
তুমি আমাকে যে জায়গায় রেখে গিয়েছিলে, সেই জায়গাটা ধীরে ধীরে একটা ভূগোল হয়ে গেছে। সেখানে সময়ের নিজস্ব কোনো ঘড়ি নেই, ঋতুর আলাদা নাম নেই, কেবল স্থিরতা আছে, যেন দুপুরবেলা থেমে থাকা কোনো জনশূন্য মাঠ। তুমি চলে যাওয়ার পর প্রথম যে জিনিসটা বুঝেছিলাম, তা হলো মানুষের ভেতরেও মাটি জমে। বাইরের চোখে তাকে মানুষই দেখা যায়, কিন্তু তার ভেতরে আস্তে আস্তে ধুলো বসে, ঘাস ওঠে, অদৃশ্য শিকড় ছড়িয়ে পড়ে।
তোমার চলে যাওয়ার গতি ছিল ঝড়ের মতো, কিন্তু ঝড়ের অন্তত শব্দ থাকে। তোমার যাওয়ার মধ্যে সেই শব্দটুকুও ছিল না। যেন হঠাৎ এক দরজা বন্ধ হয়ে গেল, আর তারপর ঘর থেকে কোনো আওয়াজ এলো না। শুধু শ
শব্দটা বাতাসে ঝুলে রইল। সেই সময়টা এখনো স্থির, যেন কাটা আঙুলের ডগায় রক্ত জমে আছে, লাল কিন্তু উষ্ণ, ব্যথাহীন কিন্তু অস্বীকার করা যায় না।
তারপর আমার আকাশে মেঘ বৃষ্টি ঝড় সবকিছু আসা বন্ধ হয়ে গেল। মানে মানুষের ভেতরে যে একটা আকাশ থাকে। সেখানে এখন ভেসে বেড়ায় স্মৃতি, ভয়, প্রত্যাশা। সেখানে আর কোনো মেঘ উড়ল না। বৃষ্টি এলো না বলে জমাট ধুলো জমতে লাগল। কান্নাও যেন নিজেকে প্রত্যাহার করে নিল, কারণ কখনো কখনো দুঃখ এত পুরোনো হয়ে যায় যে জলও তাকে ছুঁতে চায় না।
আমি বুঝতে পারলাম, আমি আর হাঁটছি না, আমি আসলে গাছ হয়ে যাচ্ছি। হাতের ওপর শিমুলের কাঁটা ওঠে, চুলের ফাঁকে শিকড় নেমে যায়, পায়ের নিচে মাটি আমাকে ধরে ফেলে। যেন পৃথিবী নিজেই বলছে, এখন আর নড়ো না, এই জায়গাটাই তোমার ঠিকানা। শিমুলের কাঁটা দূর থেকে লাল ফুলের মতো লাগে।
নিজেকে অনেকবার বলেছি, আর অপেক্ষা করব না। কিন্তু অপেক্ষা সবসময় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো কখনো সেটা ভেতরের বিশ্বাসে জমে থাকা এক ধরনের শাস্তি। স্বর্গ আর নরকের মতো কিছু অদৃশ্য ধারণা মানুষকে থামিয়ে রাখে, সামনে পা বাড়াতে দেয় না। মনে হয়, যদি এগোই, তবে হয়তো কোনো অদেখা নিয়ম ভেঙে যাবে।
কখনো মনে হয়, তুমি পৃথিবীর সব তাপ শুষে নিয়ে নিজেকে পাথর বানিয়ে ফেলেছ। পাথর মানে অনুভূতিহীন, এত বেশি তাপ নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা যে বাইরে আর কোনো উষ্ণতা বোঝা যায় না। আর তখন আমারও ইচ্ছে হয়, আমিও পাথর হই। কারণ মাটি হলে শিকড় জন্মায়, গাছ হলে কাটা লাগে, কিন্তু পাথর হলে অন্তত কেউ বুঝতে পারে না ভেতরে কতটা ধ্বংস চলছে।
এমন পাথর যে নিজের কান্নাকে এমনভাবে জমিয়ে রাখে, যাতে তা আর শব্দ না করে। বাইরে থেকে স্থির আর ভেতরে বহু যুগের চাপা আগ্নেয়গিরির মত জলন্ত পুড়ে ছাড়খার।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


