somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ

২৩ শে মে, ২০০৬ দুপুর ১:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ-1

প্রথমেই বলতে হয় আমি ছন্দ বিশারদ নই। কিংবা বাংলার ছাত্রও ছিলাম না। কবিতা লিখতে গিয়ে যতোটুকু শিখেছি, তার বেশি জানি না। হাতের কাছে তেমন বইও নেই যা পড়েছিলাম আগে। সেই যে মাহবুবুল আলম-এর বাংলা ছন্দের রূপরেখা, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের-এর আধুনিক কবিতার ছন্দ কিংবা কবি আব্দুল কাদির-এর ছন্দ সমীক্ষণ কোনো বই-ই নেই এখন আমার কাছে। তাই ভুল হলে প্রথমেই ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ মূলত তিনটি- স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত। আবহমানকাল ধরে এই তিন ছন্দেই ছড়া, কবিতা, গান বা গীতিনাট্য লিখিত হয়ে আসছে। তাই এই তিন ছন্দের একটির প্রাথমিক ধারণাই আজ দেবো।

স্বরবৃত্ত বা লৌকিক ছন্দ এসেছে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। এই ছন্দ নাকি মানুষের ভেতর আপনাআপনি খেলে। তাইতো খনার বচন, আদি ছড়া এই ছন্দে সমৃদ্ধ। শ্বসাঘাত বা একবারে উচ্চারিত অংশই এর একক মাত্রা। একটি ছড়ার লাইন দিয়ে একে বোঝানো যেতে পারে-

আয় ছেলেরা/ আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে/ যাই
1+3/1+3/1+3/1
ফুলের মালা/ গলায় দিয়ে/ মামার বাড়ি/ যাই
2+2/2+2/2+2/1
এখানে শ্বাসাঘাত বা একবারে যাতোটুকু উচ্চারিত হয়েছে তাতোটুকুকে একমাত্রা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাস দাঁড়িয়েছে এমন-
4/4/4/1
4/4/4/1
অথবা আর একটি ছড়া-

ঐ দেখা যায় তাল গাছ
1+2+1/1+2 (ব্যতিক্রম-এখানে গাছ-কে 2 মাত্রা ধরা হযেছে)
ঐ আমাদের গাঁ
1+3/1
ঐ খানেতে বাস করে
1+3/1+2
কানা বগীর ছা
2+2/1
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাস দাঁড়িয়েছে এমন-
4/3, 4/1, 4/3, 4/1......এভাবেই চলে আসছে কবিতায় স্বরবৃত্ত ছন্দের খেলা।

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ-2

এবার আসি মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কথায়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলো একটু টেনে টেনে পড়লেই ছন্দটা কানে বাজে বেশি। যারা গান করেন তাদের বুঝতে সুবিধা হবে- স্বরবৃত্ত যদি চলে কাহারবা বা ঝুমুর তালে তবে মাত্রাবৃত্ত চলবে দাদরা বা তেওড়া তালে। বেশ আগে থেকেই কবিরা এ ছন্দে কবিতা লিখে আসছেন। আধুনিক অনেক ছড়াকাররাও এ ছন্দ নিয়ে বেশ খেলছেন।

সন্ধি বিচ্ছেদে যেমন শব্দকে ভাঙতে হয়, তেমনি এ ছন্দেও শব্দকে ভেঙ্গে মাত্রার একক নির্ণয় করতে হয়। যারা স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনি বোঝেন তাদের জন্য এ ছন্দ বুঝতে সুবিধা হবে। যেমন- সন্ধান=সন্+ধান=2+2=4 মাত্রা, অভিধান=অ+ভি+ধান=1+1+2=4 মাত্রা বা মৃত্যু=মৃত্+তু=2+1=3 মাত্রা, শৈত্য=শৈত্+ত=2+1=3 মাত্রা অথবা লক্ষ=লক্+খ=2+1=3 মাত্রা, আবক্ষ= আ+বক্+খ=1+2+1=4 মাত্রা বা কবিতা=ক+বি+তা=1+1+1=3 মাত্রা, সুচরিতা=সু+চ+রি+তা=1+1+1+1=4 মাত্রা। অর্থাৎ সংযুক্ত বর্ণের সংযোগ অংশের একবারে উচ্চারিত অংশ হসন্ত বর্ণবা ধ্বনিকে সব সময় 2 মাত্রা ধরা হয়। যেমন একটি কবিতায়-

এইখানে-- তোর/ দাদীর --কবর
2+1+1--2/ 1+2--1+2=6+6
ডালিম --গাছের/ তলে
1+2--1+2/ 1+1=6+2
তিরিশ ুবছর/ ভিজায়ে-- রেখেছি
1+2--1+2/ 1+1+1--1+1+1=6+6
দুই --নয়নের/ জলে
2--1+1+2/ 1+1=6+2
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাসটা এ রকম--6+6, 6+2, 6+6, 6+2।

অথবা আর একটি কবিতায়-

আমাদের/ ছোট নদী/ চলে বাঁকে/ বাঁকে
1+1+2/1+1--1+1/1+1--1+1/1+1=4+4+4+2
বৈশাখ/ মাসে তার/ হাঁটু জল/ থাকে
2+2/1+1--2/1+1--2/1+1=4+4+4+2
অর্থাৎ মাত্রাবিন্যাসটা এ রকম--4+4+4+2, 4+4+4+2।

ছন্দের যাদুকর নামে খ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কেমন করে স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত নিয়ে খেলেছেন, এমনকি একই কবিতায় দুই ছন্দের ব্যবহারও করেছেন- সে গল্প পরের লেখায় বলার ইচ্ছে রইলো।

কবিতার প্রাথমিক ছন্দ-3

আমাদের তৃতীয় প্রাথমিক ছন্দ হলো অক্ষরবৃত্ত। এই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ নিয়ে আধুনিক কবিরা সবচেয়ে বেশি খেলায় মেতেছেন আজকাল। পয়ার থেকে চতুর্দশপদী, অমিত্রাক্ষর, মুক্তক, গদ্যছন্দ কতোভাবেই না এই ছন্দ ভাঙছেন তারা কবিতায়- তার ইয়ত্তা নেই। তবে বোঝার দিক দিয়ে এই ছন্দ সবচেয়ে সোজা। শুধুমাত্র অর গুণে গুণে এই ছন্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। একক অক্ষর বা সংযুক্ত অক্ষরকে 1 মাত্রা ধরা হয়। সাধারণত শব্দের প্রথমে বা মাঝে থাকলে সংযুক্ত বা হসন্ত বর্ণকে এক মাত্রা এবং শেষে থাকলে দুই মাত্রা ধরারই নিয়ম। তবে কখনো কখনো সংযুক্ত অক্ষরকে 2 মাত্রাও ধরা হয়। সেটা নির্ভর করবে কবির লেখার বানানরীতির উপর। এবার আসা যাক ছন্দ বিশ্লেষণে। পয়ার চর্চার যুগে পুঁথি সাহিত্যের একটি কবিতায়-
1ম.
লাখে লাখে সৈন্য মরে/ কাতারে কাতার
2+2+2+2/ 3+3
শুমার করিয়া দেখে/ চলি্লশ হাজার
3+3+2/ 3+3 অথবা
2য়.
ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ/ হাঁটিয়া চলিল
3+3+2/ 3+3
কিছুদূর গিয়া মর্দ/ রওনা হইল
4+2+2/ 3+3
অর্থাৎ ছন্দবিন্যাসটা এ রকম-
প্রথমটির 8/6, 8/6 এবং দ্বিতীয়টিরও 8/6, 8/6

কিংবা মুক্তক ছন্দে রচিত জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়-
অর্থ নয়, কীর্তি নয়,/ সচছ্লতা নয়-
2+2+2+2/ 4+2
আরো / এক বিপন্ন বিস্ময়
2/ 2+3+3
আমাদের অনতর্গত / রক্তের ভিতরে
4+4/ 3+3
খেলা করে
2+2
অর্থাৎ ছন্দবিন্যাসটা এ রকম- 8/6, 2/8, 8/6, 4
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে কবিতাগুলোতো একটা অষ্টক রীতি বা 8 মাত্রা মিলানোর প্রচেষ্টা রয়েছে সর্বদা। এটাই হলো পয়ারের রীতি। আর হঁ্যা, যেখানে 8 মাত্রা মেলেনি সেখানে কিন্তু জোড় মাত্রা মেলাতে হবে, বিজোড় নয় কখনো। এটাই হলো অক্ষরবৃত্তের প্রাথমিক নিয়ম।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০০৬ দুপুর ১২:১৫
২৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিছু খাতের চাকুরী বেতন-ভাতামুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকুরেদের প্রায় ৯১ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে। এছাড়া, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেও মনে করেন বাংলাদেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়; যার অর্থ দাঁড়ায়, দুর্নীতিকে আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাংসের ভুলচুক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬


বারে কুত্তার চোখ রঙিন
স্বপ্ন দেখে তাই ঘিন ঘিন
তাই দেখে হাড্ডি হাসে
পিন পিন, নাকের পুহান ঘুম
রক্ত হবে সুরেশ এই চুম;
ঐ গুরুজনে কইছে কথা
কুত্তার পেটে ঘি করে ব্যথা
স্বপ্ন তো দেখবেই ভুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×