somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাহিত্যপাঠ : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'আত্মপ্রকাশ'

২৯ শে মার্চ, ২০১৫ রাত ৮:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলা উপন্যাসে এর পূর্বে এমনটা ঘটেছে কিনা জানা নেই; যেখানে লেখকই উপন্যাসের মূল চরিত্র এবং সরাসরি নিজের নামটিই ব্যবহার করেছেন তিনি । হ্যাঁ আমি ‘আত্মপ্রকাশ’ উপন্যাসটির কথাই বলছি; ওপার বাংলার বরেণ্য লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যার স্রষ্টা । এই উপন্যাসটির মধ্য দিয়েই সুনীলের কথাসাহিত্যে অভিষেক ঘটে ।
অগোচালো প্লট, চরিত্র নির্মাণে প্লটের সাথে সেতুবন্ধন নেই । অর্থাৎ বাংলা উপন্যাসের পূর্ববর্তী ধারাকে ভেঙ্গে একটা নতুন ধারা সংযোজনের প্রয়াস তিনি চালিয়েছেন । এক্ষেত্রে লেখক কতটা সফল কিংবা কতটা ব্যর্থ— সেই হিসেবটা না কষে শুধু বলতে চাই, উপন্যাসটি পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠক এক নতুন পাঠ-অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন । লেখক যখন নিজ মুখেই স্বীকারোক্তি দেন, আমি গতরাতে বেশ্যালয়ে গিয়েছি, প্রচুর মদ্যপান করেছি, জুয়ার আড্ডায় বসেছি— তখন পাঠকের অভিভূত না হওয়ার কোন কারণ থাকে না ।

প্লটের মত উপন্যাসের নায়ক সুনীলও বেশ অগোচালো এক যুবক । জামাইবাবুর বরাতে একটা ছোট চাকরি জুটে গেলেও সেখানে তার একদম মন নেই । সভ্য জগতের বাইরে যে এক অসভ্য নিষিদ্ধ জগত— সেটাই ওকে টানে বেশি ।
সুবিমল এসে রোজ সুনীলের অফিসে হানা দেয় । সুনীলের মত সুবিমলের অবশ্য ওসব চাকরি-বাকরির জুট-জামেলা নেই । সে আপদমস্তক বেকার । শিল্প-সাহিত্য নিয়ে অবশ্য টুকটাক নাড়াছাড়া করে । সুবিমলের আগমনে সুনীল মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও রোজই সে বেরিয়ে পড়ে জুয়াড়ি লম্পট মাতাল বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডাখানায় । অবিনাশ, পরীক্ষিত, শেখরসহ তার সব সঙ্গপাঙ্গদের সেও মেতে উঠে অসভ্য, নোংরা অথচ মোহনীয় জীবনের উল্লাসে । জাগতিক সব দুঃখ-কষ্ট-গ্লানি-পূর্ণতা-অপূর্ণতাকে ছুটি দিয়ে ওরা কেউ গাঁজা টানে, কেউ মদ্যপান করে মাতলামি করে, কেউ বেশ্যার বুকে আশ্রয় খোঁজে, কেউ বা জুয়ার টেবিলে হাসতে হাসতে পকেট উজাড় করে দেয় । অতঃপর তাদের অনেকেই নেমে আসে কোলকাতার রাস্তায়— এবার বাড়ি ফেরার পালা ।
অনেকেই বাড়ি ফিরে না । মাতাল হয়ে পড়ে থাকে আড্ডাখানায় । কাল রাতে শেখর বাড়ি ফিরে নি । সকাল হতেই শেখরের ছোটভাই পরিতোষ এসে সুনীলকে শাঁসিয়ে যায় । শেখরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে সুনীল । না, মদ-জুয়ার আড্ডাখানায় শেখরকে খুঁজে পাওয়া যায় না । অবিনাশ, সুবিমল, পরীক্ষিত, নুরুল— সবাই আছে ওখানে, শুধু শেখর নেই । শেখর নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে । অবশ্য খুব চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ওঠে না সুনীল । শেখরটা অমনই । ছোটবেলা থেকেই সে দেখে আসছে ।
তিন-চারদিন পরেই শেখরের খোঁজ পাওয়া যায় । সে বীণার ৫নং বাড়িতে আছে । বীণা মেয়েটি রক্ষিতা, দেহব্যবসা তার পেশা । তবে শেখরের সাথে বীণার শুধুই দেহ-লেনদেনের সম্পর্ক নয়, এর চেয়ে বেশি কিছু । বন্ধুরা সবাই জানে ।
খোঁজ পেতেই সুনীল, অনিমেষ, সুবিমল— বন্ধুরা সবাই গিয়ে হাজির হয় বীণার ৫নং বাড়িতে । সেখানে গিয়ে আরেকটি নতুন মেয়েকে দেখতে পায় ওরা— সাধনা ।
সাধনা বীণার বোন এবং উপন্যাসটির সবচেয়ে ট্রাজিক চরিত্র । একসময় যে সন্তান ছেড়ে পরপুরুষের হাত ধরে পালিয়ে যায়; সেই ছেলেকে ফিরে পেতে সাধনা শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে যায় । শেখর, অবিনাশ, সুনীলরা সাধনার সন্তানকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে কারাবাসে নিক্ষিপ্ত হয় । যদিও একরাত মাত্র । জেল থেকে মুক্ত হয়ে তারা আবার মেতে উঠে উল্লাসে পুরনো সেই মাতলামি ও নোংরামিভরা জীবনের জয়ধ্বনি করতে করতে ।

বেশ্যালয়ে গমণ, মদ্যপান, হই-হুল্লোড়ে সুনীলের প্রাত্যহিক জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটলেও মাঝে মাঝেই সে সব দুরন্তপণা নোংরামি মাতলামি ছেড়ে ছুঁড়ে একজন শুদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠার জন্য তুমুল লড়াই চালায় । কিন্তু সুনীল হেরে যায় । বার বার হেরে যায় । সবশেষে তাকে মদের টাকা জোগাড়ের জন্য বন্ধুবান্ধবের সাথে রাস্তায় ভিক্ষা করতেও দেখা যায় । তবে সবকিছু মাড়িয়ে পাঠকের সামনে বার বার সুনীলের একটি প্রেমিক হৃদয় ভেসে উঠে; সে হৃদয় কখনো গায়িত্রীর জন্য, কখনো মণীষার জন্য, কখনো বা যমুনার জন্য । সে হৃদয় নিষ্পাপ, বিন্দুমাত্র নোংরামির স্পর্শ নেই ।

১১টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেয়ালের ছবি আর বই এর পাতায় আধিপত্য দেখে ! অথচ বন্দর আর কড়িডোরের অসম চুক্তিতে সব শিয়ালের এক রা॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:১২


দেশ বিক্রির পরীক্ষিত ঠিকাদার....



দেয়ালের ছবি দেখলেই ভারতীয় আধিপত্য, আর বন্দর বেচে দিলে নীরবতা কেন?

দেয়ালে একটা ছবি আঁকা দেখলেই যাদের মুখে ফেনা উঠে যায় - "বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×