
দুঃখের সময়ে নানান মানুষের কথা মনে পড়ে। খুব কাছের মানুষের কথা মনে পড়ে আবার অনেক দূরের মানুষের কথাও মনে পড়ে। রক্তের আপন মানুষের কথা তো মনে পড়েই তবু একদিন কীভাবে যেন সবাই দূরে অনেক দূরে সরে যায়।
মোবাইলের কন্ট্রাক্ট লিস্টে শত শত নাম পড়ে আছে। প্রতিটি নামের পাশে একটি করে ছবি, একটি করে পরিচয়, একটি করে ইতিহাস। তবু রাত গভীর হলে, বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলে, কোনো নামের ওপর প্রেস করে কল করা যায় না, নিয়ম নেই, অপর প্রান্তের বিনীত প্রত্যাখ্যানকে উপেক্ষা করার সাহসটুকু যে হয় না।
জীবনে কথা বলার মানুষ কমে যায় না, কিন্তু কথা বলা যায় এমন মানুষ কমে যায়। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটা অনেক বড়।
একটা সময় দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, অসুখ, দুশ্চিন্তা কিংবা বিপদে মানুষ একা থাকতো না। কারও মন খারাপ হলে আরেকজন টের পেয়ে যেত। আনন্দও লুকিয়ে রাখতো না কেউ কারো থেকে। ছোট্ট একটি সুখ পুরো মহল্লায় উৎসব বানিয়ে দিত।
এখন ভালো লাগার খবর নিজের ভেতরেই থেকে যায়, খারাপ লাগার খবরও তাই। দুটোই নিঃশব্দে বুকের ভেতর জমতে থাকে। আনন্দ বলতে মানুষ এখন নতুন বছর উদ্যাপন করে একা। ছাদে উঠে ফানুস ওড়ায়, ছবি তোলে, সামাজিক মাধ্যমে হাসিমুখ দেখায়। অথচ সেই হাসির ভেতরের নিঃসঙ্গতার খবর কারো রাখার সময় নেই। এটাই আমাদের এ সময়ের পৃথিবী, কি নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে না?।
জীবনে একা হয়ে যাওয়া হঠাৎ ঘটে না। একটু অভিমান, একটু ব্যস্ততা, একটু ভুল বোঝাবুঝি, কিছু না বলা কথা, কিছু না শোনা কথা। তারপর একদিন অহংকার এসে চুপচাপ কাঁধে বসে বলে, আমি একাই পারব, আমার কাউকে লাগবে না।
আমরা সেই কথায় বিশ্বাস করি। ধীরে ধীরে মানুষের বদলে নিজের চারপাশে দেয়াল তুলতে শুরু করি।
দেয়াল কোনো দিনই একদিনে তৈরি হয় না। আজ একটি ইট, কাল আরেকটি। তারপর একদিন দেখি, ওপাশেও মানুষ আছে, এই পাশেও মানুষ আছে, শুধু দেখা হয় না কারও সঙ্গে কারও।
জীবনে বড় হই, চাকরি হয়, পদোন্নতি হয়। বাড়ি হয়, গাড়ি হয়, সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। শুধু যাদের সামনে নিঃসংকোচে কাঁদা যেত, যাদের সামনে কোনো অভিনয় করতে হতো না, যাদের সামনে অবলীলায় কষ্টের কথা বলা যেত, তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
একটা সময় অধিকার ছিল। রাত দুটায় ফোন করার অধিকার, দরজায় গিয়ে দাঁড়ানোর অধিকার, চুপচাপ পাশে বসে থাকার অধিকার, কোনো কথা না বলেও বোঝানোর অধিকার।
এখন আমরা কষ্টের কথাও খুব ভদ্র করে বলি। চোখের জল মুছে ফেলি আগে থেকেই, যেন কারও বিরক্তির কারণ না হয়ে যাই। নিজের দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখাটাই একমাত্র চেষ্টা। বাধ্য হয়েই নিজের যুদ্ধ নিজেই লড়তে হয়, পড়ে গেলে উঠে দাঁড়াতে হয়, উঠে দাঁড়াতে না পারলে ধ্বংস হতে হয়। নিজের কান্না নিজেই মুছে নিজের ভাঙা মন নিজেই জোড়া লাগাতে হয়।
মানুষ টাকা না থাকলে এতটা একা হয় না। সম্মান না থাকলেও না। মানুষ সত্যিকারের একা হয় তখন, যখন তার জীবনে এমন একজনও থাকে না, যার সামনে মুখোশ খুলে রাখা যায়। যার সামনে চুপ থাকলেও মনের যন্ত্রণা প্রকাশ যায়, কান্না লুকানো লাগে না, আর কাঁদলেও নিজেকে ছোট মনে হয় না।
আমরা ব্যক্তি স্বাধীনতা চাইতে চাইতে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে কারও দরজায় কড়া নাড়তেও সংকোচ লাগে অথবা অবধারিতভাবে নিষেধ।
জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, বাড়ি নয়, গাড়ি নয়, পদবি নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ, যাদের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বলা যায়, আজকে আমার মন ভালো নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


