
ঈদ এবং বিজয় সমাচার
ঈদ আসি আসি করতে করতে আবার চলেও গেল।চলে গেলেও তার রেশটা আজ সকালেও রয়ে গেছে, হয়ত অনেক কাল থাকবে।
কুরবানির মাংস নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুর। মেঝেতে পলিথিন বিছিয়ে মাংস বিলি-বন্টনের প্রস্তুতি চলছে, আমার গিন্নি তদারকি করছে, সাথে ছেলে-আমি যথারীতি মাংসের গায়ে লাগানোর জন্য ট্যাগ লাগানোর চিরকূট লেখার মহান দায়িত্ব পালন করছি!!! আমি কুরবানির কাজে কেমন পটু, তা আমার কুরবানির পার্টনাররা এ কয় বছরের মধ্যে জেনে গেছে। সুতরাং এ রকম একটা সার্টিফিকেট নিয়ে আমি মহা আরামের ঈদের দিনটা পার করে দেই। অবশ্য গিন্নি মাঝে মাঝে দু’একটা অমিয় বাণী দেন, আমি অবলীলায় সে সমস্ত বল ছেঁড়ে দেই, খেলার বিন্দু মাত্র চেষ্টা করি না। কেন না কট এন্ড বোল্ড হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এ রকম সুবিধা জনক একটা অবস্থান কিন্তু এক দিনে তৈরি হয়নি, বহু কাল বহু রকম গঞ্জনা-তিরস্কার অম্লান বদনে এই অধমকে হজম করতে হয়েছে, তবেই না আজকের এই ......। স্লিপে “গরু, আতিয়ার ভাই” লিখছি, এমন সময় কলিং বেল।
আমাদের বাসার ছুটা কাজের বুয়া হাজির, সাথে তার বছর পাঁচেকের ছেলে।ব্যাপারটা বিশাল স্বস্তির যে বুয়া হাজির, অনেক কাজে সাহায্য হবে। আবার সাথে একটা অস্বস্তিও হাজির, বুয়ার ছেলে প্রচন্ড রকমের চঞ্চল এবং দুষ্টের শিরোমণি। ইতিপূর্বে সে তার দস্যিপনার কিছু প্রমাণও রেখেছে।বুয়ার নাতনীটা অবশ্য বেশ শান্ত-শিষ্ট,নাম ঝুমুর, বুয়ার ছেলের চেয়ে বছর দু’য়েকের বড়।
সেই ঝুমুর এক শুক্রবারে এসেছিল বুয়ার সাথে। বস্তির বাসায় ওকে দেখার কেউ নেই, ওর মা (বুয়ার মেয়ে) মারা গেছে। একটা টুলে বসে রান্না ঘরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গিন্নি ঝুমুরের সাথে আলাপ করে, আমি এ ঘর থেকে শুনি।
ঝুমুর স্কুলে যায়- এক-এর পাশে শূন্য দিলে দশ হয়, আরো একটা শূন্য দিলে হয় একশো, সে শিখেছে।
গিন্নি খুশি হয়, বলে- পাঁচ-এর পাশে শূন্য দিলে কত হয়?
ছোট্ট মেয়ে চেষ্টা করে, এটা-সেটা বলে, হয় না।
গিন্নি ওকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য বলেঃ
-পারলে ৫০ টাকা দেব।
ও চেষ্টা করেও পারে না।
কাজ শেষ, বুয়া সেদিনের মত নাতনীকে নিয়ে চলে যাবে, গিন্নি ঝুমুরের হাতে বিশ টাকা গুঁজে দেয়।
বুয়া এক গাল হাসি দিয়ে ঘরে ঢুকলো,ছেলেটা দরজার ফাঁক গলে অর্ধেক শরীর ঢুকিয়ে দিয়ে হাসি হাসি মুখে মুখে দাঁড়িয়ে।পরিস্থিতি শান্ত বিবেচনা করে বাকী অর্ধেকটাও ভিতরে ঢুকিয়ে আস্তে দরজাটা ভিজিয়ে দেয়-ডাইনিং টেবিলের অপর প্রান্তে বসে আমি লক্ষ্য করি।
গিন্নির কড়া নির্দেশ, আমার উল্টো দিকের চেয়ারে বিজয়কে (বুয়ার ছেলে) চুপ-চাপ বসে থাকতে হবে। কিছুক্ষণ বিজয় সুবোধ বালকের মত থাকল, তার পর ....। আমি স্লিপ লিখছি, ছোট ছোট প্যাকেটের গায়ে গিট্টু দিচ্ছি। বিজয় রান্না ঘরে, ওর মাকে বিরক্ত করে। এবার গিন্নির গলা চড়েঃ
-তোর ‘বিজয়’ নামের সাথে কাজের মিল নাই।
বিজয় আবার সুবোধ বালকের মত চেয়ারে এসে বসে।
-বুয়া, তোমার ছেলে কিছু খাবে? জানতে চায় গিন্নি।
বিজয় কিছু খাবে না।কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুয়া অস্থির হয়ে উঠে, বুয়া বাইরে যাবে- ছেলে চিপস খাবে।
বিজয় চিপস খাচ্ছে, আমি জিজ্ঞেস করিঃ
-কেমন, মজা!
নির্মল হাস্যে ওর চোখ দু’টোও হেসে উঠে।
বিকেল চারটার মধ্যে কুরবানির মাংস বিলি-বন্টনের প্যাকেজিংয়ের কাজ সমাপ্ত, বুয়ার ঘর মোছা শেষ, আরো কিছু টুক-টাক কাজ বাকী।পাশেই আমার ভায়রা ভাইয়ের বাড়ি, উনারা স্বামী-স্ত্রী গেছেন ভায়রা ভাইয়ের বৃদ্ধ বাবার সাথে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে। আমার ডিপ ফ্রিজ নেই, উনার ডিপ ফ্রিজে কুরবানির মাংস রাখার জন্য যাচ্ছে গিন্নি ও ছেলে। আমি ওজু করে মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, গিন্নি কানে কানে বলে গেলঃ
-আমরা আপাদের বাসায় যাচ্ছি মাংস রাখতে, তুমি বাসায় থাক, বিজয় যা দুষ্টু, ঘরের কি হাল করে কে জানে, দেখে রেখ!
আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাই।
ওরা চলে যাওয়ার পর বিজয় সারা ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল, ও বুঝতে পেরেছে-এখন অবাধ স্বাধীনতার সময়। ওকে কিছুটা ব্যস্ত রাখার জন্য বললামঃ
-কলা খাবি?
ও মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।নিজেই কলা ছিঁড়ে খেতে থাকে হাত না থুয়েই। আমি কলার ছিলকা ফেলার জন্য একটা প্লেট দেই।
-আরোকটা আছে, খাবি?
বিজয় মাথা নাড়ে। ২য় টা খেতে একটু সময় নেয়। ওর হাত দু’টো একটু আঠাঁলো হয়ে উঠে, কিন্তু ও হাত ধোয় না।
খাওয়া শেষ করে আমার ছেলের ঘরে গিয়ে ওর কম্পিউটারটা ছেড়ে দিতে বলল। একটু মিথ্যা বললামঃ
-কম্পিউটার নষ্ট।
ও বিভিন্ন কিছু চাপতে থাকল। মেইন পাওয়ার বন্ধ, সুতরাং কোন অঘটনের সম্ভাবনা নেই।তার পরও থামল না, মাউসটা জোরে জোরে চাপতে লাগল-রাগে।
এবার নতুন উপদ্রব।আমার মোবাইলটা চাচ্ছে বিজয়-গেম খেলবে।আমার মোবাইলে সত্যি কোন গেম নেই। সুতরাং মিথ্যার আশ্রয় নিতে হলো না। এবার অন্য দাবী-গান শুনবে মোবাইলে। তাও নেই-বাঁচলাম।ছবি তুলবে – না, এবার ফেঁসে গেলাম। কি আর করা, বিজয়ের কত গুলো ছবি তুললাম। প্রতিটা ছবি তোলার পর ও দৌড়ে আসে, মোবাইলটা হাতে নিয়ে সদ্য তোলা ছবিটা দেখে, শিশু সুলভ নির্মল হাসিতে চোখ-মুখ কথা বলতে থাকে। চলুন দেখি আমার সস্তা মোবাইলে আনাড়ি হাতের ছবি গুলো।





ছবি তুলতে তুলতে শোবার ঘরে এসে টিভি ছাড়ি। আমি ওকে একটা ছোট্ট মোড়া দিয়ে বসিয়ে দেই।বিজয় নিজের মত করে টিভি প্রোগাম দেখবে, রিমোটটা তার লাগবে। আমি কিছুক্ষণ ওকে বিরত রাখতে চেষ্টা করলাম, তার পর রিমোটটা ওকে দিয়ে দিলাম।চাপতে চাপতে ‘ফুটবল’-এর ছবি ওয়ালা বাটনটা পেয়ে গেল, ওটা চাপলে স্পোর্টস চ্যানেল গুলো খুব স্পষ্ট আসে। আর ও ভাবলে এটা দিয়ে বোধ হয় ‘ফুটবল’ খেলা দেখা যায়। বারে বারে বাটনটা চাপছে।
গিন্নি আর ছেলে ফিরে এসেছে।বিজয়ের মায়েরও কাজ শে্য।
ওরা চলে যাওয়ার পর আত্নীয়-স্বজনের বাড়িতে কুরবানির মাংস দিতে বের হলাম। রিকশায় চেপে আতিয়ার ভাইয়ের বাসার দিকে যাচ্ছি, বিকেলের ম্লান আলোয় ঈদের দিনটাও বিদায় নিতে যাচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ বিকাল ৫:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




