somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিসাব চোকানো - হরমুজ এবং মার্কিন আধিপত্যের অবসান

১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল ও গভীর প্রভাবশালী ঘটনাগুলোর একটি। দীর্ঘদিন আমেরিকা ও তার মিত্ররা ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে রেখেছে। হরমুজ প্রণালীকে অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইরান এখন পশ্চিমাদের সেই অন্যায়ের জবাব দেবার একটা সুযোগ পেয়েছে।

এই ঘটনা কি বিশ্বব্যাপী আমেরিকার আধিপত্যের অবসানের ইঙ্গিত দেয়? এর বদলে কী ধরনের নতুন বিশ্বব্যবস্থা আসতে পারে? ১৯৫৬ সালে মিশর পাঁচ মাসের জন্য সুয়েজ খাল বন্ধ করে দিয়েছিল, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে দুর্বল করে ফেলে। তখন প্রথমবারের মতো বোঝা যায় যে, ছোট একটা দেশও বিশ্বব্যবস্থাকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

সেসময় ব্রিটেন ইউরোপের বড় জ্বালানি সরবরাহকারী ছিল। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত তেলক্ষেত্র থেকে তেলবাহী জাহাজ সুয়েজ খাল দিয়ে ইউরোপে যেত। মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল মিশরে আক্রমণ করে। নাসের তখন সুয়েজ খাল বন্ধ করে দেন। এতে ব্রিটেনে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, তেলের রেশনিং চালু হয় এবং আইএমএফ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এই সংকট ব্রিটেনকে দুর্বল করে ডলারের আধিপত্য তৈরির পথ খুলে দেয়।

বর্তমান সংকটে হরমুজ প্রণালী কার্যত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব শুধু তেল-গ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়। তরল গ্যাস সরবরাহ, সার উৎপাদনের ইউরিয়া, সেমিকন্ডাক্টরের হিলিয়াম, এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সালফার সরবরাহও এতে ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রভাব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই সংকট উন্নত ও উন্নয়নশীল, দুই ধরনের অর্থনীতিতেই চাপ সৃষ্টি করছে। যুক্তরাজ্যে সুদের হার বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌঁছেছে। আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যদিও তারা বড় তেল উৎপাদনকারী হওয়ায় সুরক্ষিত আছে। চীন অনেকটা স্থিতিশীল আছে।

হরমুজ সংকট বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি চাপ-পরীক্ষা হিসেবেও কাজ করছে। এটি ডলার-ভিত্তিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে, যেখানে তেলের দাম ডলারে নির্ধারিত হয় এবং বৈশ্বিক ঋণ ব্যবস্থাও ডলারের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে সম্পদ একদিকে ডলারে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং দুর্বল অর্থনীতিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদি বিশ্ব ধীরে ধীরে পেট্রো-ডলার ব্যবস্থার বাইরে যায়, তবে এটি সুয়েজ সংকটের মতো একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে, যখন ব্রিটেনের স্টার্লিং আধিপত্য শেষ হয়েছিল। তবে এবার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিগত বছরগুলোতে আমেরিকান আধিপত্য ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছিল। এর পেছনে ছিল ডলার নির্ভরতা নিয়ে অসন্তোষ, চীনের উত্থান, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাড়তি রাজনৈতিক প্রভাব।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। আমেরিকা রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে রাশিয়া ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়, ফলে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। ইউরোপ বাধ্য হয়ে আমেরিকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০২৩ সালের মধ্যে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক গ্যাস আমদানি আমেরিকা থেকে আসতে শুরু করে। একই সময়ে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ালে ডলার আরও শক্তিশালী হয়।

রাশিয়াকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা অনেক দেশকে সতর্ক করে দেয়। ফলে ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার অনুসন্ধান বাড়ে। চীন তার পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ে, এবং ব্রিকস জোট বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। যদিও এসব উদ্যোগ ডলারের পূর্ণ বিকল্প নয়, তবু তারা একটি সম্ভাব্য বিকল্প কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করছে।

বর্তমানে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিস্তার, সৌর, বায়ু, ব্যাটারি ও সবুজ প্রযুক্তি - উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করছে। এর খরচ দ্রুত কমে যাওয়ায় এটি বাস্তব বিকল্প হয়ে উঠছে এবং নতুন বিনিয়োগের বড় অংশ এখন এই খাতে যাচ্ছে। এতে দেশগুলোর স্বনির্ভরতা বাড়ছে, কারণ স্থানীয়ভাবে শক্তি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা তুলনামূলকভাবে কমছে।

সব মিলিয়ে, হরমুজ সংকট জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর বৈশ্বিক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আমেরিকার শক্তির সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। তবে এটি আমেরিকার ক্ষমতার হঠাৎ পতনের ইঙ্গিত নয়, বরং ধীরে ধীরে পরিবর্তনের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখায় যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং ধারণা - দুটোই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।

(লেখাটি মিশরীয়-আমেরিকান অধ্যাপিকা মোনা আলীর "হিসাব চোকানো - হরমুজ এবং মার্কিন আধিপত্যের অবসান" (The Reckoning- Hormuz and the end of American hegemony: Mona Ali) এর সংক্ষিপ্ত অনুবাদ। আমি অদল-বদলজনিত কিছু মাতবরি করেছি মাত্র।)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধ উন্মত্ততার কাছে মানবতা কেন পরাজিত?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৫১

অন্ধ উন্মত্ততার কাছে মানবতা কেন পরাজিত?
---------------------------------------------------------------
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক পীরের আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং শেষ পর্যন্ত নির্মম হত্যাকাণ্ড এ ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীরে পচে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈশ্বর-পূজারী নই, আমি মানব-পূজারী

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:০৯

ঈশ্বর-পূজারী নই, আমি মানব-পূজারী;
ধর্ম আমার মানবপ্রেম ।
মসজিদে নয়, গীর্জায় নয়, নয় মন্দিরে—
বিচিত্র মানুষের ভিড়ে
আমি খুঁজে ফিরি ঈশ্বরের অস্তিত্ব ।

বিশুষ্ক মরুর বুকে যারা সবুজের স্বপ্ন দেখে;
দুর্জয়কে জয়ের নেশায় সমুদ্রের গভীরে
যারা নিরুদ্দেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল সালুতে মজিদ টিকে গিয়েছিল, শামীম সেটা পারেনি।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৪৮


আজ শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামের তৌহিদি জনতা মব করে একজন মানুষকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মেরে ফেলেছে, তার আস্তানা ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছে। নিহত ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোরআন , হাদিস ও ফিকাহ মতে ইসলামে সঠিক পথ অনুসরণ প্রসঙ্গ কথামালা ( সাময়িক পোস্ট)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:১৫


“আল্লাহ অভিন্ন ফিকাহ মানার কথা বললে রাসূল (সা.) কোরআন ও হাদিসের মানার কথা কিভাবে বললেন? “ এই শিরোনামে গতকাল সামুতে প্রকাশিত ব্লগার মহাজাগতিকচিন্তার একটি বিশালাকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ ২০২৪: অস্থিরতার অন্তরালে কী ছিল? লেখকীয় বিশ্লেষণ | সমসাময়িক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৫

ছবি

বাংলাদেশে ২০২৪: ক্ষমতার পালাবদল নাকি গোপন সমন্বিত পরিকল্পনা?

২০২৪ সালের আগস্ট- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অস্থির ও বিতর্কিত অধ্যায়। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে অনেকের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×