প্রতিদিন ভাবে কিছু কথা কিন্তু বলা হয় না। আজ বলব মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হয় মুনিরা। প্রায় তিনমাস ধরে এনজিওর কিছু আপা আসছে গ্রামে। মহিলাদের ডেকে বসছে স্কুলের মাঠে। অনেক বিষয়ে কথা বলে, তারা। সংসার জীবনে, যে কথাগুলো আগে কেউ কোনদিন বলেনি। তেমন অনেক কথা বলে। শুনতে খুব ভালোলাগে মুনিরার।
কথা শেষে প্রশ্ন করে আপনাদের কোন প্রশ্ন আছে
একদিন মুনিরার দিকে আপাটা এমন ভাবে চেয়েছিল, যেন বুঝতে পেরে ছিল মুনিরার মনে অনেক প্রশ্ন থৈ থৈ করছে। বুকের ভিতর বান কথার, অনেক প্রশ্নের, অনেক না বলা কথার কিন্তু এতো লোকের সামনে নিজের গোপন কথা কেমনে বলবে মুনিরা। ঠোঁট দুটো যেন গাম দিয়ে সেটে গেল। মুখ খুলে একটি শব্দও বের করতে পারল না মুনিরা।
ও জানে এখানে উপস্থিত মানুষগুলো কেউ ওর বন্ধু না। সালেহা যে আজীবন সখি। এক বাড়িতে বিয়ে হয়েছে। দুজনে জা। এবং দুজনেই প্রতিদিন সম্মুখিন হয় এই সমস্যা গুলোর। সেই সালেহাও মুনিরা প্রশ্ন করলে, সবার আগে গিয়ে বাড়িতে বলবে স্বামীর কাছে, দেবর, মুনিরার স্বামীর কাছে। শাশুড়ির কানে তুলবে কথা। আর মুনিরার জীবন হবে নাজেহাল। কথায় এবং মারে।
ননদের কানেও চলে যাবে তাদের শ্বশুড় বাড়িতে। সুযোগ খুঁজতে থাকবে তারা বাড়ি আসার। যদিও তারাও একই সমস্যায় থাকে কিন্তু সে এক বছর পরেই হোক, নাইয়র এসেই তারা মুনিরাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দিবে। তুমি নাকি আপাদের কাছে প্রশ্ন করছিলা। এবং এই হাসাহাসির সূত্র জ্বলাময় কঠিন আঘাতে ফিরবে, মুনিরার পিঠে। বয়স মোটে সতের হলেও এই বিষয়গুলো খুব ভালো বুঝে ফেলেছে মুনিরা। গত দু বছরে।
বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় স্বামী মানুষটি বদলে গেলো। আদর সোহাগের নরম কথাবর্তা কেমন তেলেবেগুনে চর্চর করে উঠে। পীলে চমকে উঠে মুনিরার। ভয়ে বুক ধরফর করে। কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে তোতলাতে থাকে। ভয়ের তোতলামির কারণে হাত পা কেঁপে সালুন সুদ্ধ বাসন পরে যায় হাত থেকে, চীনা মাটির বাসন ভেঙ্গে যায়। এসব কারণে আরো ধমক খায়, জন্মের মরন মার খায়। হাসির জন্যও ধমক খায় মুনিরা।
মুনিরা জীবনের সব কথা বলা পাখিগুলো উড়িয়ে দেয়, আকাশে। হাসির স্বপ্নগুলো দীঘির জলে গভীর ডুবিয়ে দেয়।
পায়ের নূপুর খুলে রাখে শব্দে,শাশুড়ির ঘুম ভেঙ্গে যায় বলে। হাতে রিনিঝিনি কাঁচের চুড়ি আর বাজে না মারের সময় ভেঙ্গে হাত কেটে রক্ত ঝরায় বলে। অসংখ্য কাটা আর কালসিটে দাগ ওর শরীর জুড়ে। তার চেয়ে বেশী কালো অন্ধকার ওর সমস্ত বন্ধ দরজার মন। যেখানে কোন আলো ঢুকার সুযোগ নাই। কোন প্রশ্ন বেড়ুনোর ফাঁক নাই দুই ঠোঁটের মাঝে। সব কিছু কুলুপ এঁটে লেপে দিয়েছে মুনিরা। ও জেনেছে নিরব দিঘীর মতন হয়ে গেলে কেউ তেমন আর আমল দেয় না। শ্যাওলায় ঢেকে থাকে নীচে টলটলে জল। মাঝে মধ্যে তবু দু একটা ঢিল ছুঁড়ে ঢেউ তুলে দিঘীর বুকে দূরন্ত বালক। এ ছাড়া সব শুনশান পরে থাকে।
এনজিও আপাদের কথা শুনে ওর মনের বন্ধ দরজায় খলবলে ঢেউ উঠে। চিতকার করে সব গোমড় ফাঁক করে দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু এরপর কি হবে এই ভেবে নিরব হয়ে থাকে। মন যতই খোঁচায়, দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়, প্রশ্ন করার জন্য। অনেক প্রশ্ন করেও কেউ ওর মুখ দিয়ে টু শব্দটি বের করতে পারেনা। কঠিন ভাবে দুই ঠোঁটে আগল দিয়ে রাখে একটি শব্দও যেন বের না হয় সে জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ১২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




