কল্পনা চাকমা সেই কবে জলপাই রঙের চার চাক্কার কী এক অতি আশ্চর্য বাহনে করে উড়তে উড়তে কোথায় চলে গেছেন !
এতদিনে জনতার শুধু বাহনের রঙটা মনে আছে । বাকীসব ভুলে গেছে ।
কোথায় গেছেন ? স্বর্গে না নরকে ? তা কেউ বলতে পারবে না । তবে এমন কোথাও গেছেন যা শুধু মানুষের কল্পনায় অস্তিত্বশীল । কল্পনা চাকমা কল্পরাজ্যে চলে গেছেন । সেই কবে । পৃথিবী ছেড়ে যাবার সময় তাকে ঘিরে ছিল একদল কি জানি ! পায়ে সশব্দ বুট, গায়ে জলপাইরঙের ইউনিফর্ম । ওরা ফেরেশতা না শয়তান, দেবতা না অসুর- এটা নিয়ে তর্ক আছে, মীমাংসা নেই । তবে কল্পনা চাকমাকে সুপারন্যাচারেল পাওয়ারের মাধ্যমে যেভাবে ওরা মুহূর্তেই পৃথিবী থেকে কল্পরাজ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তা দেখে জনতা নিশ্চিত, ওরা ঈশ্বরের নিকটবর্তী কেউ ।
কল্পনা চাকমার পর এবার রমেল চাকমা । সেই জলপাই রঙের অতি আশ্চর্য বাহন । সশব্দ বুট । জলপাইরঙের ইউনিফর্ম । অদ্ভুত অজ্ঞাত ওরা ! ওরা ঘিরে ধরেছে রমল চাকমাকে আর রমেল চাকমাও গায়েব ।
জনতার মধ্যে যারা চোখ মেলে আছে তারা ঘটনাটা বিশ্বাস করে । আর চোখ মেলেও আন্ধা তারা শুধু অবিশ্বাসের অন্ধাকারেই দেখছে চারদিকে !
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মিশ্রণে আলোচনা কিন্তু একটাই । রাস্তায়-হাঁটে-ঘাটে-চায়ের টেবিলে সবখানে শুধু— রমেল চাকমা !
দেশে, দেশের সীমানা পেরিয়ে দেশের বাইরেও ।
অফিস সেরে প্যারিসের লনলি অ্যাপার্টমেন্টে টিভি সেট খুলে প্রবাসী বাঙালি বলে ওঠে— জেসাস খ্রাইস্ট !
হ্যাঁ, জেসাস খ্রাইস্ট ! জেসাস খ্রাইস্ট আর রমেল চাকমা । দুইজনেই ঈশ্বরের সন্তান ! ঈশ্বরের কাছেই ওরা সবচে’ নিরাপদ । তাই বোধহয় যিশুর মত রমেলকেও ঈশ্বর নিরাপদে নিয়ে গেছেন ! তাছাড়া, পাহাড়-টাহাড়ে এখন যে পরিমান এনাকোন্ডার উৎপাত । এনাকোন্ডার পেটে যাওয়ার আগে ঈশ্বর নিয়ে গেলেন । ভালোই হল !
প্যারিসের লনলি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে এবার ফিরে আসি শাহবাগের পানশালায় ।
চার প্যাগ হুইস্কি মারা শেষে পঞ্চম প্যাগে জনপ্রতিনিধি ঢেকুর তোলে !
আজকাল কী হচ্ছে এসব, বুঝি টুঝি না । কেয়ামত বোধহয় সামনে ! অবৈধ ব্যালেন্স যা আছে দ্রুত খোদার ব্যাংক-অ্যাকাউন্টে পাঠায়া দে ! দোযখে জ্বলতে চাই না ! আমলনামা ক্লিন রাখতে হইব ।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জনপ্রতিনিধির ডান কাঁধে ভরসার হাত রেখে বলে— গুজব ! স্রেফ গুজব স্যার ! পাহাড়ে তো সব আদিম স্যাভেজগুলা থাকে । ওদের প্রতি সিম্প্যাথি দেখাইতে গিয়া দেশের মানুষগুলা সব মধ্যযুগের আন্ধারে ডুবে যাচ্ছে ! কুসংস্কারাচ্ছন্ন পাবলিকরে সচেতন কইরা তুলতে হবে ।
তারপর শিক্ষাবিদ তার আগামিকালের পত্রিকার কলামের জন্য একটা হট এন্ড সেক্সি টাইটেল ঠিক করে : পৃথিবীটা কবে সভ্য মানুষের কবলে আসবে ?
পানশালা থেকে চলে আসি শাহবাগে মোড়ের টি স্টলে । রাতজাগা বিপ্লবীদের আড্ডায় । বিপ্লবীদের প্রায় সবার টি শার্টের বুকে কিংবা পিঠে ঝুলন্ত ব্যাগে চে গুয়েভারা ছবি । চে বিপ্লবী, তারাও বিপ্লবী । কিন্তু রমেল ! রমেল চকমা কে !
আহা নিরীহ বেচারা ! বুর্জোয়া শালারা আর কতকাল নিরীহদের গিলে খাবি ! বিপ্লবীরা জড়ো হয় । ৭০-৮০ জন । মিছিল হয় । সমাবেশ হয় । মোমবাতি হাতে স্লোগান ওঠে, জ্বালো, জ্বালো ... । মিছিল বিশ কদম এগুলো ৫৫০ জনের পুলিশ ফোর্স ঝাপিয়ে পড়ে ৮০ জনের উপর ।
এবার চলে আসি আমি যেখানে বাদুড়ের মত ঝুলছি । জ্যামরত লোকাল বাস । আধঘণ্টা আটকে আছে ! কিন্তু উপায় নাই, ঝুলে আছি । নামলেই অন্য কেউ ঝুলে পড়বে আমার এখানে । যাত্রীদের উত্তম-মধ্যম গায়ে পড়ার আগে হেল্পার জোরে জোরে হাঁকায়- রমাল ! রমাল চাইকমার খুনের প্রতিবাদে মিছিল চইলতাছে !
খুন ! বাসের জনতা তাজ্জব হয়ে যায় ।
ধরলাম, যা শুনছি । যা দেখছি । সব গুজব । ভুয়া ।
তবুও... খুন ! মানা যায় না । প্রতিটা খুনের পিছনে এক বা একাধিক খুনি থাকে । খুনিকে ধরবার জন্য আইন থাকে, আইন অনুযায়ী চেষ্টা চলে ! গুম করে দিলেও পৃথিবীর কোথাও না কোথাও খুন হওয়া লাশটার বস্তুগত অস্তিত্ব থাকে । সে লাশ ধরে কেউ না কেউ কাঁদে । কাঁদাকাঁদি শেষে কাঁধে ভর করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় ! নয়লে সোজা চিল বা শকুনে খেয়ে ফেলে ।
কিন্তু রমেল চাকমার বেলাই তো এসবের কিছুই ঘটল না ।
তয়লে ?
জনতা হতভম্ভ ।
কিন্তু ... কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্যকিছুর বেলায় ? ধরেন, একটা ছারপোকা !
হ্যাঁ, সেটাই । জনতা একমত হয়— রমেল আর যাইহোক, মানুষের বাচ্চা না !
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



