somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ এক টুকরো সবুজ বনভূমির সন্ধানে

২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত্রি গভীর হতে হতে ভোরের দুয়ারে কড়ানাড়া । টের পেয়ে গেছে মনসুর ।
চোখজুড়ে ঘুমের তাণ্ডব, তবুও অস্বস্তি, গরম, যেন পুড়ে যাচ্ছে সারা শরীর । না, আর পারছে না । চোখের পাতা জোর করে মেলে বিছানায় উঠে বসে মনসুর । গেঞ্জিটা খুলতে যেতেই অবাক হয়, পুরোটাই ভেজা ! শুধু কি গেঞ্জি ? এতক্ষণ যেখানে শুয়েছিল, সেই বিছানার চাদরটাও পর্যন্ত, একদম ভিজে ছুপছুপ ! জল নয়, ঘাম । এখনো ঘামের স্রোত বয়ে চলেছে মনসুরের শরীরজুড়ে ।
ইলেকট্রেসিটি অন, এসি অন, মাথার উপর সিলিং ফ্যানটাও জোরসে ঘুরছে, তবুও... কী আজব ব্যাপার ! তবে ? তবে কি...
কিছু ভেবে পায় না মনসুর ! ক্যামনে পাবে ! মগজটা যেন ফুটন্ত পানিতে ডিমসিদ্ধ হওয়ার মত ফুটছে ! নিঃশ্বাস নিচ্ছে, নাকি জ্বলন্ত শরীরের ধোঁয়া গিলছে, বুঝে ওঠা মুসকিল ।
এতটা তীব্র গরম এর আগে কখনো অনুভব করে নি মনসুর । আসল ব্যাপারটা কী ?
ঘামের স্রোত তো কিছুতেই থামছে না, বয়েই চলেছে ।
মনসুর এবার বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় । ফ্লোরে পা ফেলতেই... ফ্লোর ... নাকি জ্বলন্ত কয়লার কার্পেট ! পায়ের পাতায় যেন ফোসকা পড়ছে !
মাথার তালু থেকে পায়ের পাতা... আপদমস্তক । একটাই অনুভূতি । গরম, গরম, গরম ! জ্বলে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে ! না, গায়ে এটা প্যাঁচিয়ে রেখে আর কাজ নেই । গেঞ্জির পর হাফ-প্যান্টটাও খুলে নেয় মনসুর ।
জানলাগুলো খুলে দেয় । না, তেমন কোনো পরিবর্তন নেই । কিন্তু জানলার বাইরে হাত দুটি মেলতেই একটা পার্থক্য ধরা পড়ে মনসুরের কাছে, বাইরের তাপমাত্রা কিছুটা কম, দ্রুত দরজা খুলে দিশেহারার মতো বাইরে ছুটে যায়, ভুলে যায় তার শরীরে একটুকরো কাপড়ও নেই । গেট খুলে বাগানের পাশে দাঁড়াতে আগের থেকে একটু ভালো বোধ হয় । কিন্তু এখানের তাপমাত্রাটাও সহনীয় পর্যায়ে নেই । বাগানের রাস্তা ধরে আরেকটু এগিয়ে যায় ।
হঠাৎ নিজের ন্যাংটাদশা মনসুরের নজরে আসে । সে কি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছে ?
দ্রুত দু’হাত দিয়ে যতটুকু সম্ভব লজ্জা ঢেকে সে বাসার দিকে মুখ ফেরাতেই যা দেখে তা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, মর্মান্তিক ! বাড়িটা দাউ দাউ আগুনে জ্বলছে, জ্বলে-পুড়ে ধ্বসে যাচ্ছে, খসে খসে পড়ছে ইট-বালি-রড-সিমেন্ট-রঙ সব, এদিক-ওদিক আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে, উত্তাপ ! ক্রমশ বাড়ছে তো বাড়ছেই ! কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনসুর লক্ষ করে, আগুন এগিয়ে আসছে, ধেয়ে ধেয়ে এগিয়ে আসছে ! না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই বিভীষিকা দেখে নিজেকে আর বিপন্ন করে তোলবার কোনো মানে হয় না । পালাতে হবে । প্রাণটা বাঁচাতে হবে । দৌঁড় ! দাঁত-মুখে খিঁচে দৌঁড়াতে থাকে মনসুর ।

পুবের আকাশে সূর্যের পূর্ণ আবির্ভাবের পর মনসুর দৌঁড় থামায় ! তেষ্টা পেয়েছে, ভয়ানক তেষ্টা । শরীর থেকে অঝরে ঘামের বৃষ্টি ঝরলেও গলায় যেন বিশুষ্ক মরুর জলতেষ্টা ! এদিক-ওদিক তাকায়, একটু জলের সন্ধান যদি কোথাও পাওয়া যায়, খাল-বিল-পুকুর-কুয়া সব তো শুকনো থকথকে হয়ে আছে ! মনসুর বুঝে যায়, এমন ভয়ানক বিভীষিকার মধ্যে আর বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব নয়, তবুও চেষ্টা চালাতে হবে, সামনেই এগুতে হবে, পৃথিবীর কোথাও যদি এক টুকরো শীতল ভূমি পাওয়া যায়, যেখানে এখনো এই ভয়ানক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার আঁচড় লাগে নি । তার আগে একটু বিশ্রাম চাই । যদিও তেষ্টায় বুক পড়ে যাচ্ছে, তবুও দাঁত খিঁচে পড়ে থাকতে হবে । বুকভর্তি হাহাকার নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে একটা গাছের ছায়তলে ধপাস করে বসে পড়ে মনসুর ! ঊর্ধ্বে তাকায় । পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখে, বৃষ্টি তো দূরের কথা, মেঘের ছিটেফোটাও নেই, আকাশে শুধু একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডের একক প্রভুত্ব ! সূর্য থেকে দৃষ্টি যখন গাছের পাতায় নেমে আসে, রং দেখে আঁতকে উঠে মনসুর ! এই অজ্ঞাত সর্বনাশা বিভীষিকার হাত থেকে গাছের পাতাগুলোও পর্যন্ত রেহাই পায় নি ! মনসুর গাছের পাতাগুলোকে ভালোমতে দেখে, বার বার দেখে, একটা পাতাও সবুজ নেই, মরে জ্বলে পুড়ে সব পাতা ধূসর হয়ে গেছে !
হঠাৎ একটা আইডিয়া খেলে গেল মনসুরের মাথায় । অস্বাভাবিক তাপের দহনে তার শরীর যে ঘামের স্রোত বইছে, তাই সে পান করবে, তেষ্টা না মিটুক, গলাটা তো ভিজবে । হাত-পা ছেটে, পিঠ-পেট-বুক-কপাল মুছে যতটুকু লবণাক্ত জল পেল ততটুকু এক ঢোকে গিলে ফেলে । তীব্র বমির উদ্রেক ! নাড়িভুড়িসহ পেটের যা কিছু আছে সব যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু মনসুর আটকে রাখল, দাঁত-মুখ খিঁচে ঠেকিয়ে রাখল !
তারপর খা খা মরুর শূন্যতার ভিতর চোখ বুজে শরীর সব ভাঁজ খুলে দিয়ে গাছের ছায়াতলে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে মনসুর; কিন্তু বিপন্ন পদধ্বনিগুলো যখন কানের পর্দায় এসে আঘাত হানল, কিছুটা সান্ত্বনা মিলল মনে, দুর্যোগটা তার একার নয়, দুর্যোগটা সবার । সে দেখল, স্বচক্ষে তাকিয়ে দেখল, ওই যে, অগণিত দিশেহারা মানুষ, সবাই নগ্ন, সবাই বিপন্ন, সবাই উত্তাপে যেন গলে যাচ্ছে, খা খা জলতেষ্টায় ঝিমিয়ে পড়ছে ! তবুও ওরা কেউ থামছে না । বিশাল মিছিল, এগিয়ে যাচ্ছে, ছুটে চলেছে, অসহ্য তীব্র দহন থেকে মুক্তিলাভের প্রত্যাশা নিয়ে সবাই ছুটে চলেছে কোনো অজ্ঞাত অচেনা একটুকরো সবুজ বনভূমির সন্ধানে !

না, হাল ছাড়া চলবে না, আশ্রয় একটা খুঁজে বের করতে হবে, নিরাশ না হয়ে ওই চলন্ত আশাবাদী পাগুলোর সাথে মিশে যেতে হবে— শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ায় মনসুর !

সভ্যতার সবকিছু জ্বলে পুড়ে ধ্বসে গেছে ! মানুষের মগজ থেকেও পোড়া গন্ধ বের হতে শুরু করেছে । তবুও পা গুলো থামছে না ! এক টুকরো সবুজ বনভূমি পৃথিবীর কোনো এক কোণে হয়ত এখনো গাপটি মেরে লুকিয়ে আছে । ওরা তা খুঁজে বের করবে ! সেখান থেকেই ওরা আরেকটা নতুন জীবনের নির্মাণ শুরু করবে, আরেকটা নতুন পৃথিবীর মানচিত্র আঁকবে, সব ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন মুছে ফেলে আরেকটা সভ্যাতা গড়বে ।
মনসুর ওদের পায়ের ছন্দে পা মিলিয়ে সামনে এগিয়ে যায় !
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:১৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২


একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা
শুধু ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলাই নয- বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - প্রমাণ

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১২



ব্লগার সাহেব আমেরিকা থেকে লিখেছেন, “অমুক আসলে মুক্তিযোদ্ধা নন।”

আমি বন্ধুকে ফোন করলাম।
বললাম, “তুমি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?”

সে বলল, “বুঝতে পারছি না।”

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×