যাযাবর, পথ সাথী করে চলা চলতেই থাকা........ এই মজা ভ্রমণ পিয়াসীই বুঝতে পারে। আমার খুব পথ চলতে এবং চলতে চলতে অজানায় হারাতে ভালোলাগে...........খুব ছোটোবেলায় যখন সৈয়দ মুজতবা আলীর,দেশেবিদেশে পড়েছিলাম, কাবুলের উঁচু নিচু এবরো থেবরো সেই গীরীখাদ ধরে হারিয়ে যেতাম। যেখানে বাস থেমে যেত একপাল ভেড়ার জন্য।
কেউ সামনে যেতে পারছে না। কেউ পিছাতে পারছে না। গড়িয়ে গেলে প্রপাত ধরনীতল পাহাড়ের উপর থেকে। সে এক ভয়ের শিহরণ শিড়দাঁড়ায়। খাড়াই রুক্ষ পাহাড়ের ভয়াবহ সে চিত্র মনের মাঝে এঁকে নিয়েছিলাম সেই শিশু বয়েসে। খুব ইচ্ছে করে গীরিখাদের পথ বেয়ে হেঁটে বেড়াই। সেই বাসে চড়ে ভেড়ার পালের সামনে বা উটের কাফেলার মুখোমুখি হয়ে অভিজ্ঞতাটা অর্জন করি বাস্তবে। একদিন সে জন্য যাবো সেখানে। যদিও রুক্ষতা আরো বেশী বেড়েছে বোমা, গুলি আর রক্তে হাড় মাংসের ছড়াছড়িতে। ঐতিহ্য হয়েছে বিলীন। তবু দেখতে যাবো ব্যাবিলনের ধ্বংস স্তুপে ঝুলন্ত উদ্যান।
তরুন বয়সে একজনের সাথে দেখা হলে জেনে ছিলাম, তিনি ইউরোপ থেকে আফগানিস্থান হয়ে ভারত ক্রশ করে বাংলাদেশে এসেছেন গাড়ি চালিয়ে। সে সময় থেকে গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন ভূখন্ড দেশবিদেশ পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন মনের মধ্যে গেঁথে গেল। সুযোগ পেলেই গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পরতাম যেদিকে দু চোখ যায়.........
আরিচার খাখা বালুচরে এক দুপুর ঝকঝকে রোদের সাথে বা চা বাগানের ঘোর প্যাঁচ ওয়ালা খাড়াই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে, সবুজ গায়ে মেখে, ছুটতে খুব ভালোলাগত। যমুনা সেতুর উপর মাঝ রাতে চুপ করে বসে, আকাশ, নদীর আলোর মিশে যাওয়া খেলা দেখা। গাজীপুর ,মধুপুরের লালমাটির বন। সাভারে সদ্য গড়ে উঠা বনান্তের মায়ায় হারাতে হারাতে নিজের মনে হারিয়ে যেতাম অলিক পৃথিবীতে। কিন্তু বাস্তবতা বড় রুঢ়।
ট্রাক গুলো অকারণ স্পিড বাড়িয়ে দিত পিছনে প্যেঁ প্যেঁ করত। ড্রাইভিং সিটে আমাকে দেখে তাদের ইগোতে বড় আঘাত লাগত। এটা কালচার, স্বভাবজাত বেড়ে উঠা, মানুষ না ভেবে "মাইয়া মানুষ" ভাবা। এক নারী গাড়ি চালিয়ে তাদের সামনে দিয়ে চলে যাবে তা হবে না কিছুতেই। তাকে পিছনে ফেলে সামনে যেতে হবে।
তাদের পিছনে ফেলার অদ্ভুত তাড়না জেগে উঠত। এসব পুরুষের, ভাবনায় কুলিয়ে উঠে না অনেক নারী তাদের চেয়ে দক্ষতায় অনেক কাজ করতে পারদর্শী। তারা তাদেরকে নিচু ভাবতেই অভ্যস্ত।
আমার নিজের অনেক আনন্দময় সময়, নিরানন্দ করে দিত যখন চুপচাপ থেমে থাকা গাড়ি দেখে, দৌড়ে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরত গ্রামের মানুষ। ব্যস্ত হতো কি অসুবিধা জানতে চেয়ে। বিষ্মত চোখ বিস্ফোরিত হতো একা আমাকে গাড়িতে দেখে। সবাই চলে গেলেও কিছু কৌতুহলি, আসপাশ থেকে সরত না।
হুট হরে র্স্টাট দিয়ে এগিয়ে যেতে হতো স্বপ্নময় সবুজ বা সূর্যাস্তের মায়া ছেড়ে, তাদের আরো অবাক চোখের সামনে দিয়ে। একবার গাড়ি চালাচ্ছিলাম গাইবান্ধায়। মানুষ সরতে গিয়ে রাস্তার উপর থেমে যাচ্ছিল বিস্ফোরিত চোখে আমাকে চালাতে দেখে।
জীবনে এরা কখনো রমণীর হাতে স্টিয়ারিং দেখেনি।
সেবার আরো মজা হয়েছিল, আমার যাত্রীরা ভুতের চেহারার মুখোশ লাগিয়ে বসে ছিল আমার পাশে, পরিমরি করে সে কি দৌড় ভুতের গাড়ি দেখে। অকারণ নারীদের এই সব হয়রানির সম্মুখিন হতে হয়।
এন জিও মেয়েরা মোটর সাইকেল চালিয়ে গ্রামের মহিলাদের সচেতনতন করার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ফোতোয়ার সম্মুখিন হয়েছে।
তবে সময় মনে হয় বেশ পালটেছে এখন। নীলফামারিতে দেখলাম ঝাক বেঁধে মেয়েরা সাইকেলে চড়ে যাচ্ছে রাস্তায়। এ সব অনভ্যস্ত চোখে মনে নতুন কিছু প্রলেপ দিয়ে জাগাতে হবে মেয়েরাই পারবে। নিজেদের এগিয়ে নিয়ে তাদের ভাবনা ভেঙ্গে দিতে। যেমন এক সময় মেয়েরা চাষ করতে শুরু করেছিল।
এই চলাচল এই হারিয়ে যাওয়া চোখের উপর চোখ রেখে মনের ভিতর দেখতে পাওয়া এই চলছে যাযাবর জীবনে।
শীত শীত গ্রীষ্ম পেরিয়ে শরতে প্রাতে বেশ সুন্দর ঝকঝকে দিন উস্ণতার ডানা মেলে উড়ছে কদিন ধরে। এমন দিনগুলো উন্মাদনা নিয়ে ডাকে আমাকে আয় আয়। তাই নেমে ছিলাম পথকে সাথী করে যে দিকে দুচোখ যায় চলে যেতে।
দুপাশে ভুট্টার ক্ষেত। সরিষা আর ক্যানলার হলুদ বরণ মাঠ নির্জনতায় বাতাসের গান শুনে নাচছিল আনন্দে। আমিও তাদের সাথে মাতাল হতে গিয়ে চোখে পরল কালো বরণ দুটো বেশ বড়সর পাখি রাস্তার উপর আয়েসে বসে আছে। তাদের উপর দিয়ে না যাওয়ার জন্য গতি ধীর করলাম।
রাস্তা ছেড়ে তারা লুকিয়ে পরল ভুট্টার ক্ষেতে। কিন্তু এ পারে রয়ে গেল বেশ কটি ছানা।এক পারে মা অন্য পারে ছানা আর মাঝে আমি।। করুণ চোখে মা ছানাকে দেখছে ছানারা মা কে ডাকছে ভয়ার্থ স্বরে তাদের তাক করে দুটো ক্লিক করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভালো হলো না তারা ছিল।বনতিতির।

ওদের নিজের মতন থাকতে দিয়ে আমি চলতে লাগলাম আমার মতন।
যাই যেতে যেতে আরও কত কিছুর সাথে দেখা হবে। ভাবতে না ভাবতে মায়া হরিণী লাফ দিয়ে ঘাসের বন থেকে বেরিয়ে আমার সামনে। এক ঝলক দৃষ্টি বিনিময় করে চোখের চাহুনিতে আমাকে ঘায়েল করে হরিয়ে গেল মরীচিকার মতন।
খালী রাস্তা পেলেও শাইশাই করে ছোটার উপায় নাই। কখন কার সাথে দেখা হয়ে যাবে তার জন্য সময় রেখেই চলতে হয়। ধীর গতিতে কচ্ছপ পেরুবে রাস্তা,কচ্ছপ গতিতে তার জন্য থেমে থাকতে হবে এটা আইন। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে উড়বে ঢেউ তুলে মাথার উপর, তাদের দেখব মন প্রাণ দিয়ে। মাঝে মাঝে হলুদ বেগুনি ফুলের মাঠ ডাকবে আয় আয়, ভিতরে না ঢুকতে পারি চেয়ে চেয়ে দেখব তাদের সাথে সময় ব্যয় করতে হবে খানিক ভালোবাসায়।

তাড়া কিসের । পথ চলার আনন্দ চলি পথে আপনমনে..........

ছবিগুলো আমার তোলা। কাত হয়ে গেল কেন বুঝলাম না
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




