আমি গত প্রায় ১৮ বছর যাবত আমার বর্তমান এলাকায় বসবাস করছি। স্থানীয় মাসজিদটি আমার বাসা থেকে প্রায় চার মিনিটের মত হাঁটা পথে অবস্থিত বিধায় চেষ্টা থাকে দিনে যতবার সম্ভব, মাসজিদে গিয়েই জামাতে নামায পড়ার। টানা পাঁচ ওয়াক্ত খুব কম দিনেই পড়তে পারি, তবে অন্ততঃ ৩/৪ ওয়াক্ত প্রায় নিয়মিতভাবেই জামাতে পড়া হয়ে থাকে।
সম্প্রতি আমাদের মাসজিদের বিগত ইমাম সাহেব এবং সিনিয়র মুয়াজ্জিন সাহেব প্রায় একসাথে অন্যত্র চলে গেছেন। মাঝখানে অনেকদিন দ্বিতীয় মুয়াজ্জিন হাল ধরেছিলেন এবং ইমামতি চালিয়ে যাবার ব্যাপারে তিনি সাধ্যমত আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। অবশেষে মাসজিদ কমিটি অনেক যত্নের সাথে প্রার্থী বাছাই করে সিনিয়র মুয়াজ্জিন হিসেবে একজন যোগ্য প্রার্থীকে নিয়োগ দান করলেন। তার পারফর্ম্যান্স ভালোই হচ্ছিল। ইতোমধ্যে নতুন একজন ইমাম সাহেবও যোগদান করলেন, মাত্র ৪/৫ দিন আগে। গতকাল তিনি আমাদের মাসজিদে প্রথম জুম্মার নামায পড়ালেন। খুৎবা শেষে তিনি সংক্ষেপে নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করলেন এবং তার দায়িত্ব পালনে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও পরামর্শ কামনা করলেন।
গত ১৮ বছরে উনি এখানে আমার দেখা তৃতীয় ইমাম। তিনজনকেই আমার কাছে যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানী আলেম বলে মনে হয়েছে। তিনজনেরই ক্বিরাত এবং বয়ান শুনতে আমার খুব ভালো লাগতো/লেগেছে। প্রথম দু’জনের কণ্ঠ তৃতীয় জনের চেয়ে একটু বেশি সুরেলা ছিল এবং তাদের উচ্চারিত ক্বিরাত অন্তর ছুঁয়ে যেত। তৃতীয় জনের কণ্ঠ একটু কম সুরেলা হলেও তার ক্বিরাতের একটি অনন্য ঐশ্বর্য তার স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ উচ্চারণ এবং ধীর-স্থির লয়ে ক্বিরাত পাঠ। মুসল্লীরা তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দকে স্পষ্টভাবে শুনতে ও বুঝতে পারেন। ফলে নামাযে মন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাগ্র হয়ে ওঠে; যাদের নিয়মিত ক্বোরান পাঠের অভ্যাস রয়েছে, তারা যেন উচ্চারিত আয়াত সমূহের প্রতিটি শব্দকে নিজের চোখের সামনে দেখতে পান।
আজ সকালে ফজরের নামাযে মাসজিদের জামাতে সামিল হতে পেরেছিলাম। ইমাম সাহেব সুরাহ আস-স’ফ দিয়ে ক্বিরাত পাঠ শুরু করলেন। দুই রাকাতে তিনি সুরাহ আস-স’ফ এর পুরোটা পাঠ করলেন। তার মধ্যে কয়েকটি আয়াত ওভারল্যাপিং করে পাঠ করলেন। প্রথম রাকাতে আয়াত ১-১২, দ্বিতীয় রাকাতে ১১-১৪ নং আয়াত। আমি বিমুগ্ধ হয়ে একাগ্রচিত্তে তার ক্বিরাত পাঠ শুনছিলাম। এক সময় মনে হলো, উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আমার হৃদয়কে কোমল থেকে কোমলতর করে দিচ্ছে! দয়াময় রব্বের ঐশী করুণাধারা আমাকে সহ যেন মাসজিদের অভ্যন্তরের প্রতিটি মুসল্লীর উপরে নিঃশব্দে বর্ষিত হচ্ছে! আমার হৃদয় নরম হয়ে হয়ে যেন গলে পড়ছে। এর কারণ হয়তো বা এই হবে যে এই সুরাহ’র অনেকগুলো আয়াত আমার মুখস্থ আছে এবং কিছু আয়াতের অর্থও জানা আছে। তবে তার চেয়েও বড় কারণ ছিল মনে হয় ইমাম সাহেবের ধীর স্থির লয়ে, স্পষ্ট উচ্চারণে ক্বিরাত পাঠ, যা মাসজিদের অভ্যন্তরে এক ঐশ্বরিক আবহের সৃষ্টি করেছিল। আমি নীরব অশ্রুপতন সংবরণ করতে পারলাম না।
নামায ও দোয়া দরুদ পাঠ শেষে মাসজিদে বসেই সুরা আস-স’ফ অর্থসহ পুনরায় পাঠ করলাম। তারপর মাসজিদ থেকে বের হয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটাহাটি করতে করতে আমার এক বাল্যবন্ধুর সাথে অনুভূতিটা শেয়ার করলাম। সেও একই এলাকার বাসিন্দা এবং একই মাসজিদে নামায পড়ে থাকে। কিন্তু গতকাল সে ঢাকার বাইরে বেড়াতে গেছে। সে ক্বোরান শরীফ নিয়ে অনেক চর্চা এবং গবেষণা করে থাকে। তাই পবিত্র ক্বোরান শরীফ নিয়ে যে কোন রেফারেন্সের জন্য আমি তার শরণাপন্ন হয়ে থাকি। আমি যখন তাকে ফোন করেছিলাম, তখন সেও বাদ-ফজর ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল ছিল। তাই সে আমার কথা শুনে আলাপ সংক্ষিপ্ত করে এক কথায় উত্তর দিলঃ “দোস্ত, তুই একটু সুরাহ আনফাল এর ২-৪ এবং সুরা মু’মিনুন এর ১-১১ নং আয়াতগুলোর অর্থ দেখে নিস।“
আমিও আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটাহাটি শেষে বাসায় ফিরে তার পরামর্শ অনুযায়ী আয়াতগুলোর অর্থ দেখে নিলাম।
ঢাকা
১৮ অক্টোবর ২০২৫
শব্দ সংখ্যাঃ ৫৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

