সদ্যপ্রয়াত কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন- আমি কেরানি হতে পারতাম, হতে পারতাম অধ্যাপক কিংবা কুলি; কিন্তু আমি তা হইনি, সারাজীবন কবিতা লিখেছি। এই লেগে থাকা বা লেখাই তাঁকে করেছে এই বাংলার প্রধানতম কবি। একজন কবির সমস্ত লেখাই উত্তীর্ণ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, তবু তাকে লিখে যেতে হয়। এই বাংলার দুই প্রধান কবি শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ দু'জনই লিখেছেন পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে। তাঁদের দু'জনেরই বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশাধিক। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা ধর্মবিশ্বাসের কারণে একদল একজনকে ফেলবেন আর একজনকে গ্রহণ করবেন- এটা কাব্যবিচারে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ তাঁদের দু'জনের শ্রমের ফসলকে নাস্তিকতা বা কবির অপমৃত্যু বলে উড়িয়ে দেবার ধৃষ্টতা কারো নেই। এ প্রবণতা অনেক পত্রিকার বড়ো সমালোচকদের লেখাতেও দেখেছি। একজন কবির ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক দর্শন বা ধর্মবিশ্বাস লেখার মানদন্ড হতে পারে না; তার লেখার বিষয়বস্তুই লেখার উপজীব্য।
অনেক তরুণ কবিই রাতারাতি বনে যান কালিদাস- কথাটা একজন বড়ো কবির, আমার নয়; তবে এর সাথে আমিও পুরোপুরি একমত। কিছু কবিতা লিখেই বা একটি বই বের করেই সিনিয়র কবিদের বাতিল ঘোষণা করেন! কারো সাথে রাজনৈতিক বেরিতা বা মতাদর্শের অমিল হলেই তার অপমৃত্যু ঘোষণা করতে হবে- এর পক্ষে আমি নই। কিন্তু ওপার বাংলা মানে পশ্চিম বঙ্গের কথাই ধরুন। কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুতে তাদের যে আহাজারি- তা কিন্তু সত্যিই অন্তর থেকে। আবার কবি আল মাহমুদের জনপ্রিয়তার ঘাটতিও সেখানে নেই- যেটা আমি দেখেছিলাম পত্র-পত্রিকায় তাঁর 'বখতিয়ারের ঘোড়া' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর।
আমি এক জায়গায় বলেছিলাম- যারা নতুন কবিতা লেখেন বা যারা দু'একটি বইও বের করেছেন কবিতার- তাদের মধ্যে কবি হবার সম্ভাবনা থাকে ফিফ্টি-ফিফ্টি। বলেছিলাম- তরুণ কবিদের মধ্যে নিজেকে কালিদাস ভাবা বা কাউকে বাতিল ঘোষণার প্রবণতা দেখে। অনেকেই নিজের প্রতিভার অবমূল্যায়ণ করে শুধু ঘোর সমালোচনায় ব্যস্তও থাকেন। যেটা অতীতে করেছিলেন কবি মোহিতলাল। অন্যের লেখা পড়ে সমালোচনা বা জ্ঞান বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজের হাতকে পাকানোও জরুরী। পাশাপাশি এ-ও দেখেছি অনেকে লেখেন কম অথচ প্রচুর ভালো এবং শৈল্পিক তাদের লেখার মান। মোদ্দা কথা হলো- লেখক হতে হলে লিখতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। আজকে যারা ভালো লিখছেন- সময়ের বিচারে তারাই যে টিকে থাকবেন এমন কোনো কথা নেই; আসল কথা হলো লেগে থাকা, হাত খুলে লিখে যাওয়া। তাই ফিফটি-ফিফটি কবিতার ভাবনা দিয়েই শেষ করলাম আজকের লেখা। সবার মধ্যেই ফুটে উঠুক লেখনীর ফুল- কবিতার হোক জয়-জয়কার!
19.08.2006
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



