somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদেরও পরিচালক, ওদেরও পরিচালক! (আত্ন-বিশ্লেষণ)

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইদানিং ছেলের গান আর গানের সাথে সাথে দেবের অনুকরণে নাচের আবদার মেটাতে আমাদের একমাত্র ভরসা পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গীত বাংলা চ্যানেল। দেখতে দেখেতে এক সময় আমাদেরও ভালো লেগে গেল বেশ।

এক সময় লক্ষ্য করলাম, শুধু ভালোলাগা নয়, যেন ভক্তই হয়ে গেলাম বাসার সবাই, ঐ চ্যানেলের। খেতে খেতে বা গল্প করতে করতে কোথাও মনের মত কিছু খুঁজে না পেলে শেষ পর্যন্ত ভরসা ঐ সঙ্গীত বাংলা চ্যানেলই। কারণ ওদের গান গুলোর শব্দ-কথা-সুর-শিল্পী আর সর্বোপরি চিত্রায়ন সবকিছু এতো এতো মনমুগ্ধকর আর হৃদয় ছোঁয়া যে না দেখে আর পারিনা।

এক সময় দেখলাম টিভি খুললেই আগে সঙ্গীত বাংলায় যাই। ভালো বা মনের মত কোন গান হচ্ছে কিনা? যে কারণে সাম্প্রতিক সময়ের অনেক অনেক বাংলা গান মুখ ও ঠোঁটের আগায় থাকে আজকাল। দারুণ দারুণ সব কথামালায় সাজানো আর অনিন্দ সুন্দর সুরের ঢেউ তুলে দেয় মনে প্রানে। বেশ লাগে।

সেদিন অফিস থেকে গিয়ে একটু ফ্রেস হয়েই কফির মগ নিয়ে বসলাম টিভির সামনে। সঙ্গীত বাংলা চ্যানেল চলছে তার মত করে। গান দেখছি আর শুনছিও। হঠাৎ না চাইতেও চোখ আটকে গেল... না গানে নয়, নয় গানের চিত্রায়নে, এমনকি গানের লোকেশনেও নয়, তবে কোথায়? চোখ আটকে গেল নায়িকার দিকে তাকিয়ে! আরে মেয়েটাকে তো খুব চেনা চেনা লাগছে? কিন্তু এই মেয়েকে তো এই চ্যানেলে আগে দেখেছি বলে মনে হলনা, অথচ বেশ পরিচিত মুখ! কে তবে?

তড়িঘড়ি করে ছেলের মাকে ডাকলাম, আরে তাড়াতাড়ি এসো এদিকে! তিনি রান্নার ব্যস্ততার মাঝেও উঠে আসতে বাধ্য হলেন, আমার হাঁকডাক আর অদ্ভুত তাড়াহুড়ো দেখে। এসে বিস্ময় ভরা চোখে জানতে চাইলেন কি এমন হাতি-ঘোড়া হয়েছে যে উঠে আসাতে বাধ্য করলাম? টিভির দিকে তাকাতে বললাম। তিনি টিভির দিকে তাকানোর পরে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, একে চেনা চেনা লাগছে, তিনি চিনতে পারছেন কিনা? তিনি চিনতে পেরেছেন এবং দেখে নিজেই অনেকখানি বিস্মিত! আরে এ তো আমাদের মিম!

আমারও খুব চেনা চেনা লাগছিল, কিন্তু এই চ্যানেলে কিভাবে এলো সেটা বুঝতে না পারাতেই তোমাকে ডেকে আনলাম। এবার তিনিও সেই গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে বসে দেখলেন এবং মুগ্ধ হলেন! কেন?

এরপর পরই ভাবলাম আরে এই মেয়ের নাচ-গান আর পোশাক তো অনেক দেখেছি মডেলিং, টিভি নাটক ও পেপার পত্রিকায়। কিন্তু এতটা ভিন্ন আর আকর্ষিণীয়তো কখনো লাগেনি বা মনে হয়নি! নাকি ভারতীয় চ্যানেলের মুগ্ধতার প্রতি কিছুটা দুর্বলতার কারণে ভালো না হলেও ভালো লাগছে? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলাম। তবে তো যাচাই করতে হয় ব্যাপারটা। ভারতীয় বা সঙ্গীত বাংলা চ্যানেলের প্রতি আমার দুর্বলতা নাকি নিজ দেশের চ্যানেল, চলচিত্র, চিত্রায়ন আর নিজের চেতনার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা!

ঠিক আছে দেখাজাক, এবার সময় করে চোখ রাখলাম ইউটিউবে। প্রথমে মিমের সেই ব্ল্যাক সিনেমার দুটি গান দেখলাম বেশ কয়েকবার এবং ভালোভাবে, মনদিয়ে আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। সাথে দেখলাম দেশে চিত্রায়িত আর গানের কথার সাথে লোকেশনের কি ভীষণ অসামজস্যতার উপস্থাপন! সেও সেই মিমেরই কোন না কোন সিনেমার গানের চিত্রায়ন। অথচ পার্থক্য আকাশ আর পাতাল। এরপর ভাবলাম শুধু মিমের গানের সাথে তুলনা না করে আরও দুই একজনেরটা নাহয় দেখি, তাহলে নিজের কাছে অন্তত দায়বদ্ধতা থাকবেনা।

তাই এবার সঙ্গীত বাংলায় বর্তমান সময়ে বেশ জনপ্রিয় কয়েকটি গান দেখলাম, যার নায়ক-নায়িকা মিমি-শ্রাবন্তি-কোয়েল আর দেব-জিত এবং সোহম। এবার বাংলাদেশের কয়েকটি গানে চোখ রাখলাম, যার নায়ক নায়িকা... পরিমনি-আঁচল-মাহি আর অন্যদিকে বাপ্পি-রিয়াজ আর জায়েদ খান(!!!) আর যা দেখলাম তা এরকম......

ওদের গানের চিত্রায়নের আগে পরিচালক বেশ ভালোভাবে গান শুনে-বুঝে আর হৃদয়ে ধারন করে শুটিং লোকেশন ঠিক করেছেন। আর এও বেশ ভালোভাবে অনুভব করেছেন যে সেই গানের সাথে নায়ক-নায়িকার চিত্রায়ন কেমন হলে সেটা শিল্পিত হবে সৌন্দর্য অবলোকনে, মুগ্ধতায় আর দর্শককে গানের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখায়! শুধু তাই-ই নয়, সেই গান আর তার লোকেশন ও চিত্রায়ন দেখতে যেন বারবার ফিরে আসে বা আসতে বাধ্যহয় সেটাও তারা বেশ ভালো ভাবে।

এমনকি অনেক অনেক গানের পোশাক এতো ছোট ছোট কিন্তু চিত্রায়ন বা ক্যামেরার ধারন কৌশল এমন যে সেটাকে আদৌ দৃষ্টি কটু-রগরগে বা সুড়সুড়ি তুলে দেয়ার মত নয় আদৌ। অথচ ওদের নায়িকারা বড় বা ঢিলেঢালা পোশাক পরেইনা বলতে গেলে, তারপরও সবাইকে নিয়েই দেখা যায় আরাম করে আর করা যায় উপভোগ মন ভরে।

আর এদিকে এবার আমাদের দেশের চিত্রায়ন আর পরিচালক ও ক্যামেরাম্যানের চিত্র ধারন কৌশলের দিকে যদি তাকাই... তাতে করে আমার ক্ষীণ মস্তিষ্কের আর অপরিপক্ক ভাবনার মিশেলে যা পেলাম তাই এই রকম...

গানের কথা ভালো, সুরও মন্দ নয়, গানের শিল্পী আর তাদের কণ্ঠও দারুণ! কিন্তু সেই সব ভালো, মান সম্মত আর উপভোগ্য কিছুকেই কিভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে গান শোনার-দেখার আর বসে থাকার অযোগ্য করে তোলা যায়, সেটা আমাদের পরিচালক আর ক্যামেরা ম্যানদের কাছ থেকে শেখা যেতে পারে! উপভোগ আর আবার ফিরে আসা তো সুদুর পরাহত...!

আবার আমাদের একজন তথাকথিত নায়ককে দেখলাম যিনি কিনা একটি গানেই, নিজেকে শাহরুখ, কখনো সালমান, আবার কখনো রিকতিক রোশন হিসেবে উপস্থাপনের গা ঘিনঘিনে অপচেষ্টায় উন্মাদ প্রায়! তাতে না হল ওদের কারো মত না থাকলো তার কোন নিজস্বতা! আসলে নিজস্বতা কি জিনিষ সেই বোধ-বুদ্ধিই তো এদের নেই! যাক, সেসব বলে আর কি হবে? যা বলছিলাম। গানের চিত্রায়ন......

যে গানের চিত্রায়ন হতে পারতো গ্রামের কোন সবুজ প্রান্তরে, গাছের ছায়ায় বা পাহাড়ি কোন নির্জনতায়, সেই গানের জন্য তারা বেঁছে নিয়েছেন বৃষ্টি ভেজা কোন উপলক্ষ আর নায়িকার জন্য শিফন শাড়ি! এবার বুঝুন, ঝমঝমে বৃষ্টি আর নায়িকার পরনে শিফন শাড়ির মিশেলে কি চিত্র হতে পারে? আবার বড় পোশাক পরেও কিভাবে নায়িকার শরীরকে উপস্থাপন করা যায় কুরুচি আর রগরগে ভাবে।
যে গানের চিত্রায়ন হতে পারতো কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে বা বন্ধু মহলের গল্প আড্ডার মাঝে, সেই গানের চিত্রায়নের জন্য বেঁচে নিয়েছে কোন বার বা রাতের উম্মত্ততার কোন আয়োজনকে! যেখানে আছে মদ, প্রায় নগ্ন নারীদের অশ্লীলসব অঙ্গভঙ্গি! আরও যে কত কি যা প্রকাশের মত নয়।

যে গানের কথায়, নায়িকার হাতে নায়ক হাত রাখলে নায়িকা একটু লজ্জা পাবে বা সামান্য শিহরণে চোখ নামাবে, সেই গানে নায়িকাকে নায়ক স্পর্শ করার আগেই নায়িকা যেন গলে গলে পড়ছে টুপটাপ করে! যে কথায় নায়িকা কোথায় একটুখানি হাসবে, সেই কথায় নায়িকা ঠোঁট-টোট কামড়ে অস্থির করে তুলেছে!! যে সুরে নায়িকা একটু ফিরে তাকাবে বা মায়ার চাহুনি দেবে, সেই সুরে নায়িকা...... বলার ভাষা নাই আর! তাই থাক, পারলে বুঝে নিয়েন।

কি হাস্যকর আর উদ্ভট উপস্থাপন। এরা না গান শোনে, না গানের কথা-সুর আর সেসবের উপলব্ধি করে, না বোঝে গানের কোন মর্ম! না চিত্রায়নের আগে কিছু ভাবে!! এরা সব কিছু করে সাময়িক আর তাৎক্ষণিক দুই পয়সা উশুল করার জন্য। এদের না আছে কোন ইমেজ না ভবিষ্যৎ কোন দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা বা সত্যিকারের চলচিত্র বা এই জগতের উন্নয়নের কোন পরিকল্পনা।

আর ওরা? একটি গান আর তার ভাবনাকে কিভাবে আর কতটা সুন্দর ও শৈল্পিক ভাবে মুগ্ধতাভরে চিত্রায়ন করতে পারলে মানুষ শুধু নেবেনা মনে রাখবে এবং আবারো অপেক্ষা করবে কবে এই পরিচালক বা প্রযোজকের গান বা সিনেমা আবার আসবে সেই ভাবনা ভেবে। নিজেদের ইমেজকে কিভাবে আরো উঁচুতে তুলে সেটাকে ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় সেই বোধ ও দর্শন থেকে।

হাঁয়, আর কি বা বলার আছে? শুধু এই দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া......

আমাদেরও পরিচালক আর ওদেরও পরিচালক...!!!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৩১
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় স্বার্থপর হয়ে গেছে! আগেই কি ভালো ছিলাম?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



মানুষ গত কয়েক বছর ধরে অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক বা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে! আগে এমনটা দেখা গেলেও গত কয়েক বছর এটা অতি বেশিমাত্রায় দেখা যাচ্ছে। কেন??

দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশি খারাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×