somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: ডাক্তার সাহেব

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৩:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডাঃসঞ্জুমোহন দেব। উনি হাসলে আমার মনে হতো উনার ঠোঁটের উপরিভাগের গোঁফ গুলাও হাসছে। ডিপ ব্ল্যাক কালারের গোঁফগুলো চিকচিক করে হাসেছে। হাসি আর গোঁফের নতুনত্বে উনার চল্লিশার্ধ্ব বয়সটা কোথায় জানি লুকিয়ে যেতো।
.
উনার ঘনকালো গোঁফের গোপনীয়তা থাকলেও মুখের হাসিতে কোনো গোপনীয়তা ছিলো নাহ। একেবারে'ই সাদামাঠা হাসি। কথাবার্তাও ঠাণ্ডা প্রকৃতির। অন্যসব ডাক্তারদের মতো ততটা উগ্রমেজাজী নাহ। ব্যবহারেও কোনো প্রকার অহমিকা দেখিনি। আমি ইনসোমনিয়ায় ভুগতাম। উনার থেকে চিকিৎসা নেয়ার পর ঠিকঠাক ঘুম হতো। আমার জন্য ভিজিট ফি একেবারেই ফ্রি ছিলো।
.
দুই..
সেদিন উনার চেম্বার থেকে বিদায় নিয়ে কয়েক পা এগিয়ে আবার দম ফেলি। পেছনে তাকিয়ে দেখি সঞ্জুদা আমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। আগুপিছু না ভেবেই হুট করে বলে ফেললাম ' দাদা আজ যদি ফি দিই আপনি কি রাগ করবেন '?
'অবশ্যই করবো' উনি সিরিয়াসলি বললেন।
.
আমি আর হাঁটতে হাঁটতে উনার চেম্বার থেকে বেড়িয়ে আসার সময় আরেকবার পেছনে তাকালাম। নেক্সট সিরিয়েলের রুগী চেম্বারে ঢুকছে। এবার আর উনাকে দেখতে পেলামনা। কিন্তু ঐ স্লিপিং পিলটা কাজ দিচ্ছিলোনা।
.
আগের চেয়ে ইদানীং আরো বেশী রাত জাগি। রাত কাটে উচাটন করে। ভোররাতের দিকে ঘুমালে সকাল দশটার আগেই ঘুম ছেড়ে যায়। ১২ টা ১ টা পর্যন্ত আধঘুমন্ত অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকি।
.
তিন..
১৬ অগাস্ট ভোর নয়টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেলে ঐ দিন ভোর দশটা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে হাসফাস করেও আধঘুমন্ত অবস্থাটা আমার মধ্যে আসলোনা। জেগে জেগে বিছানায় শুয়ে থাকতেও কেমন অস্বস্তি লাগে। উঠোনে রাখা তেপায়া টুলে বসে চোখ ডলতে ডলতে ভাবছিলাম বিকেলে একবার সঞ্জুদার চেম্বারে যাবো।
.
তখন আব্বার গলার আওয়াজ শোনে ভাবনায় চেদ পড়লো। 'আজ দেখছি খুব সকাল সকাল। তা কোথাও বের হবে নাকি' ?
'নাহ' আমি উঠে দাঁড়ালাম।
'নাস্তা করবে চলো' আব্বা ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন।'ডাক্তার সাহেব ৮টার দিকে পরলোকগমন করেছে।'
.
'ডাক্তাররাও পরলোকগমন করে ?' চোখেমুখে পানি দিতে দিতে মাথার ভেতর প্রশ্নটা খেলে গেলো ।
'ডাক্তার সঞ্জুমোহন' আব্বা স্থির গলায় বললেন। 'ওটা তোমার ডাক্তার'
আব্বার সব কথা'ই আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু ঐদিনের কথাটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝামাঝি পড়ে গেলে আমি আবারো জিজ্ঞাসু গলায় বলি 'কে?কি নাম? '
.
চার....
নির্ভুল, স্পষ্ট, অসংকোচনীয় ভাবে আব্বা আবারো বললেন 'ডাক্তার সঞ্জু মোহন'। আয়নার দিকে তাকাতেই সব কিছু ঘোলাটে দেখাচ্ছিল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে 'আমি বের হবো' বলে চলে আসলাম।
.
ডাক্তারেদের থাকতে হয় বিরাট অবদান। তাদের ধর্ম মানে ধনী গরীব সবাইকে সেবাদান।অধিকন্ত ডাক্তার সেবাদানে করে ব্যবধান।
.
সঞ্জুদা নয় নং ইউনিয়নে সরকারী ক্লিনিকের চিকিৎসক ছিলেন। ক্লিনিকের ডিউটি শেষে বিকেলে চেম্বারে বসতেন। প্রাইভেট চিকিৎসা নিলে ফি বাবত বড়জোর পঞ্চাশ টাকা দিলে হতো। অতি অল্পটাকার ডাক্তার তাইনা ? কিন্তু পুরো ইউনিয়নের সাধারণ অসাধারণ মানুষ এক নামে তাকে চিনতো। তার চিকিৎসায় সবাই ফল পেতো।
.
পাঁচ.
সঞ্জুদার বাড়িতে সমুদ্র গভীর মানুষের ভীর। ঘরটা উঁচু ভিটেতে থাকায় বাহিরে থেকে ঘরের বারান্দাটা আগে চোখে পড়ে। একজন ত্রিশ কি পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী মহিলা বেহুঁশ অবস্থায় পড়ে আছে। কয়েকজন মিলে পাষাণের মতো নৈশব্দে তার সীঁথির সিধুর মুছে দিচ্ছে। দুই হাতের শাখা খুললো।
.
উঠোনের এককোণে লোকে লোকারণ্য। ডেড বডিটা ঐ কোণটাতে রাখা। সবাই জটলা বেঁধে দেখছিলো। বাড়ির প্রাপ্তবস্করা গুনগুন করে কি জানি পড়ছে। এদের চোখে বিলকুল জল নেই। আছে শুধো হাহাকার। এরা ডাক্তার সাহেবের উপর বিরক্ত নাকি অনুরক্ত? দেখে বুঝার উপায় নাই।
.
ছেলেপুলেরাও পাহাড়ের ন্যায় শক্ত হয়ে বসেছে। ওদের চোখের কিনারায় জলপ্রপাত সশব্দে ঝরছে।'এরা পাহাড় হলে দৃশ্যটাকে বলতে হতো ঝর্ণা। মানুষ বলেই দৃশ্যের নাম দেয়া হয়েছে কান্না''।
.
চয়....
সঞ্জুদার ডেডবডির পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই মনে হলো একবার বলি। 'দাদা কি ঔষধ দিলেন ? কাজ হয়না। ইনসোমনিয়া তো বেড়েছে বললামনা কারণ সঞ্জুদা তখন ঘুমাচ্ছেন। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন উনি ঘুমের মধ্য'ই হাসলেন।
.
আমার মনে হলো উনার ঠোঁটের উপরিভাগে থাকা গোঁফ গুলো হাসছে। ডিপ ব্ল্যাক কালারের গোঁফ চিকচিক করে হাসছে। হাসি আর গোঁফের নতুনত্বে উনার চল্লিশার্ধ্ব বয়সটা কোথায় জানি লুকিয়ে যাচ্ছে।
.

মো:সাব্বির আহমদ
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ রাত ৩:০২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিজয়ী

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিজয়ী
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

বিজয়ী কখনো কখনো হেরে যায়
হঠাৎ কেউ টপকে যায় তাকে
সেরা সবসময় সেরা থাকে না
পরাজিত হয়ে সে কাঁদে, ভেঙে পড়ে।
জয়লাভ প্রায় প্রত্যেকে আনন্দিত করে
আর হার প্রায় প্রত্যেকে দুখি করে।
আমরা কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিল্প ও সাহিত্যের নবজাগরণ: যুগপৎ আন্দোলন এবং মৌলিকতার স্বরূপ।

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২



সভ্যতার বিকাশ, সমাজের রূপান্তর এবং মানুষের আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে শিল্প ও সাহিত্য এক অবিনাশী চালিকাশক্তি। একটি জাতির মননশীলতা কেমন হবে, তার নৈতিক ভিত্তি কতটা দৃঢ় তা নির্ভর করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামায়াতের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ রাজনীতি

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ২২ শে জুলাই, ২০২৬ ভোর ৫:২৮


১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ‘জামায়াতে ইসলামী’ গঠন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এটি ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×