অন্ধকার তখনও ডানা ছড়িয়ে আছে। আশ্বিনের শীত ভোর শান্ত সতেজ। কাঠের দোতলা বাড়িতে বাচ্চা মেয়েটার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘরের ভিতর মিশমিশে অন্ধকার। চারপাশে দেখে ঘরের অন্যপাশে সাদা ভুতের আভাস দেখে ভয় পেতে পেতে সামলে নেয়। দাদী জায়নামাজে। দাদীর সাদা কাপড়ের উঠা বসা পরখ করতে করতে উঠে বসে বিছানায়। দরজা ঠেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ায়। বটগাছের পাখিগুলো তখনও চোখ মেলেনি। কত রঙের পাখি সারাদিন ভর নেচে বেড়াবে গাছটা জুড়ে।
হালকা কুয়াশায় ঢাকা পাতা নড়ছে ঝিরিঝিরি। শীতের কাঁপন লাগে। শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠে। তবু ধূঁয়া ধূঁয়া পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে । নিচে সবুজ অঙ্গিনার প্রতিটি ঘাষের মাথায় একটি হীরের কণা।দূরে সরকারি পুকুরের পানি থেকে ধূঁয়া উড়ছে। তারও পরে গাছগুলো সবুজে জড়াজড়ি করে মিশে আছে ধূষর পৃথিবীর সাথে। স্কুলের লাল চালের আভাস দেখা যায় তার ফাঁকে।
দূরে পাহাড়টাকে খুঁজে মেয়েটা। কুয়াশা ঘিরে আছে সব । দৃষ্টির সামনে সব সাদা হয়ে আছে দূরের পৃথিবী।
ঘরে ঢুকে সোয়েটার পরে ছোট ঝুড়ি হাতে নিয়ে, তরতর করে নেমে যায় সিঁড়ি বয়ে নিচে। পেছনের উঠান পেরুলে পুরোটা জায়গা গাছের বন। পশ্চিমদিকে জায়গায় এত গাছ পাতায় পাতায় হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের বন ওর মনে ভয় ধরায়। কত রকমের ফল আর নাম নাজানা গাছ। উঠোন পেরুলে দুপাশের গাছের সারির মাঝ দিয়ে হাঁটাপথ পুকুরে গিয়ে থেমেছে।
বামপাশে বিশাল একটা মাচায় সীমফুলের বেগুনি ফুলগুলো কেবল রঙ ধরতে শুরু করেছে। সীমপাতা পেরে হাতের উপর রেখে পটকা ফুটানোর খেলা শুরু হবে আরো পরে। যখন বন্ধুরা সব জেগে উঠবে। পূজার ছুটির সময় শুধুই খেলা। আর ঢাকের শব্দে নাচা। মাইকে যখন গান বাজবে, পূজার প্যান্ডেল থেকে, বুকের ভিতর কেমন যেন হুলুস্থুল হবে। এক একটা প্যান্ডেল থেকে এক এক রকম গান, সব গান সব সুর এক সাথে ভালোলাগা দিবে। দিদিরা সব এক সাথে খুশি খুশি মনে ঘুরে বেড়াবে। হাসি হাসি মুখে কথা বলবে। কাছে ডেকে আদর করে হাতে প্রসাদ তুলে দিবে। দূর্গা প্রতিমার সামনে পুরোহিত আর কত রকমের জিনিস সাজানো। মন্ত্র হচ্ছে। ধূপের গন্ধ। সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরে ছেলেরাও সব বাবু হয়ে খুশি মনে ঘুরে। পুজার সব কটা দিন ধরে শহর জুড়ে কেমন ব্যাস্ততা খুশি খুশি ভাব। । বিকালে মাসিমারা দল বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি পরে মন্ডপে যাবে। সবার সিঁথি আর কপালের সিঁদুর যেন বেশী বেশী লাল হয়ে যায় এই কদিন।
বাড়িতে বাড়তি সব খাবার আসতেই থাকে এ কদিন।
এখন ভোরবেলা কেউ জাগেনি।
উঠানের এককোনে শিউলিগাছটা ডাকছে ওকে। গাছেরতল ফুলের বিছানা। সাদা পাপড়ি, কমলা বোটার রঙ নিয়ে ফুলগুলো অপেক্ষায় করছে ওর হাতের ছোঁয়া পাওয়ার। মেয়েটা বারান্দায় খানিক দাঁড়িয়ে গুটিগুটি পায়ে নেমে এলো উঠানে। ঝরকা কাটা মাচার পাশ ঘেষে এগিয়ে গেল জলপাই, আমড়া কাঠাল গাছটার পাশেই ছোট শিউলিফুলের গাছ ডালপালা মেলে ছাতার মতন দাঁড়িয়ে আছে। ছোট ছোট হাতে কুড়াতে লাগল ঝরে পরা সব ফুল। ঝুড়ি উপচে উঠেছে গাছে তখনও অনেক ফুল। টুপ করে শিশির বিন্দু, ঝরে ভিজিয়ে দিচ্ছে চুল। শিউলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে উঠছে শরীর। মেহদি রঙের মতন রাঙা হয়ে গেছে আঙ্গুল।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ৮:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




