বিকেলটা সেদিন ছিল খুব ক্লান্ত, ঠিক যেন গল্পের শেষ অঙ্কে দাঁড়িয়ে
নাগরিক পৃথিবীর ভিড়ে আমিও অপেক্ষায়, বেলাশেষে ফিরতে হয় বলে।
কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগটা বেশ পুরনো, সেলাই ছেঁড়া জুতো, ভাঙ্গা চশমা,
সদ্যই নীল দেয়া মরচে ধরা সাদা শার্ট, আর চোখের কার্নিশে জমে থাকা বিষাদ সিন্ধু।
ব্যাস, এইতো চলছে বেশ, আবহমান চির অম্লান্, কিন্তু মুহূর্তেই সেদিন সব কেমন বদলে গেল
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর খুব কাছ থেকে বলে উঠলো,‘আরে, তুমি এখানে?‘
আমি যেন গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠলাম
তন্দ্রাচ্ছন্ন মোহেও এক মুহূর্তও বিলম্ব হলনা চিনতে আমার
এইতো সেই কণ্ঠ যেখানে আমি হারিয়েছি লক্ষকোটি বার
সারা দিলাম না, যদিও দুর্বার ইচ্ছে ফিরে তাকাবার
আসলে ভয় হচ্ছিল, মৃত্যুভয়, ভয় আবার হারিয়ে যাবার
ধ্বংসস্তূপ জুড়ে আবার ধ্বংস হবার।
কাঁধে এবার আলতো ছোঁয়া, ‘কি ব্যাপার চিনতে পারছো না?’
অথচ আমি ভাবছি, ফিরবো বললেই ফেরা যায়না।
মুখোমুখি তখন আমি আমার
‘কী ব্যাপার কথা বলছো না যে? কেমন আছো, তুমি?’
ক্ষীণ কণ্ঠে বললাম, ‘ঠিক যেমন রেখে গেছিলে তুমি।’
‘ছেঁড়া স্যান্ডেল হাতে কেন?
বাবরি চুল, নজরুল হতে চাইছো যেন?
এদিকে কোথায়, অফিস নাকি এখনো আড্ডায় চায়ের কাপে?
আরে, সিগারেটেটা তো ছাড়বে বলেছিলে?
সারাদিন খেয়েছো কিছু, নাকি ওই হাওয়াই?’
আমি তখন হারিয়ে গেছি ঐ নয়নাভিরামে
জানি নিশ্চিত মৃত্যু, তবু মত্ত খানিক অবগাহনে
ঠিক কতটা সময় জানিনা এভাবে গেছে পেরিয়ে
হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম বেশ পশ এক রেস্তোরাঁতে
লজ্জিত চোখ মেন্যু না দেখে আঁড়চোখে তাকায় দামের দিকে।
নীলা আমার কাছে আজ বেশি টাকা নেই
‘তোমার কাছে চেয়েছি আমি?’
না মানে এখানে খাবারের দাম যেই
চল বরং বেরিয়ে পড়ি চা খেয়েই
‘চুপ করে একটু বসো তো, যেতে তো হবেই।‘
মুহূর্তগুলো কীভাবে কেটে গেল ভেবে পেলাম না
কখন চৌরঙ্গীর ব্যস্ত রাস্তায় এসে পড়েছি তাও জানিনা
‘তোমাকে এক জোড়া জুতো কিনে দেব চল
কই দাঁড়িয়ে পড়লে যে কি হল?
আমার হাতে বেশি সময় নেই তো।‘
নীলা এই জুতো জোড়া সারিয়ে নিলে আরও বছর দুয়েক চলে যাবে,
চাকুরীহীন জীবনে এতদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী, এভাবে ফেলে গেলে হবে!
নতুন জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে যখন শাহবাগের মোড়ে এসে পৌঁছেছি তখন প্রায় সন্ধ্যে
দশ টাকার কফি পনের টাকায় বিকিয়ে চা-ওয়ালার প্রশস্ত হাসিতে আমি তখন দ্বিধা-দ্বন্দে
‘চাকরী-বাকরী করছ না, লেখালেখির অভ্যাসটা আছে তো নাকি তাও গেছে?’
চাকরী তো খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছি কই, রোজগার ব্যাপারটা বেশ কষ্টসাধ্য বুঝলে।
এরপর নীরবতা, স্বপ্নময় চোখ প্রকৃতি দেখে মনের সবকটি জানালা খুলে দিয়ে।
একটা গাড়ি খুব কাছে এসে দাঁড়ালো, সুন্দর একটি মুহূর্ত নষ্ট করল বেরসিকের মত
নীলা হাসিমুখে উঠে গেল, পরিচিত কেউ হবে হয়ত, কপালের ভাঁজে জমল আমার রাজ্যের বিরক্তি যত
‘তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, ইনি আমার বর, আর ও হচ্ছে আমার...আমার পুরনো বন্ধু’
ওরা চলে যাওয়ার পরও স্বপ্নভঙ্গের মত তাকিয়ে রইলাম যতক্ষণ দেখা যায় শেষ রেখা শেষ বিন্দু
বহুক্ষণ পর যখন ঘোর ভেঙে উঠে দাঁড়ালাম, টলতে টলতে কিসের সাথে একটা ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গেলাম
ঘুমিয়ে পরার আগে মনে হল জানা হয়নি, “কেমন আছো নীলা? আমি যে তোমারই অপেক্ষায় ছিলাম...”
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



