ইডেন কলেজে কাল যে ঘটনাটা ঘটেছে, তা তো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ধারাবাহিক যে প্রক্রিয়ায় আমরা ক্রমাগত শক্তিমানদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছি, এ তো তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র আমি। বর্ধিত বেতন ফি বিরোধী আন্দোলন কেবল শেষ হয়েছে। কিছুদিন পরেই শুরু হলো ইয়ার-সেমিস্টার আন্দোলন। ছাত্ররাজনীতি করি। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জের প্রতিবাদে মিছিল বের হলো। তখনকার দিনের মতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা মিছিলে হামলা চালালো। সামনে থেকে লাঠি হাতে নেতৃত্ব দিলেন তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন শফিক। এখন তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ সভাপতি। তাদের হামলায় ছাত্র ইউনিয়নের তখনকার সভাপতি সুমনা সরকার ঝুমুরের কাপড় চোপড় ছিঁড়ে গেলো। তাকে মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করলো ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। ছাত্রফেডারেশনের নেত্রী মনীষা মাফরুহাকে চোখের সামনে পিটিয়ে আহত করলো। পুলিশ ছিলো নিশ্চুপ, প্রশাসন নির্বিকার। সাংবাদিকতা শুরুর পরেও আমি দেখেছি এরকম বেশ কিছু ঘটনা। 2004 সালে নিয়মিত কাশ পরীার দাবিতে আন্দোলনরত শিার্থীদের ওপর হামলা চালায় তখনকার মতাসীনদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। দিনের আলোয় সবার সামনে অস্ত্র হাতে হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তখনকার সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম। এখন তিনি নির্বাচন কর্মকর্তা। আমার চোখের সামনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ সভাপতি আনোয়ার হোসেন উজ্জলের ছোট ভাই মনোয়ার হোসেন উৎপল আন্দোলনরত বাংলা বিভাগের ছাত্রী মণিকে পেছন থেকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষেছেন। আর বলেছেন, '...কি ...গী, তোর পাছায় খুব তেল হয়েছে না? আজকে এমন ...দন দেবো যে তোর তেল বের হয়ে যাবে।' এদিনও পুলিশ ও প্রশাসনের কোনো আওয়াজ শোনা যায়নি। 2003 সালে শিবির ক্যাডাররা যখন আন্দোলনকারী শিার্থীদের ওপর চড়াও হয় তখন ক্যাম্পাস হয়েছিলো রক্তাক্ত। সেদিন সেই হামলায় অংশ নেয়া শিবির ক্যাডার বোমারু তোফা, মন্টুরা সেই পুরস্কার হিসেবে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন। 2004 সালের 30 অক্টোবর গভীর রাতে ছাত্রী হলে অস্ত্রধারী পুরুষ প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর পুলিশ-শিক-কর্মকর্তা-কর্মচারি, ছাত্রদল ও শিবির ক্যাডাররা সম্মিলিতভাবে যে হামলা চালিয়েছিলো তা এখনো ত হয়ে আছে। হামলার নেতৃত্ব দেয়া সেই সব শিক নজরুল ইসলাম, আওরঙ্গজেব গংরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওদের লজ্জ্বাও করে না!
লজ্জা করবে কী করে? ওরাও যে সবাই রাজনৈতিক দলের পা চেটে চেটে আজ এ পর্যন্ত। রাজশাহীর সাংবাদিক মহলে সাবেক এক উপ-উপাচার্য 'টুল' বলে পরিচিত ছিলেন। ওই ভদ্রলোক একবার কথায় কথায় বলেছিলেন, 'ম্যাডাম যদি আমাকে সারাদিন তার বাসার সামনে টুল নিয়ে বসে থাকতে বলে আমি তা করতেও প্রস্তুত।' এরপর থেকেই তার পরিচিতি হয়ে যায় টুল। বুঝুন অবস্থাটা! তাহলে এদের কাছে তো নিজের মর্যাদা, শিার্থীদের নিরাপত্তার চেয়ে তার গদি বাঁচানোই বড় হবে। আর সেই গদি বাঁচানোর জন্য যদি প্রয়োজন হয় তাহলে ছাত্রনেতাদের হাতে-পায়ে ধরতেও তাদের আপত্তি থাকে না। এ কারণেই তো ইডেন কলেজের অধ্যা ছাত্রদলের সন্ত্রাসীগুলোকে 'ভালো মেয়ে' বলতে পেরেছেন।
এইসব 'ভালো মেয়ে'রা শুধু ইডেন কলেজেই নয় সবখানেই থাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি এদের দেখেছি। প্রশাসন এদের জন্য সব নিয়মই শিথীল করেছে বরাবর। ফরহাদ হোসেন আজাদ তখন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি। তিনি ক্যাম্পাসে এলে হৈ হৈ রব পড়ে যায়! মন্নুজান হলে ছাত্রদলের এক নেত্রী ছিলেন। বিয়ে-থা করে এখন তিনি সংসারী, এক বাচ্চার মাও। সে কারণেই তার নামটি বলছি না। তো, ফরহাদ হোসেন আজাদের রাত কাটানোর বন্দোবস্ত করা হলো জুবেরি ভবনে একটি এসি রুমে। আজাদ সাহেব সেই নেত্রীকে রাতভর সাংগঠনিক আলাপের জন্য রাখলেন কাছে! পরদিন থেকে নেত্রীর মতা দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেলো! অথচ সাধারণ মেয়েরা হলের বাইরে রাত কাটানো তো দূরের কথা, সন্ধ্যা 7 টার পরে হলের ভেতরে ঢুকতে পারে না সান্ধ্য আইনের কারণে। একই ধরণের ঘটনা আরো দেখেছি আমি। সেই মতাধর 'ভালো মেয়ে'রা হলের যে রুমে থাকে সেটি হয় ভিআইপি রুম। তাদের দখলে থাকে হলের সব সিট। তা নিয়ে তারা বাণিজ্যও করে।
দীর্ঘদিন ধরে সবখানে একই ধরণের ঘটনা ঘটে চলেছে। সেই ঘটনা যখন ছাপা হয় তখন আমরা একটু মর্মাহত হয়। চুক চুক আহা উহু করি। তারপর আবার ভুলে যাই। আমরা মনে করি এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আসলেই কি তাই? ধরা যাক, বিএনপি-জামাত জোট সরকার মতায় নেই। তখন কি এ ধরণের ঘটনা ঘটবে না? আজকের নিশিথাদের জায়গা কি অন্য কেউ নেবে না? তাহলে গলদটা কোথায়? গলদটা ছাঁচে। এমনই এক ছাঁচ আমরা গড়েছি যেখানে পড়লে নির্ঘাত সেই দানবীয় আকৃতিপ্রাপ্তই হয়ে উঠবে সবাই। তাই আসুন না, ইডেনের ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করি। তারপর নিজেদের স্বার্থেই চলুন পুরানো ছাঁচগুলো সব ভেঙে ফেলি। প্রয়োজনে দূর করে দিই ছাঁচে ফেলার সিস্টেমটাকেই।
আমার আগের পাঠানো ছবি ও প্রশ্নটিতে যারা সাড়া দিয়ে অথবা না দিয়ে নিজে থেকে এ ব্যাপারে লিখেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



