আধুনিক কবিতা হলো একটি শব্দ শব্দ খেলা। উপমা, উৎপ্রো এবং ভাবানায় তা হয়ে ওঠে আরো পরিপূর্ণ। যিনি যতো বেশি শব্দ নিয়ে খেলবেন তিনি ততো বেশি ভালো লিখবেন। প্রতিটি শব্দ যদি হ'য়ে ওঠে চিত্রকল্প তবেই না কবিতার স্বার্থকতা। তারপর অনতমিল, ছন্দের বুনন, শব্দ চয়ন তো আছেই। তবে ছন্দহীন টানা গদ্যের শেষে অনতমিল কোনো কবিতার পর্যায়ে পড়ে না। সেটাকে নিতানত পদ্যের পর্যায়েও ফেলা যায় না। পদ্যেও কিন্তু ছন্দ থাকে, তবে কবিতার মতো ভাবানার বিশালতা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা বা চিত্রকল্পের বালাই নেই সেখানে। আছে শুধু গল্প-উপন্যাসের মতো ধারা বর্ণনা। বিশ্ব-কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক কবিই অনেক ভালো ভালো কবিতার মাঝে বেশ পদ্যও লিখে গেছেন।
আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে
পার হয় কত গরু পার হয় গাড়ি
দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
............................এটি নিতানতই একটি পদ্য।
হাজার বছর ধ'রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি-----জীবনানন্দ দাশ
.............................এটি একটি আধুনিক কবিতা।
প্রথমক্তো পদ্যে রয়েছে ধারা বর্ণনা একটি ছোটো নদীর, গ্রামের জীবনের। এটি একটি অনতমিলযুক্ত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ছন্দোবদ্ধ পদ্য- যা অনেকটাই সরল রৈখিক গদ্যের বর্ণনার মতো। কিন্তু আধুনিক কবিতার ভাষা অনেক নান্দনিক, শব্দ-শাসিত, চিত্রকল্পে ভরপুর ও ছন্দ বৈচিত্রপূর্ণর্। তাই দ্বিতীয়টি একটি আধুনিক কবিতা। যার পংক্তি শেষে অনতমিল নাই কিন্তু অনতস্থলে রয়েছে মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। এখানে কবি তার চলি্লশোর্ধ বয়সে হাজার বছর ধ'রে হাঁটার কথা বলেছেন, যা হাজার বছরের বাঙ্গালী নাবিকের পরিভ্রমণের ঈঙ্গিত বহন করে। কবিতার শুরুতেই এই যে শব্দ-চয়ন বা বাক্য-গঠন এটাই হলো কবিতা।
আমি বিশ্বাস করি- কবিতা হবে মানুষের ঠোঁটের ভাষা, মনের কথা। আমরা যারা কবিতা লিখি তারা যদি সহজবোধ্য কথায় বড়ো মেসেজ দিতে পারি তবেই না আমাদের স্বার্থকতা। কবিতা লিখতে ছন্দ লাগে এ কথা আমিও মানি। আমি আমার কবিতায় ছন্দও ব্যবহার করি। সেটা মানে শুধু শেষে মিল বা অনতঃমিল নয়, অনতর্নিহিত ছন্দ। আধুনিক কবিতায় যেটা মুক্তক অক্ষরবৃত্ত বা গদ্যছন্দের পর্যায়ে পড়ে। তবে এটাই শেষ কথা নয়। আধুনিক অনেক কবিই ছন্দ মানেন না বা জানেন না। তাতে কোনো অসুবিধাও নেই, কবিতা হবেই। তারা বড়ো কবিও হ'লে হ'তেও পারেন। তবে আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি কোনো কিছু ভাঙতে হলে তা কেমন করে গড়া হয়েছে তা জানতে হয় আগে। যেটা করেছেন শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল-মাহমুদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, হেলাল হাফিজ, নির্মলেন্দু গুণসহ আরও অনেক কবি।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০০৬ দুপুর ১২:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



