ঘটনাটা অন্যরকম, এরকম একটা ঘটনা ঘটার দুইটা কারন হতে পারে, ১) অতি প্রাকৃত অথবা ২)আমার মাথা ঠিক ছিলনা। মাথা ঠিক ছিলনা বললাম কারন আমি কয়দিন আগে বলিউড পুরান একটা মুভি দেখেছি এই ধরনের যেটাতে দেখায় যে নায়িকা কাজল তার বাড়ি থেকে বের হয় হাসিখুশি বাজার করে ফেরার পথে আর মনে করতে পারেনা সে কে, কি তার পরিচয় কোথা থেকে সে এলো পড়ে সেটা কোন মানসিক রোগ হিসেবে দেখায়।
আর অতি প্রাকৃত বলেছি তার কারন আমি অনেকটা এই রকম একটা ঘটনা শুনেছি কিছু মানুষের কাছে, যে কিছু জীন ভুত আছে যারা মানুষের কোন ক্ষতি করেনা শুধু পথ ভুলিয়ে হাঁটায়, আমাকে দুইজন স্বামী স্ত্রী তাদের এক্সপেরিন্স করা এক ঘটনা বলেছিল, তা হল এক রাতে মহিলার স্বামীর হার্ট অ্যাটাক করার পর রাত ৩ টায় যখন নীচে নেমে দাঁড়ালো রিক্সা বা গাড়ির জন্য তখন নাকি এক অদ্ভুত রিক্সাওয়ালা যেন হাওয়া থেকে উদয় হল এবং তাদের হাসপাতালের গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে ভাড়া না নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলো, ঘটনাটা ছিল কুরবানি ঈদের সময় তাদের মতে তাদের অতি প্রাকৃত কিছু সাহায্য করেছে। এইসব কিছু শুনে সব মিলিয়ে আমার কাছে এও মনে হচ্ছে যে আমার ঘটনাটা অতি প্রাকৃত।
যাই হোক আমার পথেঘাটে প্রসঙ্গে আসি,
টি,এস,সির গণমাধ্যমের কোন একটা কোর্সে ক্লাস করতাম আমি, বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ক্লাস। ওই দিন ক্লাসে মন বসছিলনা তাই আমি পাঁচটায় ক্লাস থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম, শাহবাগ যাব ওখান থেকে বাসে উঠে সোজা বাসায় ফিরবো এইই ইচ্ছা। রিক্সা নিবো এই পর্যন্ত পরিস্কার মনে আছে।
তারপর…………
তারপর আমি মনে করতে পারি ভাসা ভাসা, রিক্সা নিয়ে শাহবাগ যাবার ইচ্ছেটা মাথা থেকে যেন মুছে গিয়েছিলো আমার, আমি হাঁটছিলাম আর হাঁটছিলাম, কেন হাঁটছিলাম কি জন্য হাঁটছিলাম আমি মনে করতে পারিনা, একবার মনে হল আমি পার্কের ভেতরে হাঁটছি, একবার মনে হল সরোয়ারর্দি উদ্যান এর দীঘির পাশে যে উঁচু ডিবিটা আমি সেটায় উঠার চেষ্টা করছি এবং তাতে আমার বেশ ক্লান্ত লাগছে, আধো আলো আধো অন্ধকারে কুয়াশা পূর্ণ রাতে আমার দেখতে কষ্ট হচ্ছিল কোথায় পা ফেলছি, কিন্তু আমি এক মুহূর্ত ও থেমে ছিলাম না আমি এমন ভাবে হাঁটছিলাম যেন আমার কোথাও খুব দ্রুত যাওয়ার তাড়া, যেন এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করা যাবেনা, সাথে এটাও অনুভব করতে পারছিলাম আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
এভাবে একই পথে হয়ত আমি চক্রাকারে হেঁটেছি, শীতের দিনের সন্ধ্যা ৫ টায়ই হয়ে যায়। ওই অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর মুহূর্তগুলো আমার অল্প কিছু মনে পড়ে, একবার মনে হল ভয় লাগছে, একবার দেখলাম কুয়াশায় সব সাদা হয়ে যাচ্ছে, হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যাথা করছে, কিন্তু হেঁটেই যাচ্ছি, হঠাৎ হঠাৎ যেখানে নিয়নের আলো ছড়িয়ে আছে সে রকম জায়গা অতিক্রম করার সময় আমি থেমে যেতে চাইছি। এই হাঁটাহাঁটি চলল বিকাল ৫ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত। যখন আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম যখন আমি বুঝতে পারলাম কিছু একটা সমস্যা এবং দাঁড়িয়ে যেতে সক্ষম হলাম, এদিক ওদিক দিশেহারার মত তাকাতে লাগলাম, আমি ঠিক কোন জায়গাটায় ছিলাম চিনতে পারছিলাম না, কার্জন হল এর আশেপাশে কিংবা সেটা অতিক্রম করে আরও দূরে কোথাও ছিলাম হয়তবা, আমি এখনো ওসব কিছু অনেক চিন্তা করেও মনে করতে পারিনা, শীতের কনকনে ঠাণ্ডা ওই মুহূর্তে আমার ভেতরটা কাঁপিয়ে দিলো, আমি ভয় পেয়েছি তা নয় আমি অদ্ভুত অবাক আর অন্যরকম কোনখানে পৌঁছে গেছি এরকম বোধ হচ্ছিলো, মিনিটখানেক আমি ছাড়া কোন প্রানের অস্তিত্ব দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলোনা।
ঘটনাটা অনেক অবিশ্বাস্য কিন্তু ব্যাপারটা আমার সাথে হয়েছে, আমি দিশেহারা অনুভব করলাম ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলাম কিন্তু সেটা বন্ধ। মোবাইল কি করে বন্ধ হয়ে গেছে জানিনা। আমি আবার চারপাশে তাকালাম এবার আমি রাস্তার অপর প্রান্তে তাকে দেখতে পেলাম।
এক রিকশাওয়ালাকে। তিনি যেন রাস্তার কংক্রিট, নিয়নের লাইটের পিলার অথবা স্তম্ভিত গাছের অংশবিশেষ এর মত নিঃশব্দ হয়ে তার রিক্সা নিয়ে বসে আছে। একমুহূর্ত দেরি না করে আমি তার কাছে দৌড়ে গেলাম, বললাম যাবেন ?
যাবেন কথাটা শোনালো রুক্ষ বয়স্ক জমে যাওয়া বুড়িদের আওয়াজের মত, আমার গলার আওয়াজ একটা অন্যরকম টোণে রূপান্তরিত হয়েছে, এটা আমার গলার আওয়াজ না। আমি আমার গলার আওয়াজ পরীক্ষা করার জন্য আবার কথা বললাম কয়টা বাজে!? আবারো একই ধরনের খুবি বাজে অচেনা বিচ্ছিরি খসখসে গলা শুনতে পেলাম, আমি চমকে উঠলাম, রিকশাওয়ালা ইতিমধ্যে জবাব দিলো, সাড়ে আটটা, আমার সেদিকে খেয়াল নেই, আমি চারপাশে তাকালাম চারপাশ এখনো অচেনা, আমি আরও কথা বললাম কেবল নিজের কণ্ঠ যাচাই এর জন্য, কথা বুড়িদের মতই শোনাচ্ছে এবং এটা আমার কণ্ঠ না, ঠিক কি বলছিলাম তখন হালকা ভাবে মনে করতে পারি, আমি হয়ত বলছিলাম এটা কোন জায়গা! আমি টিএসসির ওদিক থেকে রিকশায় উঠবো ভেবে ভুলে হেঁটে হেঁটে কই চলে এসেছি! রিক্সাওয়ালা কোন উত্তর দিলনা, বেশ ঠাণ্ডা আবহাওয়া অতিক্রম করতে করতে আমি আস্তে আস্তে আমার চারপাশ চিনতে পারলাম, ওইতো দোয়েল চত্বর, ওইতো টিএসসি, ওইতো আর্টস ফ্যাকাল্টির গেট, এইতো এইমাত্র চারুকলার গেট পাড় হলাম, খুব অল্পসময়ের ভেতরে যেন উড়ে উড়ে আমি শাহবাগ পৌঁছে গেলাম, দেখলাম একটা বিআরটিসি তখনি এসে দাঁড়ালো, আমি মরিয়া হয়ে রিক্সা ভাড়া দেয়ার জন্য ব্যাগ হাতড়াতে লাগলাম কোথাও টাকা খুঁজে পাচ্ছিনা, বারবার খুঁজলাম আমার মাথায় কাজ করছে বাস ধরার তাড়া, এটায় না উঠতে পারলে আমার বাসায় ফিরতে আরও দেরি হবে, রিক্সাওয়ালা বলল আপনি জানগা ভাড়া আরেকদিন দিয়েন, আমি তার মুখের দিকে তাকালাম, তার পুরো মুখ শরিল চাঁদর দিয়ে প্যাঁচানো, হতে পাড়ে শীতের জন্য, আমি বললাম আপনাকে আর একদিন ভাড়া কিভাবে দেব আপনাকে তো চিনিনা, তাইলে দেওয়া লাগবেনা, আপনি যান তাড়াতাড়ি বাস ছেড়ে দিতাছে, তাকিয়ে দেখলাম আসলেই, জীবনে যা করিনি তাই করলাম আমি তার ভাড়া না দিয়ে লাফ দিয়ে বাসে উঠলাম, বাস ভাড়া দেয়ার সময় ঠিকঠাক টাকার ব্যাগ খুঁজে পেলাম। আমার কণ্ঠ ততক্ষনে আমার নিজস্ব কণ্ঠে ফিরে এসেছে।
বাসায় ফিরলাম নয়টা চল্লিশের দিকে, গেট খুলে আমার আম্মু প্রথমেই বলল কিরে কালো হয়ে গেছিস কীভাবে! আমি স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিলাম উফ কি যে বলনা, শীতে মা শীতে, বাইরে কত ঠাণ্ডা কল্পনাও করতে পারবেনা, (বাবা মা কে কখনোই কোন প্রব্লেমের কথা কিছু বলিনা তাদের টেনশন ফ্রি রাখতে) রুমে ঢুকে আয়নায় দেখলাম গায়ের রঙ ঠিক কালো না কেমন নিলচে হয়ে গেছে আর চোখ দুটো লাল টকটকে। আমি বিছানায় মাথাটা ছোঁয়াতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙ্গল পরদিন বেলা ১ টায় মা বহুবার এসে আমাকে ডেকে গেছে, কিন্তু আমার ঘুম এতই গাড় ছিল যে আমি একটু টু শব্দ ও শুনতে পাইনি।এই ঘটনা আমার সাথে একবারই ঘটেছে। এবং বিধাতার কাছে শুকরিয়া যে কোন বড় ধরনের বিপদে পড়িনি।
বিঃ দ্রঃ এটা কোন গল্প নয় আমার জীবনে পথে ঘাটে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


