somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

স্বপ্নবাজ সৌরভ
আমি 'স্মৃতিকাতরতা ' নামক ভীষণ এক রোগগ্রস্ত, সেই সাথে বিষাদগ্রস্থ মানুষ। আমার চিকিৎসার প্রয়োজন।

অদ্ভুত আঁধার

১৬ ই আগস্ট, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবি : ইন্টারনেট
"অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা; "



অদ্ভুত আঁধার


মসজিদের চাবিটা আমার কাছে রাখা আছে ক'দিন ধরে। মোয়াজ্জিন সাহেব অসুস্থ তাই কয়েকদিন ফজরের আজান দেয়া এবং মসজিদ খোলার দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর । খারাপ লাগেনা। ফজরের ওয়াক্তের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে যায় আর ঘুম হয়না। আজ তার ব্যতিক্রম হলো না। ঘুম ভেঙে গেলো। পাশ ফিরে খেয়াল করলাম পিঠের দিকটা অনেক ভেজা। ঘামে ভেজা। ঘামে ভিজে যাওয়ার মত গরম কি পড়েছে ? নাহ ! ফুল স্পিডে ফ্যান চললে শেষ রাতে রীতি মতো পাতলা কাঁথা গায়ে দেয়া লাগে। ফ্যান চলে ঝড়ের বেগে , পায়ের কাছে আলুথালু পাতলা কাঁথা।
ভেজা গায়ে অস্বস্তি লাগছে। খেয়াল করলাম, মনের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা। দুঃস্বপ্ন দেখেছি কোন? মনে করার চেষ্টা করলাম। নাহ , ঠিক মনে পড়লো না। বেশি মাথা না ঘামিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম । ফজরের আজান দিতে হবে। দেয়াল ঘড়িতে ফজরের ওয়াক্ত হবো হবো। ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে ১৪ মার্চ , ২০০২ , বৃহস্পতিবার।

নওদাপাড়া জামে মসজিদ টা জিকে প্রজেক্টের ( গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প) ক্যানেলের ধারে। এই সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও যশোর জেলার ১৩টি থানায় সেচ সুবিধা দেয়া হয়।জিকে সেচ প্রকল্পের প্রধান পানির উৎস পদ্মা নদী।এই পদ্মা নদী দিনে দিনে হয়ে যাচ্ছে মরা খাল।

আব্বা আম্মা ঘুমাচ্ছে। গেটে তালা লাগিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। আমাকে দেখে সদা সতর্ক পোষা কুকুরটা দাঁড়িয়ে গেলো।আমার সাথে কিছুটা হেঁটে লেজ নাড়তে নাড়তে ফিরে গেলো তার জায়গায়। একবার ভাবলাম সাথে এলে ভালোই হতো। আমি যখন বাড়ি থেকে ঢাকায় আসতাম , কুকুরটা ঠিক পেছন পেছন যেত কোচ স্যান্ড কিংবা স্টেশন পর্যন্ত। গাড়ি না ছাড়া পর্যন্ত ঠিক অপেক্ষা করতো।
আমি হেঁটে এসেছি বাড়ির পুকুর পর্যন্ত। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে নারিকেল গাছের পাতায় ঝিরিঝিরি বাতাস। আমি অন্ধকারে গুটিগুটি পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি। অন্ধকার আমার মোটেও ভালো লাগে না। ঘামে ভেজা পরিস্থিতি ভাবাচ্ছে আমাকে । পুনরায় অস্থিরতাবোধ করছি। আমি কি ভয় পাচ্ছি? কিন্তু কেন? মসজিদ আর মাত্র ১৫ মিনিটের রাস্তা। ছোট একটা শালবাগান পেরিয়ে উঠে যেতে হবে সোজা ক্যানেলের রাস্তায়।

শালবাগান , বন হয়। গোটা পঞ্চাশেক গাছ সারি সারি লাগানো , ঘন। তার মাঝে সরু রাস্তা। এই রাস্তা হরে চলে যেতে হবে সোজা ক্যানেলের রাস্তায়। শালবাগান পেরিয়ে এসেছি মাত্র। হটাৎ জানি কেমন মনে হলো! আচ্ছা , আমার পেছনে কেউ কি আছে? কেউ কি হাটছে ? ইচ্ছে হলো ফিরে তাকায়। আমার সাদা পাঞ্জাবি ভিজে উঠলো , দাড়িতে বিন্দু বিন্দু ঘাম , কখন জমেছে খেয়াল করিনি।
' আসলামুআলাইকুম ! ' পেছনে তাকানোর আগেই সালামের শব্দ। কোথায় ছিলেন এত্তক্ষন ইনি ? সাদা আলখাল্লা , সাদা পাগড়ি আর সাদা দাঁড়িয়ালা মানুষটাকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো। প্রচন্ড পিপাসায় গলা শুকিয়ে গেলো।
' আসলামুআলাইকুম ! ' দ্বিতীয়বার সালামে সতবিত ফিরে পেলাম।
'ওয়ালাকুমুসসালাম' ! কোনমতে সালামের উত্তর দিলাম। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে। দৃষ্টি অপলক। কে ইনি। কোথা থেকে এলেন ? প্রশ্নের পর প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অসার হয়ে আসছে হাত পা।একটু হাঁটলেই ক্যানেলের রাস্তা। আমি ঠায় ধরিয়ে আছি।
'মসজিদের রাস্তা কোনদিকে ?' জানতে চাইলেন। অদ্ভুত এক দৃষ্টি অসার করে রেখেছে আমাকে। যেন এক সম্মোহনী দৃষ্টি।শান্ত। মায়াময়। আমি হুট্ করে চোখ ফেরালাম।
' মসজিদ সামনেই , আসুন আমার সাথে। ' নিজের কণ্ঠ নিজের কাছেই অচেনা মনে হলো। মনে হলো অন্য কারো কণ্ঠ আমার দেহে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
' জ্বী , আপনি যান আমি আসছি। ' মানুষটি স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিলো।
আমি পা বাড়ালাম। পেছনে আসছে মানুষটি। সামনেই ক্যানেলের রাস্তা , তার বামপাশেই জামে মসজিদ। পেছনে পায়ের শব্দ পাচ্ছি। মানুষটি পেছন পেছন হেটে আসছে। আয়াতুল কুরসি মুখস্ত ছিল। এখন আর মাথায় আছে না। হুট্ করে সব কেন জানি ভুলে গেলাম। সূরা ফাতিহা পড়তে পড়তে এগুচ্ছি। পেছনে পায়ের শব্দ। মসজিদের ঢালে নামতেই পেছন ফিরলাম । থেমে গেল পায়ের শব্দ।পেছনের মানুষটি নেই। হারিয়ে গেলো অদ্ভুত এক আঁধারে।
আর দেরি না করে ছুটে এলাম মসজিদের বারান্দায়। দেয়ালে ঘেমো পিঠ লাগিয়ে হাঁফাতে লাগলাম। আমার পকেটে চাবি। মসজিদের দরজা খুলতে হবে। আজান দিতে হবে। আঁধার কাটিয়ে সে ধ্বনি মিলিয়ে যাবে সুদূরে। ভোর হবে।

মুসল্লি আসতে শুরু করেছে। আজান দিলাম। নামাজ হলো। আমি এশরাক এর নামাজ শেষ করে মসজিদের চাবি দিয়ে বাড়ি ফিরলাম। এরপর রাত থেকে জ্বর আসলো। দুদিন পরে পক্স। আমি বিছানায় শুয়ে থাকি আর ওই রাতের কথা ভাবি।
ডাক্তার , মনোরোগ , ঔষুধ অনেক কিছু গেলো। ধীরে ধীরে সুস্থ হলাম। কিন্তু মাথার মধ্যে সেই ঘটনাকে নিয়ে বড় হচ্ছি। মাঝে মাঝে মনে হয় ১৪ মার্চের রাতে ফজরের ওয়াক্তের আগে ওই রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবো। আরো একটি অদ্ভুত আঁধারের অপেক্ষায়। দেখা পাবো একদিন। -- যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা!

** লেখাটি পুনরায় পোষ্ট করা হলো। সোজা কথায় রিপোস্ট।

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:৫৮
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×