উপরে উল্লেখিত বিষয়ের লেখকের তুলনাতে আমি খুবই ক্ষুদ্র একজন মানুষ হোক সে বয়সে কিংবা জ্ঞানে। এর পরেও যেহেতু উনিও ওনার বয়োজ্যেষ্ঠদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দেশের মঙ্গলের জন্য এভাবে কলাম লিখতে পারেন, সেহেতু আমিও মনে হয় উনার এই লেখা নিয়ে নিজের জীবন নির্ভর অভিজ্ঞতা হতে দুচারটি কথা লিখতেই পারি।
প্রথমত, উনি বলেছেন “আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের প্রতি আমরা যেসব নিষ্ঠুরতা করে থাকি, তার মাঝে একেবারে এক নম্বরের নিষ্ঠুরতাটি নিশ্চয়ই তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাটি”। স্যার যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন পূর্বক জানতে চাইতে পারি কি পৃথিবীর কোন কোন দেশে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ভর্তির জন্য পরীক্ষা নেয়া হয় না? জানতে পারি কি কেন পি এইচ ডি এর মত একাডেমীক পড়াশুনার জন্যও এমন একটি ‘বাণিজ্যিক’ পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হতে হয় বা ভর্তি টিকাতে হয়? সরল বিশ্বাসে কারো কি আপনার এই কথা গুলো বিশ্বাস করা উচিৎ?
সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে গেলে আপনাদের যে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি থাকতে হবে তা কি আছে? আপনার দেশের ৩৭ খানা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং কীভাবে করবেন আপনি? কীভাবে আপনি কোন ছেলেকে বুঝাবেন আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সি এস ই ভালো নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান? স্কেল কি আছে আপনার?
সে যাই হোক এবার আসুন স্যারের বেলতলার সমস্যা গুলো নিয়ে কিছু কথা শুনি-
সমস্যা ২- সহমত যে এই ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য টাকার দরকার হয়। তাহলে ভর্তি ফরমের দাম কমান না কেন। মাথা ব্যাথা করলে কি মাথা কেটে ফেলবেন নাকি পেইন কিলার খাবেন স্যার? অধিকন্তু আপনার যুক্তি গুলো কেন যেন হাস্যকর মনে হচ্ছে! বিশেষ করে ‘বিত্তশালীদের জন্য টাকা সমস্যা নয়_ তারা যে কয়টি ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এসি বাস, ফার্সদ্ব ক্লাস ট্রেন কিংবা প্লেনে করে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যায়। ভালো হোটেলে রাত কাটায়, তাই তাদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়’। এতটা সস্তা যুক্তি আপনার কলমের নিব দিয়ে বের হবে তা বিশ্বাস করতাম না! আমি নিন্ম মধ্য বিত্ত শ্রেণীর একজন ছাপোষা ব্যাংক কর্মকর্তার ছেলে, আমার বাবা আমাকে যে পর্যন্ত ব্যাবস্থা করতে পেরেছে সেই অবস্থান হতেই গ্রামের স্কুল কলেজে পড়াশুনা করে চারটি ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে নিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী আপনার সরাসরি ছাত্রী সেও একই ধরণের পরিবার থেকে এসে পাঁচটি পরীক্ষা দিয়ে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করেছিল! আমার এলাকার জুনিয়র অনেক ছেলেপেলেকেই ভর্তির সময় হতে চিনি যাদের নুন আনতে পান্তা ফুঁড়োয়ে যায় তাঁরাও সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের অবস্থা করে নিয়েছে। এমনকি অনেকের ভর্তির টাকা না থাকলেও চান্স ঠিকই পেয়েছে! অথচ আপনি বলছেন সম্পূর্ণ উল্টো কথা! আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আপনার প্রস্তাবিত পদ্ধতি চালু হলেই কেবল আপনার এই কথা সত্য হবে। কেন এই কথা উত্তর পরে দিচ্ছি।
সমস্যা ৩- উনি বলেছেন ‘মা-বাবারা অনেক সময়ই তাদের ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য দেশের নানা অচেনা শহরে নিয়ে যেতে চান না’। এটা ১৯৯০ এর দশকের চিন্তা থেকে বলেছেন স্যার। দুঃখিত আমরা তরুনেরা আপনার এই মতের সাথে একমত হতে পারব না। প্রমাণ স্বরূপ ২০০১-২০১৬ এই পর্যন্ত আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর আনুপাতিক হার বৃদ্ধির হিসেবটা দেখে নিতে পারেন।
সমস্যা ৪- এই অংশ নিয়ে আপনার সাথে আমি একমত। তবে এ ছিনিমিনি আপনারা কেন খেলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। ২০০১ সালের এস এস সি ব্যাচ হিসেবে এর চেয়ে বহুগুন ছিনিমিনি আপনারা আমাদের সাথে খেলেছেন। এখনো খেলছেন। বিস্তারিত মনে হয় বলার দরকার নেই। কারন সৃজনশীল নামক অপরিপক্ক এবং অসৃজনশীল একটি বিষয়কে শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেয়ার জন্য আপনার অবদান ছিল বলেই জানি। সে যাই হোক এই ছিনিমিনি খেলা আপনাদের ইচ্ছা থাকলেই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে অঞ্চল ভিত্তিক একই সপ্তহে পরীক্ষা নিলেই শেষ হয়ে যায়। যেমন টি করে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো। এই অসম যুক্তি দেখিয়ে ভর্তি পরীক্ষার মত একটি গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়কে বাদ দিতে বলা কত টুকুন যুক্তি যুক্ত স্যার?
সমস্যা ৫- ভর্তি পরীক্ষার প্রতিটি প্রশ্ন কোন না কোন গাইড বই থেকে নেয়া এবং সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই! ওয়াও স্যার, আচ্ছা আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে কি গাইড থেকে প্রশ্ন হয় না? শূন্যস্থানে আলোর গতি কত বা সোডিয়াম ক্লোরাইডের স্ফটিকের বিন্যাস কি ধরণের এই প্রশ্ন গুলো কি বাজারে গাইড বইতে একভাবে আর ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নে আরেকভাবে দেয়া যাবে স্যার? আলোর গতি কে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতে মোশন বললেই গাইডের থেকে আলাদা হয়ে যাবে? যদি উত্তর না হয় তাহলে আপনার এই যুক্তিও অযৌক্তিক।
এর পরে আসুন এইস এস সি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভর্তি। স্যার এটা কি খুব যৌক্তিক কোন কথা বলেছেন? যেখানে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে আপনি বৃষ্টিতে ভিজেও কোন রফা করতে পারছেন না সেই পরীক্ষার মাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলাতে আপনি এতটা অবাক হওয়ার কোন গুড় রহস্য আছে নাকি স্যার? ও হ্যাঁ, বলছিলেন না যে ধনীর দুলালদের ভর্তির সম্ভাবনা বেড়ে যায় ভর্তি পরীক্ষার জন্য আসলে আপনার এই নিয়মটি কার্যকর হলেই বরং আমাদের মত গ্রামের স্কুল কলেজে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীরা কোথাও ভর্তি না হতে পারার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। স্যার এইচ এস সি তে খুবই সম্মান্য পয়েন্ট নিয়ে ঢাবি এবং বা কৃ বি তে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু আপনার এই নিয়ম কার্যকর হলে ভোলা সরকারী কলেজেও পড়তে পারতাম কিনা সন্দেহ। অবাক হই স্যার আপনারা আমাদের মত সিস্টেমের স্বীকার শিক্ষার্থীদের জন্য সামান্য সুযোগ এই ভর্তি পরীক্ষা নামক আশীর্বাদ টুকুনও যখন কেড়ে নিতে চান তখন। লজ্জা লাগে যখন দেখি আপনাদের এই যুক্তি গুলো কার্যকর হলে চুরির অর্থে কেনা প্রশ্ন পেয়ে গোল্ডেন এ+ পাওয়া দের অত্যাচারে কীভাবে সঠিক মেধাবীরা হারিয়ে যাবে। আপনি কি সেই ভয়ংকর স্বপ্নটা দেখতে পাচ্ছেন স্যার আমি পাচ্ছি।
সমস্যা ৬- ‘ভর্তি পরীক্ষাগুলো খুব অযত্ন এবং অবহেলার সঙ্গে নেওয়া হয়। প্রত্যেকবার পরীক্ষা নেওয়ার পর দেখা যায়, প্রশ্নে ভুল আছে কিংবা এক প্রশ্ন দুই জায়গায় চলে এসেছে’। স্যার ছোট মুখে বড় কথা বলি, আমার কেন যেন মনে হয় আপনি মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলাটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ করেন। পি এইচ ডি ছাড়া কাউকে শিক্ষক হতে দেয়া বন্ধ করেন। এস এস সি কিংবা এইচ এস সি এর ফলাফল না দেখে পি এইচ ডি এর পাবলিকেশন দেখেন। তাহলেই দেখেবেন এই সব ছিঁচকে ভুল সমূলে উৎপাটিত হবেই হবে। এই সব না করে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করলে যারা আপনার বিভাগে ভর্তি হবে এবং শিক্ষক হবে তাদের সহকর্মী হিসেবে মেনে নিতে আপনি মানসিক ভাবে প্রস্তুত তো?
সমস্যা ৭- সমস্যা ৬ এবং ৭ এর কোন পার্থক্য পেলাম না। আর সম্মিলিত পরীক্ষা নিলেই কি আপনি স্কুল কলেজে সিট না ফেলে পারবেন নাকি স্যার? তাই আবারো বলব নিজেদের যোগ্য করুন। ভর্তি পরীক্ষা বাদ দিয়ে নিজেদের সমস্যা গুলো ঢাকা যাবে কিন্তু পচন ঢেকে কি লাভ স্যার?
সমস্যা ৮- মফঃস্বলের ছেলেরা কেন কোচিং করে এটা কি কখনো ভেবে দেখেছেন স্যার? কখনো কি ভেবেছেন গত ২ দশকে কারা মফঃস্বলের শিক্ষক হয়েছেন? আমি নিজে ঢাকা আসার পূর্বে জানতাম না যে ভর্তি পরীক্ষা নামে একটা পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। আমাকে আমার কোন শিক্ষক বলে নি। আর বর্তমানের শিক্ষকদের কথা না হয় বাদই দিলাম। অর্থাৎ আপনি স্বজনপ্রিতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে গাধা গরু নিয়োগ দিলেন, সেই নিয়োগের ফলে শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞানের অভাব জনিত রোগে ভোগে তার সুযোগ নিয়েই কিন্তু কোচিং গুলো ব্যাবসা করে। আপনি সেই রোগ নির্মূল না করে আবারও পচন ঢাকতে ব্যাস্ত কেন আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক তা বুঝতে পারছে না। দুঃখিত।
সমস্যা ৯- সিট ফাঁকা থাকাও আপনাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকগণের ক্ষমতার দন্ধের ফল। এটাকে ভর্তি পরীক্ষার উপর চাপালেন কেন? আপনারা নিজেদের ইগোতে ছাড় না দিয়ে একেক জন নিজেদের সেরা প্রমানে ব্যাস্ত। কেউ কারো সাথে আলোচনা করবেন না কিংবা সমন্বয় করবেন না। যার ফলে এই ধরণের অবস্থা সৃষ্টি হয়। আর আপনার এই আংশিক সত্য কথা খানার মিথ্য অংশ টুকুন ২০০৩-০৪ সালের বা কৃ বির ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। আবারও বলব স্যার নিজেদের কলিগদের ঠিক করুন সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। শুধু শুধু আমাদের মত মাঝারি মেধাবী এবং দরিদ্র বা নিন্ম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের আপনাদের এই ইগোর বলি করবেন না।
সমস্যা ১ এবং ১০ সম্পর্কে বলব শুধু মাত্র আপনার চিন্তা ভাবনাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতেই এই দুটি অংশ যুক্ত করেছেন। ভর্তি পরীক্ষার সাথে মানবিক বিপর্যয়ের কোন সম্পর্ক কখনো ছিল না হবেও না। আর ৩৭ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একত্র করেন তাহলেই দেখেবেন কত সুন্দর অঞ্চল ভিত্তিক সময় নির্ধারণ করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিচ্ছে। যা শিক্ষার্থীদের হয়রানী কমানোর সাথে সাথে ভর্তির পরে ক্লাসে কিছু শিখতেও সাহায্য করবে। রঙের নিচে নিজেদের বিন্যস্ত না করে শিক্ষার্থীদের রঙে নিজেদের রাঙাতে পারলেই হয়ত এই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সর্বশেষ বলব, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যাবস্থার করুন নির্যাতনের পরেও যে যৎসামান্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের পদচারনাতে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো মুখরিত হয়, যারা দেশে বিদেশে নিজেদের দেশের নাম উজ্জ্বল করে চলছে প্রতিনিয়ত সেই ধরণের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ঠেকানোর জন্যই আপনাদের এই পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে স্পুন বা ফিডারে করে শিক্ষা গ্রহণ করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই বাড়বে মেধাবীদের আনাগোনা ক্যাম্পাস গুলোতে জ্যামিতিক হারে কমবে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর নিজেদের কোন মানদণ্ড না থাকাতে ভয়াবহ এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। যদি আমি জীবিত থাকি তখনো দেখব আপনি আবার লেখা লেখি করছেন এবং সেটা লিখবেন এই জন্য যে আপনি যেভাবে বলেছেন সেই ১০০% অনুসরণ না করার কারনেই আজকের এই বিশৃঙ্খলা! স্যার ১৬ কোটি মানুষের দেশের সকল সিদ্ধান্ত একজন মানুষের মাধ্যমে আসলে তা সকলের জন্য ভালো না হওয়ার সম্ভাব্যতা ৯৯.৯৯৯৯৯%। মহান রাব্বুল আলামিন যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আপনাদের চালু করা এমন উদ্ভট সব নিয়মের হাত থেকে রেহাই দেন। আমীন।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সকাল ৮:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



