somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সামিয়া
ব্লগের স্বত্বাধিকারী সামিয়া

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন এক অদ্ভুত ব্যস্ততায় ভরা। হঠাৎ চোখে পড়ল একজন মানুষকে।
হাতে থাকা লাঠিটা ঘুরিয়ে এমন কায়দায় একটা ভাঁজ করা চেয়ারে পরিণত করল যে দূর থেকে দেখে মনে হলো যেন কোনো যাদুকর খেলা দেখাচ্ছে। স্টীলের লাঠির সাথেই ছোট্ট রাউন্ড একটা সীট এটাচ করা ওটায়, চেয়ারটায় বসতে গিয়েই আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিল সে।
আমি তাকিয়ে রইলাম, চেনা চেনা লাগছে।
কয়েক সেকেন্ড পরই চিনতে পারলাম, লোকটার নাম মাহবুব।
আমার চাকরি হারানোর পেছনে যাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল, সে তাদেরই একজন।
পাঁচ বছর পর দেখা।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তাকে দেখে আমার রাগ হলো না। বরং একধরনের কৌতূহল আর অদ্ভুত মমতা জেগে উঠল মাহবুবও আমাকে দেখে থমকে গেল।
তার চোখের কোণে বয়সের রেখা। চুলে পাক ধরেছে আগের সেই কঠোরতা আর নেই।
-আরে রফিক সাহেব?
আমি মৃদু হেসে বললাম,
- হ্যাঁ, আমি
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। মনে পড়তে লাগল পুরনো দিনের কথা। দুপুরে কাজের চাপে পাঁচ মিনিট দেরি করে ক্যান্টিনে গেলে সে এমনভাবে বলত যেন আমি ভিক্ষা চাইতে এসেছি।
- খাবার শেষ। এত দেরি করে আসেন কেন?
আমি জানতাম খাবার তখনও আছে। তবুও সে আমাকে ফিরিয়ে দিত
কখনও এডমিনে ওষুধ চাইতে গেলে বলত,
- আপনাদের জন্য কি আলাদা হাসপাতাল খুলে বসে আছি?"
সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে এমনভাবে কথা বলতো, যেন আমি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে অযোগ্য কর্মচারী। একবার তো শুধু একটি ফাইল দেরিতে জমা দেওয়ার কারণে পুরো অফিসের সামনে অনর্গল নোংরা ভাষায় কথা শুনিয়েছিল, কি বাজে একটা সিচুয়েশন পার করছিলাম শুধু আমার আল্লাহই জানতো।
সেদিন বাড়ি ফিরে মায়ের সামনে হাসার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখে নিজেই বুঝেছিলাম কতটা অপমানের সহ্য করার পরাজিত বাতিল চেহারা ওটা।

মাহবুব তার অদ্ভুত চেয়ারে বসে বলল,
- কেমন আছেন?
- ভালো। আপনি?
লোকটা হাসল। সেই হাসিতে আগের দাপট ছিল না বলল,
- ভালো আছি, সত্যি বলতে কী চলছে
আমি লক্ষ্য করলাম, তার ডান পায়ে সমস্যা হয়েছে হাঁটার সময় কষ্ট হচ্ছে, কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সে নিজেই বলল,
- আপনার কাছে একটা কথা বলার ছিল হয়তো তাই আজকে আপনার সাথে দেখা হয়েছে।
আমি চুপ করে রইলাম।
- তখন অনেক অন্যায় করেছি।
কথাটা শুনে অবাক হলাম না একটু অস্বস্তি লাগল।
কারণ আমি কখনও কল্পনা করিনি, এই মানুষটি কোনোদিন নিজের ভুল স্বীকার করবে।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
- বড় ডেজিগনেশন ছিল, ক্ষমতা ছিল মনে হতো সবাইকে ধমক দিয়ে রাখতে হবে। মানুষকে মানুষ মনে করতাম না সে সময়,
আমি কিছু বললাম না।
কোর্টের সামনের বটগাছের পাতাগুলো বাতাসে কাঁপছিল।
মাহবুব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
- জানেন, চাকরিটা আমারও নেই এখন।
আমি তাকালাম।
সে মৃদু হেসে বলল,
- যেভাবে আপনাদের বিদায় হতে দেখেছিলাম, একদিন আমাকেও ঠিক সেভাবেই কিংবা তার থেকেও জঘন্য ভাবে আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
তার কণ্ঠে অভিযোগ নাকি ক্লান্তি ছিল বোঝা গেল না।
আমি হঠাৎ অনুভব করলাম, পাঁচ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো তার উপর রাগটা কোথাও আর নেই।
আমাদের দুজনের মাঝখানে শুধু সময় বসে আছে; সময়।
যে সময় মানুষকে বদলে দেয়; ক্ষমতাকে মুছে দেয়, অহংকারকে শেষ করে দেয়, আর অপমান কে ধোঁয়াটে স্মৃতিতে পরিণত করে দেয়।
আমি বললাম,
- চা খাবেন?
মাহবুব সাহেব মাথা তুলে তাকালো; চোখে বিস্ময়; হয়তো ভাবেনি আমি এমন প্রস্তাব দেব।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
- খাব।
আমরা রাস্তার পাশের ছোট্ট দোকানের দিকে হাঁটতে লাগলাম,
দুজন মানুষ; একজন একসময় অপমান করেছিল। আরেকজন একসময় অপমান সহ্য করেছিল।
পাঁচ বছর পর শুধু সময়ের কাছে সমান হয়ে যাওয়া দুইজন মানুষ।

সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ সময়ের ব্যবধানে তারা দুজন

লিখেছেন সামিয়া, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৫৩



কোর্টের সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দুপুরের রোদটা তখন কিছুটা নরম হয়েছে। মানুষের ভিড়, আইনজীবীদের কালো কোট, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর ফাইল হাতে ছুটে চলা লোকজন মিলে জায়গাটা যেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মের অবমাননা রুখতে গিয়ে নিজের ধর্মকেই ছোট করছেন না তো?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৫


সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ধর্ম অবমাননার আবার একটা ঘটনা ঘটলো। ২৩ জুন ২০২৬। প্রিন্স রায় দীপ্ত নামের পঁচিশ বছরের একটা ছেলে নবীজিকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৫ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৫


পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিলেন, আর মুক্তি পেলেন অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে। পুরুলিয়ায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×