসাতে গিয়ে নিজের পরিবারের একজনকে হত্যা করে একপক্ষ। আর হত্যার অভিযোগে ওই শত্রুদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। জমিজমার জন্য এই এলাকার মানুষ কোন পর্যায়ে যেতে পারে- এটি বুঝাতেই হেনরি বেভারিজ এই ঘটানাটি লিখেছিলেন। আমি সম্ভবত ১৯৯৪ সালে বইটি পড়েছিলাম। চট্টগ্রামের পাবলিক লাইব্রেরীতে বসে। পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অবিশ্বাসও জন্মেছিল। জমির জন্য আর একজনকে ফাসাতে নিজের পিতাকে হত্যা! এটাও কি সম্ভব? বিধাতা বোধ হয় তখন হেসেছিলেন। সময়ের ব্যবধানে আমি এখন সহকারী কমিশনার (ভূমি), গলাচিপা। আর আমার অফিসের প্রতিটি জমির খতিয়ানে এখনো লেখা রয়েছে জেলা- বাকেরগঞ্জ।

দুই.
আমার অফিসের তিনটি দড়জা খোলা। লোকজন যখন ইচ্ছা ঢুকেন। কথা বলেন, আবার বের হন। অনেকে রেকর্ডীয় মালিকের জমির ঝামেলা নিয়ে আসেন। এগুলো জমিকেন্দ্রিক পারিবারিক বিরোধ। আমার কিছুই করার থাকেনা। আমি তাদের করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দেই। ঘটনাগুলো আমাকে আবার বেভারিজ এর বইটাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে একজন মানুষ কতবড় বেইমানি করতে পারে-এবার হাতেনাতে প্রমাণ দেখে অবাক হয়ে যাই। একদিন একজন ব্যক্তি আমার অফিসে আসেন। তিনি একটি বিষয়ে আমার কাছে সমাধান চান। ঘটনাটি হলো-রেকর্ডীয় মালিকের কাছ থেকে তিনি জমি কিনেছেন। রেকর্ডীয় মালিক তখন বৃদ্ধ। অসুস্থ। তার চিকিৎসা প্রয়োজন। আর চিকিৎসার জন্য দ্রুত জমি বিক্রি করতে হবে। তিনি টাকা দিলেন। বিনিময়ে জমির মালিক তাকে দলীল দিলেন। আর ওই টাকা দিয়ে তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হলো। কিছু দিন চিকিৎসার পর ওই ব্যক্তি মারা যায়। আর ক্রেতা যিনি আমার অফিসে এসেছিলেন তিনি জমি ভোগদখল করতে থাকেন। দিন যায়। বছর যায়। একদিন ওই রেকর্ডীয় মালিকের নাতিরা জমিতে লাগানো গাছ কাটতে যায়। ক্রেতা বাধা দেন। বলেন- এ জমিতো তোমাদের দাদা আমার কাছে বিক্রি করেছেন। নাতীরা বলে, তোমার দলীল ভুয়া। এই জমি দাদা আমাদেরকে দিয়ে গেছেন। শালিস বসে। নাতিরা দলীল বের করে। দেখা যায় মাত্র একমাস আগে দাদা নাতিদেরকেই একই জমি দলীল করে দিয়েছেন। আর তা গোপন করে চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে বলে তাড়াহুড়া করে এই জমি পুনরায় বিক্রি করে দিয়েছেন। আমি জমির ক্রেতাকে পরমর্শ দিলাম, এ নিয়ে মামলা মোকদ্দমা হলে ওই নাতিরাই জিতবে। কারণ তাদের দলীলই আগে। আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তবে আপনার জমিতে যেহেতু দখল রয়েছে সেটা বজায় রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী মামলা করতে পারেন। বেইমানির এই ঘটনায় আমি অবাক। মানুষ মৃত্যুর আগেও এ ধরনের কাজ করতে পারে- আমার ধারনারও বাইরে।

তিন.
ইংরেজরা সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ৩২ ধারায় মৃত্যুকালীন ঘোষণার বিধান রেখে গেছে। মৃত্যুকালীণ স্রষ্টার কাছে যাওয়ার আগে কেউ মিথ্যা বলতে পারেনা- এটাই এর প্রধান ভিত্তি। ধরা যাক, কাউকে মেরে মৃত ভেবে ফেলে গেছে। অথচ তাকে উদ্ধার করা হয়। তিনি তখনও কথা বলতে পারছেন। এ সময় কারা তার উপর হামলা করেছে- এবিষয়ে বিবৃতি দিতে পারেন। আইনে ম্যাজিস্ট্রেট এ ধরনের বক্তব্য রেকর্ড করে থাকেন। তবে পুলিশ বা ডাক্তারকে এই বক্তব্য রেকর্ড করতে হলে অন্য সাক্ষীর উপস্থিতিতে করতে হয়। যাই হোক, আমার প্রশ্ন ছিল এসময় কেউ মিথ্যা বলে কিনা? উত্তরটা দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির সাবেক সচিব বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শফিউল আলম স্যার। স্যার বললেন, একজনকে পেয়েছিলাম- যে মৃত্যুর আগেও মিথ্যা বলেছিল। ঘটনা ছিল, এক ব্যক্তি পুত্রবধুকে ধর্ষনের চেষ্টা করলে পুত্রবধু তাকে কুপিয়ে আহত করে। ওই ব্যক্তির মুমুর্ষু অবস্থায় মৃত্যুকালীণ ঘোষণা (ডায়িং ডিক্লারেশন) নিয়েছিলেন স্যার। সে মৃত্যুর আগেও মিথ্যা বলেছিল। আর ঘোষণা দেয়ার পরই তার মৃত্যু হয়েছিল। যারা অভ্যাসগত অপরাধি আসলে তাদের কোন ছাচে ফেলা যায়না। আমিও এই ভূমির দায়িত্বে আসার পর প্রতিদিন কাগজে কলমে মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা দেখি। মৃত্যুর আগে নাতিদের জমি লিখে দিয়ে পরে অন্যজনের কাছে একই জমি বিক্রির বিষয়ে লেখবো তা ভাবিনি। আর সে কারণেই তাদের নাম ঠিকানা রাখিনি।

চার.
আল্লাহ মনে হয়- আমাকে দিয়ে মানুষের এমন নেতিবাচক বিষয়গুলো লেখাবেনই। আর গতকাল এই ধরনেরই একটি বিষয় নিয়ে উদ্ভুত মিসকেস ১০-গলা/২০০৬/০৭ এর আদেশ দিতে হলো। ঘটনার বিবরণ হলো-গলাচিপা উপজেলার পানখালি গ্রামের আবুল হোসেন মাজগ্রাম মৌজার এসএ ২২২ ও ২২৫ খতিয়ানের জমির মালিক। তার মৃত্যু হলে- মা, স্ত্রী, ৩ পুত্র ও ২ কন্যা মাট ৭ জন জমির মালিক হন। তার একপুত্রের নাম আশ্রাব আলী সিকদার। তিনি সব মিলিয়ে ২৭ শতাংশের জমির মালিক হন। তখনও জমি ভাইবোনদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হয়নি। তারআগেই ২২৫ নং খতিয়ান থেকে ১৮ শতাংশ জমি তিনি মাঝগ্রাম এলাকার মোঃ সিদ্দিক মল্লিক এর পুত্র মোঃ ইদ্রিস মল্লিক এর কাছে বিক্রি করে দেন। তবে এর আগেই তার পুত্র নাসির উদ্দিন সিকদার এর স্ত্রী মানে আশ্রাব আলী তার পুত্রবধু বিউটি বেগমকে গোপনে নিজে বাবার যে জমি পাবেন তর চেয়েও বেশি ৩৪ শতাংশ জমি দলীল করে দিয়ে দেন। জমি বিক্রির পর আশ্রাব আলী বেশ কয়েক বছর বেচেঁ ছিলেন। আর জমির ক্রেতা মোঃ ইদ্রিস মল্লিকও নামজারি করে ভোগ দখলে ছিলেন। ২০০৬ সালে আশ্রাব আলী মারা গেলেই তার পুত্রবধু বিউটি দলীল হাতে ওই জমিতে গিয়ে দাড়ান। তার দাবী অনেক আগেই জমিটি তার শ্বশুড় তার নামে দলীলের মাধ্যমে হস্তান্তর করেছিল। এবার বিউটি গলাচিপা উপজেলা ভূমি অফিসে এসে নামজারী বাতিলের জন্য মিসকেস রুজু করেন। এতদিন কেউ এর মিমাংসা করে যাননি। আমি নথিটি হাতে পেয়ে এই বেইমানী দেখে সিদ্দান্ত নিলাম যেভাবেই হোক- এর নিষ্পত্তি করতে হবে। শুনানী হলো- বিউটি বেগমের পক্ষের আইনজীবীর একটিই বক্তব্য তার মক্কেলের দলীল আগে। তাকে আগে জমি দিতে হবে। তারপরই কেবল পরের দলীলের গ্রহীতা জমি পেতে পারে। ছাক্কা যুক্তি। ক্রেতা ইদ্রিস মল্লিক এর পক্ষের আইনজীবী আর কি বলবেন। তার যুক্তি হলো- তার মক্কেলের সংগে বেইমানী করা হয়েছে। জমি তার দখলে রয়েছে। এই কথা শুনে অবশ্য বিউটি বেগমের আইনজীবী উত্তরে বললেন, যার বিরুদ্ধে বলছেন তিনিতো মৃত। এখন এখানে কাগজ কথা বলবে। তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে হলে আল্লাহর কাছেই বলতে হবে। আমি শুনছিলাম, আর তাকিয়ে তাকিয়ে ইদ্রিস মল্লিকের মুখটা দেখছিলাম। প্রতারণা আর বেইমিানির শিকার হলে মানুষের মুখটা এমনই হয়।
সব শুনে আমি আদেশ দিলাম- নামজারী বাতিল। তবে ভোগদখল না থাকায় বিউটি বেগমের নামে রেকর্ড সংশোধন করা গেলনা। সরকারী চাকুরী করতে এসেছি। এজন্য কারও প্রতি কোন প্রশ্ন নেই। তবে একটা কথা না বললে নয়। ভূমির রেকর্ড থাকে ভূমি অফিসে আর বিক্রি হয় সাব রেজিস্ট্রি অফিসে। তাও আবার উপজেলায়। এই সিস্টেম কি জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়নি। এর জন্য কি আশ্রাব আলী আর ওই নাতির নামে দলীল দেয়া ব্যক্তি দায়ী। ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে জমি হস্তান্তর হলে কার সাধ্য একই জমি দুবার বিক্রি করার? সভ্যতার চরম শিখরের এই সময়ে এটা কি আমার খুব বেশি চাওয়া? সময়ের কাছে আমার এই প্রশ্ন থাকলো।

গলাচিপা।
ডাকবাংলো। ৭ মে, ২০১৫


অনলাইনে নিউজ পোর্টালে পড়তে
http://www.onirbannews.com/33207#.VVFtGpMXCSp
ফেসবুকে পড়তে
https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=1436843659964525&id=100009167133005
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০১৫ সকাল ৯:১৯
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×