somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুড্ডি-লাটাই

০৭ ই জুলাই, ২০০৬ দুপুর ১২:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ ওর দুঃখের দিন। দুঃখের ভাগাড়ে ব'সে থাকতে থাকতে দুর্গন্ধ কোনোদিনই ওর নাকে পেঁৗছতে পারেনি। কিন্তু আজ খানিক পরপর লম্বা লম্বা দমে বুকের গভীর পর্যনত পেঁৗছে যাচ্ছে তা। দমের ফাঁকে ফাঁকে ফোঁপ-ফোঁপ শব্দে নাক-মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আদর্্র হাওয়া। আর তাতেই ভারাক্রানত হচ্ছে চারদিকের বাতাস। মানে ও কাঁদছে।

বারান্দায় চিৎ হ'য়ে পড়ে থাকা হাড্ডিসার সত্রীলোকটিকে ঘিরে ধরেছে যে ক'টি মেয়ে মানুষ তাদের সবাইকে ও চেনে। তারা এ বসতিরই বাসিন্দা। শুয়ে থাকা সত্রীলোকটির বুক বরাবর বসেছে যে জন সে হচ্ছে খেদির মা। হাঁটার সময় দু'ঠ্যাং ফাঁক ক'রে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। মাথার খুব কাছে বসা জন টেপির দাদী। কানা চোখ থেকে ক্রমাগত জল পড়ছে তো পড়ছেই। তাকে দেখলেই রূপকথার ডাইনী বুড়ির কথা মানে হয় তার। যেন একটু পরেই সে রাুসীর রূপ ধরবে। দু'পায়ের দু'পাশে বসে ছমিরন-কমিরন দু'বোন সুর ক'রে কোরআন শরীফ পড়ছে। পাশে জ্বালানো আগরবাতির ধোঁয়াগুলো যেন ধীরে ধীরে স্বর্গের উদ্দেশ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।

ঝাপসা চোখে যে চেনা মেয়েলোকটিকে অচেনা রহস্যময় মনে হচ্ছে তার সে হচ্ছে সামনের বারান্দায় ব'েস থাকা জন। দু'ঠাং সটান মেলে দিয়ে আরাম ক'রে পান চিবাচ্ছে সে। ডানহাত দিয়ে পানের ডালায় কী যেন হাতরাচ্ছে আর বামহাতে চুলকাচ্ছে উরুর মাংসল অংশ। চুলকাতে চুলকাতে হাঁটুর অনেক উপরে কাপড় উঠে গেছে তার। ও রকম সাদা উরু সে একবারই দেখেছিলো। ওর বয়স তখন ছয় কী সাত।

বসতির ও মাথায় রহিমুদ্দির এক খুবসুরত মেয়ে ছিলো। স্কুলে যেতো সে। কেলাস সিক্স না কোন্ কেলাসে জানি পড়তো। লোকের মুখে শুনতো ও। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় গলায চেন, লম্বা চুলওয়ালা এক যুবককে ও বাড়ির সামনের দোকানের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতো সে। তাকে দেখলেই যুবকটি ডাকতো। আর জিজ্ঞেস করতো রহিমুদ্দির খুবসুরত মেয়ের কথা। এক টাকার বিনিময়ে যুবকটির কাছ থেকে একবার একটা চিঠি এনে দিয়েছিলো ও সেই মেয়েটিকে। একটু পরেই হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিলো সেদিন । ও বসেছিলো বারান্দার এক কোণায়। ক্রমাগত ঠাণ্ডা হাওয়ায় কুঁকড়ে যাচি্ছলো সে। ওদিকে চৌকির উপর শুয়ে বিশ্রী ভাষার চিঠি পড়ছিলো রহিমুদ্দির খুবসুরত মেয়ে। বারবার ওপাশ ওপাশ করায় পরনের ছায়া মেয়েটির দু'টি উরু ঢেকে রাখতে পারছিলো না আর। ধীরে ধীরে বের হ'য়ে আসছিলো উরুর সাদা অংশ। প্রথমাবারের মতো সাদা উরু সেবারই দেখেছিলো সে। একটু পরে মেয়েটি কেন জানি তাকে খুব আদর করেছিলো। কোলে তুলে নিয়ে বুকে ক'রে শুয়ে থেকেছিলো অনেকণ। মাঝে মাঝে দু'হাতে ওর মুখ নরম বুকে চেপে ধরায় অনেকখানি শীত কেটে গিয়েছিলো সেদিন।

আজ রতনের দাদী মারা গেছে। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কাঁদছে ও। দশ-এগার বছরের বালকের গলার মতোন তার স্বর ভেসে আসছে। প্রকৃতপ েক্ষ ওর বয়স পনের। বাড়নতের শেকড় অনেকখানি পুষ্টিহীন ব'লেই এই অবস্থা। কিছুদিন আগে ওর বাপ যখন তৃতীয় বিয়ে করলো তখন সে বাড়ি ছেড়েছিলো। সারাদিন খুব ক'রে কেঁদে রাতে গিয়েছিলো এক খাবার হোটেলে কাজ করতে। রাত শেষে ভোরেই ওর উপর পড়লো থালা-বাসন মাজার ভার। হাত ফসকে একটা প্লেট ভাঙ্গার অপরাধে ম্যানেজারের চড় খেয়ে সেদিন ও চরকির মতো ঘুরেছিলো।

সেই থেকে রতন ওর দাদীর কাছেই থাকতো। দাদী তাকে রেঁধে খাওয়াতো। লাঠি ভর ক'রে দাদী সাহেবদের বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করতো। আর রতন মেডিকেল হোস্টেলের ছাত্রদের এটা সেটা ক'রে পেতো দু'এক টাকা। দু'জনের সংসারে তারা টানাটনির দুঃখ নিয়েই সুখী ছিলো। অনেকদিন পর রতন তার মা মারা যাবার খবর পাড়া পড়শির মুখে শুনেছে। তার বাপের দ্বিতীয় বউ নাকি খুব খাচ্চর প্রকৃতির মেয়ে ছিলো। লোকেরা বলতো সে নাকি তার বাপকে হাঙ্গা করেছিলো। সেই দুঃখে তার মা ইঁদুর মারা ওষুধ খেয়ে ম'রে গিয়েছিলো। ক'মাস যেতে না যেতেই এক ড্রাইভারের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলো তার নতুন মা। এ কথা খেদির মার মুখে শুনেছিলো রতন। তার বাবা কিংবা দাদীর কাছ থেকে কোনোদিনই শোনেনি সে।

মরদেহ সৎকার করতে দুপুর গড়িয়ে গেলো। ভাগ্যিস্ বুড়ির কিছু গয়না ছিলো! সেটা বন্দক রেখেই কাফনের কাপড় এনেছিলো বসতিবাসীরা। এ ব্যাপারে রতনের বাপের কিছু বলার ছিলো না। একটা বোঝা যেন নেমে গেলো তার। অবশ্য তার দ্বিতীয় বোঝা রতনকে নিয়ে ভাবনা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে সে।

সারাদিন কিছুই পেটে পড়েনি রতনের। দু'-দু'বার সৎ-মার মুখোমুখি হয়েছে সে। প্রতিবারই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সে। অনেকণ বারান্দায় ব'সে রইলো রতন। দক্ষিণ কোণের আম গাছটায় একটা দাঁড়কাক ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে। শীতের শুরুতে কিছুটা ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে পাতায় পাতায়। হাই তুলে পশ্চিমের আকাশে তাকাতেই ওর নজরে এলো লাল নীল একঝাঁক ঘুড্ডি। গোত্তা মেরে কোনোটা নিচে নামছে আবার উপরে উঠছে কোনোটা। হঠাৎ ওর চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো।

ঘরের ভেতর ঢুকে তক্তার উপর থেকে সূতা পেঁচানো লাটাই বের ক'রে আনলো সে। অনেকদিন হাত পড়েনি ওটাতে। দাদীর অসুখ থাকায় তাকে নিয়ে ব্যসত ছিলো এতোদিন। সূতাটাতে অনেক ময়লা জমে গেছে। তবু হাল ছাড়লো না সে। রহিমুদ্দির দোকান থেকে এক টাকায় একটা ঘুড্ডি কিনলো। তাদের বসতির পাশেই আছে দেয়ালঘেরা একটি বাড়ির জমি। দেয়াল টপকে বাড়িটার ভেতরে চলে গেলো তারপর। ওখানটাতেই মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ঘুড্ডি ওড়ায় বসতির ছোট্ট ছোট্ট ছেলেরা। টুপ ক'রে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে তার সাধের ঘুড্ডি উড়িয়ে দিলো হাওয়ায়। গোত্তা মেরে মেরে উপরে উঠতে লাগলো ঘুড্ডি। ধীরে ধীরে সূতা ছাড়তে লাগলো রতন।

এক সময় ওর ঘুড্ডি যেন দূর আকাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। এমন সময় মনে হ'লো দাদীর কবরের পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা তার নিজের কথা। ঘুড্ডিও কী তাহ'লে মানুষের দুঃখে থামে? আবার গোত্তা মেরে জানিয়ে দেয়- না ওসব মিথ্যে মায়া! এবার চরকির মতো ঘুরতে লাগলো তার ঘুড্ডি। রতনের এ সময় মনে হ'লো হোটেলে ম্যানেজারের চড় খেয়ে চরকির মতো ঘোরার কথা। আর একটা গোত্তা খেলো ঘুড্ডি। পট ক'রে ছিঁড়ে গেলো সূতা। দীর্ঘদিন ঘরে প'ড়ে থাকায় কোনো জায়গায় হয়তো পচন ধ'রে ছিলো সূতায়।

হাতের লাটাই ফেলে এক লাফে দেয়াল টপকালো রতন। পড়ার সময় পায়ের তলায় কী যেন একটু চোট খেলো বোধ হয়। সেদিকে খেয়াল না করেই ঊধর্্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগলো রাসতার ওপাশে যেদিকে ঘুড্ডি ছুটছে। এদিকে লম্বা লম্বা ছিপ, বাঁশ, ডাল নিয়ে জড়ো হয়েছে একদল ছেলে। সূতা ছিঁড়ে উড়ে আসা ঘুড্ডির আশায়। একটু পরেই হয়তো রতনের ঘুড্ডিটা ছিন্নভিন্ন হ'য়ে যাবে কিংবা ধরবে কেউ। এদিকে রতন ছুটছে তো ছুটছেই। ওর হাতে ডাল, ছিপ, বাঁশ কিছুই নেই। যুদ্ধেেত্র ও-ই একমাত্র অসত্রহীন, সঙ্গীহীন- যে জন না পাবে ঘুড্ডি, না পাবে লাটাই।

09.11.1986
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।

বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



"ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস"

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেটে "কোচ" শব্দটা মানেই ছিল ঝড়!

রাসেল ডোমিঙ্গো, হাথুরুসিংহে-
Phil Simmons (2024–present)
Chandika Hathurusingha (2014–2017, 2023–2024)
Russell Domingo (2019–2022)
Steve Rhodes... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মদিনে তাহাদের জন্য শুভকামনা। আমার জন্মদিনের স্মৃতি...

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×