ফার্মগেট ,শাহবাগ, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ীর রাস্তা ঘাট একেবারে জন শূন্য এমন কি একটা কুকুরও নেই । সারাদিনের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া করা জনতা, ছাত্র নেতারা বিভিন্ন বাড়ির ছাদে, চিলেকোঠায় গ্রেফতার এড়ানোর জন্য যে যেখানে পারে লুকিয়ে ঘুমিয়ে নিচ্ছে, বিশ্রাম নিচ্ছে । কাল আবার পিকেটিং, আন্দোলন করতে হবে । স্বাধীনতার পর এমন উৎসব মুখর আন্দোলন আর আসেনি বাঙালীর জীবনে । বাঙালী বলতেই আন্দোলন প্রিয় । প্রতিবাদ মুখর । তখন তো আর মিডিয়ার এতো ঝনঝনানি, ছনছনানি, ঝলকানি ছিল না । ছিল বিটিভি আর প্রিটিংমিডিয়া । তারাও ছিল চাপে আর খামের নেশায় চুড় । বস্তু নিষ্ঠ সংবাদ প্রাপ্তির একমাত্র ভরসা তখন ভয়েজ অফ আমেরিকা । সেটাই সবাই মিলে মিশে ভাগাভাগি করে শুনতো । সন্ধ্যার পর তাই চায়ের দোকান,পানের দোকানের সামনে ভিড় জমে যেত । জমে উঠতো আডডা,আলোচনা । যে করেই হোক, এরশাদের পতন চাই চাই । সবার মুখে মুখে তখন একই স্লোগান, "এক দফা এক দাবী এরশাদ তুই কবে যাবি ।"
ঢাকা ইউনিভারসিটির ছাত্রদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করার জন্য এরশাদের তৈরি জাতীয় ছাত্র সমাজ ও এরশাদের জন্য তেমন কোন ফল বয়ে আনতে পারেনি । ছাত্রদল নেতা আমান উল্লাহ আমান কয়েকবার বিক্রি হয়েও আবার ফিরে গেছে । আমান উল্লাহ আমান এর কেরানীগঞ্জের বাসায় সরকারের পক্ষ থেকে রাতারাতি ফোন ও লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য । যে করেই হোক আন্দোলন দমিয়ে দিতে হবে । এরশাদের তৈরি ছাত্র নেতা নোটন,ঝোটন,টিটু- মুন্নারা তখন ছিল ফুল গিয়ারে । এদেরকে জমা খরচ না দিয়ে চলা ছিল বেশে মশ্কিল ।
নূর হোসেন ,ডাক্তার মিলন এর মৃত্যু আন্দোলনের ফুয়েলের কাজ করে । দাবানলের মতো সেই আগুন ছড়িয়ে পরেছিল চারিদিকে । তাতে অবশ্য এরশাদ মোটেও ভীত হয়নি । মওদুদ আহম্মদ.শাহ মোয়াজ্জেমরা দিনরাত এরশাদের মসনত ঠিক রাখার জন্য কাজ করে গেছন । এরশাদ গেলে তাদেরও সব যাবে । জেলেও যেতে হতে পারে । তাই চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না ।
মওদুদ আহম্মদ এরশাদের ভাইস প্রেসিন্ডেন্ট এরশাদের হয়ে বক্তৃতা, বিবৃত্তি যা দেওয়ার উনিই দিচ্ছেন । দেশের দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি তখন তিনি । পুলিশ আর্মি সহ সব বাহিনীকে যা নির্দেশ দেবার উনিই দিচ্ছেন । সকাল-সন্ধ্যা এরশাদের সঙ্গে মিটিং করে তাকে আসস্থ করছেন, চিন্তার কিছু নাই । সব নিয়ন্ত্রণে আছে।
এরশাদ কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন । একদিকে জেনারেলদের উপর ভরসা রাখতে পারছিলেন না অন্যদিকে মওদুদ,শাহ মোয়াজেম, মঞ্জুদের কথায় ভরসা পাচ্ছিলেন না । মনের শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে । নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধটা বেড়ে যাচ্ছিল ক্রমশ । বিশেষ করে নূর হোসেনের বুকে পিঠে লেখা স্বৈরাচার নিপাত যাক, "গণতন্ত্র মুক্তি পাক" লেখাগুলো চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল । নুর-হোসেনের মৃত্যু এরশাদকে পীড়া দেয় । তিনি চেয়েছিলেন নুর-হোসেনের বাড়িতে যেতে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা করতে পারেননি । তিনি নির্দেশ দিয়েছেন কোন প্রাণহানি যে না ঘটে , আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সব সমাধান করতে । কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন একটু একটু করে সব নিয়ন্ত্রণের বাইরে চেলে যাচ্ছে । এরশাদ ঘুমাতে পারতেন না । সারারাত পায়চারি করে রাত্রিপার করে দিতেন । শরীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পরছিল ।
রাত আনুমানিক ৩টা বাজে, এরশাদ এর তন্দ্রা ঘুম ভেঙ্গে যায় । মিনিট বিশেক হয়তো ঘুমিয়েছেন । বিছানায় উঠে বসেন । তারপর বিছানা থেকে নেমে প্রেসিডেন্ট ভবনের বারান্দায় বের হয়ে আসেন । সব নীরব,নিস্তব্ধ । লম্বা বারান্দায় একশো পাওয়ারের একটা বাতি জ্বলছে । সেই বাতির নীচে দাড়িয়ে আছে , ছিপছিপে লম্বা এক সেনা সদস্য। এরশাদকে রুম থেকে বের হতে দেখে সে সর্তক হয়ে যায় । সাথে থাকা অস্ত্র স্পর্শ করে সিনা টানটান করে দাড়িয়ে স্যালুট করে । এরশাদ স্যালুটের জবাব দেন না । দরজায় কিছু সময় দাড়িয়ে থেকে রুম থেকে বের হয়ে বারান্দাটা ভাল করে দেখে নেন । যারা ডিউটি করে এরশাদ তাদের সবাইকে চেনেন । নাম ধরে ডাকেন । কুশল জিজ্ঞাসা করেন । এটা এরশাদের অনেকগুলো ভাল গুণের মধ্যে একটি । এতে সবাই প্রাউড ফিল করে ।
একজন ভাল নেতার হওয়ার সব চেয়ে বড় গুণ হচ্ছে সব কিছু মনে রাখতে পারা । যতো ছোট কর্মীই হোক না কেন, দলের সবাইকে বাই নেইম চেনা হচ্ছে একজন নেতার সব চেয়ে বড় গুণ । ভাসানি,মুজিব,জিয়া সবার মাঝে এ গুণ দেখা গেছে । এই নেতারা সবাই দলের কোন কর্মীর সঙ্গে একবার পরিচয় হলে তারপর থেকে তাকে বাই নেমে চিনতেন, ডাকতেন । কুশল জিজ্ঞাসা করতেন । এরশাদের মাঝেও এই গুন বেশ ভাল মতোই আছে । তার প্রমাণ হচ্ছে, তার সময়ে সেনা বাহিনীতে কোন রকম ঝামেলা বা "কু" না হওয়া । তিনি খুব ভাল করেই জানেন কি ভাবে সৈনিকদের আর অফিসারদের পরিচালনা করতে হয় । অথচ জিয়াউর রহমানের সময় সেনা বাহিনীতে ছোট বড় অসংখ্য "কু" হয়েছে । অনেক অফিসার মারা গেছে । সাধারণ মানুষ সে খবর জানে না । কিন্তু মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেওয়া সিভিলিয়ানদের এরশাদ অনেক সময় বুঝতে পারেন না । তাদের চোখের ভাষা সব সময় পড়া যায় না । হিসাব এলো মেলো হয়ে যায় ।
লম্বা বারান্দা ধরে হাটতে থাকেন এরশাদ । পরনে নাইট গাউন । উচু লম্বা প্রেসিডন্টকে যথেষ্ট সুপুরুষ মনে হয় সিকোরিউটিতে নিয়োজিত সেনা সদস্যের কাছে । তার সামনে দিয়ে হেটে হেটে প্রেসিডেন্ট বারান্দার শেষ মাথায় চলে যান । তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই তার ভেতরে কি চলছে । বারান্দার শেষ মাথায় কয়েক সেকেন্ড দাড়িয়ে আবার ফিরে আসতে থাকেন তিনি । খুব ধীর পায়ে হেটে হেটে সেনা সদস্যর সামনে এসে দাঁড়ান । নাম ধরে জিজ্ঞাসা করেন,কি খবর তোমার । সব ঠিক আছে ? তোমার বাবা মা কেমন আছে ? এই সেনা সদস্য আগেও দু তিন বার এখানে ডিউটি করেছেন তাই এরশাদ থাকে চেনেন । প্রেসিডেন্টের মুখে নিজের নাম শুনে কিছুটা ঘাবরে গেলেও ঠিক থাকেন । ছোট করে উত্তর দেন-
স্যার ভাল, ভাল আছি স্যার ।
তোমার বাড়ি তো পুরাণ ঢাকায়, তাই না ?
জি, স্যার ।
পুরাণ ঢাকার কি খবর ? তুমি কি জানো ? এরশাদ আন্দোলনের খোজ খবর জিজ্ঞাসা করেন । একটু থেমে তিনি আবার জিজ্ঞাসা করেন,পুরাণ ঢাকায় অনেক গাড়ি পোড়াচ্ছে শুনলাম, গুলিস্তানেও নাকি তাই ? তুমি কি কিছু জানো ?
সেনা সদস্য কিছু বলার সাহস পান না । বুক ধনুকের মতো টান টান করে দাড়িয়ে থাকেন । কি বলবে ভাষা খুঁজে পায় না । তার অবস্থা অনুমান করে এরশাদ বলেন, তোমার ভয় নেই । তুমি নি:ভয়ে আমাকে বলো কি অবস্থা ঢাকা শহরের ? একটু আগে মওদুদ সাহেব এসেছিলেন, উনি তো বলে গেছেন, পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসছে ।
এই সেনা সদস্য কিছু দিন হলো কমিশন পেয়েছেন । এতো অল্প সময়ে কেউ প্রেসিডেন্টের ডিউটি করার সুযোগ পায় না । কিন্তু তিনি পেয়েছেন । নতুন চাকরী, নিজের যোগ্যতার গুনে এই পর্যন্ত এসেছেন তবুও এতো বড় একজন মানুষের সামনে কথা বলতে তার গলা শুকিয়ে আসে । নিজের ভেতরের সকল উত্তেজনা চেপে রেখে বলেন, "স্যার পরিস্থিতি ভাল না ।"
কিছু সময় চুপ করে থেকে এরশাদ আবার জিজ্ঞাসা করেন, কতোটুকু ভাল না ।
সেনা সদস্য উত্তর দেয় , স্যার, যতোটুকু খারাপ হলে বলা যায়, মোটেও ভাল না ।
এরশাদ কিছু বলেন না । হুম জাতীয় শব্দ করে সেনা সদস্যের কাধ চাপরে দিয়ে খুব ধীরে হেটে হেটে তার রুমে চলে যায় । রুমে ঢুকে তিনি মওদুদ সাহেবকে ফোন করে বলেন, "আপনি সবাই নিয়ে এখুনি আসেন । আমি জরুরী একটা ঘোষনা দিতে চাই । এর পর ভোর ছটার মধ্যেই অনেকে জেনে যান যে, এরশাদ পদত্যাগের করেছেন বা পদত্যাগ করছেন ।
একজন সেনা সদস্যের কতো ছোট্র একটি কথা এরশাদকে সেদিন অনেক বড় একটি সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল । সেটা ভেবে আমি অবাক হই । সত্যি বলতে এরশাদের সাথে থাকা মন্ত্রী পরিষদ বা জেনারেলরা কেউই ক্ষমতা ছাড়ার কথা চিন্তা ও করেনি । এরশাদ পদত্যাগ করবেন এটা ছিল তাদের চিন্তার অতীত । এরশাদ আসলে ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পরেছিলেন । নিজের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি হেরে যান । চাটুকার পরিবেষ্টিত এরশাদ ছিলেন মূলত একা । সেদিন এই সেনা সদস্যের সত্য বলা কথাগুলো এরশাদকে দারুণ ভাবে নাড়া দেয় এবং তাকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল । সেই সেনা সদস্য তার যোগ্যতা তার মেধা এবং বুদ্ধি দিয়ে আজো দেশের সেবা করে যাচ্ছেন । তাকে স্যালুট জানাচ্ছি ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল ১০:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




