যখন রাস্তায় নামলাম তখন জিপিএস দেখালো স্বল্প সময়ের রাস্তায় রেড লেইকের ফায়ার এ্যাফেক্ট, করতে পারে ।
জানতাম পশ্চিমের প্রদেশগুলো পুড়ছে অনেকদিন। গ্রীষ্মকালীন সময়ে এই এক সমস্যা । আগুন লেগে যায় বনান্ঞ্চলে। কিন্তু আমার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে কেন সেই আগুন মাথায় কাজ করল না। আমি তো অনেক দূরে সেখান থেকে।
আরো তিনটা রাস্তার চয়েস ছিল সেখান থেকে একটা বেছে নিলাম। কদিন আগে দেখেছিলাম, একটা রাস্তায় আগুন জ্বলছে। সামনে দেখা যাওয়া গন্তবের পথ থেকে পুলিশ ঘুরিয়ে পাঠিয়ে দিল অন্যদিকে। কখনো অন্যপথ ভালোলাগা নিয়ে আসে। আর আমার জন্য তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা নতুনকে দেখতে পাওয়া। দারুণ এক পথে চলে গেলাম। এত কাছে থেকেও যেখানে আগে কখনো যাওয়া হয়নি।
এখন যেতে একটু বেশি সময় লাগবে তবে কোন বাঁধা নেই। এখন সময় নেই কিছু ঘেটে দেখার এ্যাপয়নমেন্টে পৌঁছানোর জন্য,মাপা সময় আছে।
দুটো রাস্তা বড় আনন্দে একা একা পার হলাম। বায়ে ঘুরে পরের রাস্তায় উঠতেই দেখলাম বিশাল শরীর একটা ট্রাক সামনে। অল্প সময়ে তার কাছে পৌঁছে গেলাম তারপর টানা পঁচিশ ত্রিশ কিলোমিটার তার পিছনে গতি নিয়ন্ত্রন করে চলতে হলো।
যতবার একটু ফাঁকা দেখে এবং রাস্তার সাইন তাকে ক্রশ করে যাওয়ার পারমিট দেয় ততবার ঠিক সেই সময়ে উল্টো পথে গাড়ি আসছে। অথবা রাস্তাটা এমন উঁচু নিচু সামনে, কতটা দূরে উল্টা পাশের গাড়ি আসছে দেখার সুযোগ নেই। যখন ভালো করে দেখতে পেলাম ততক্ষনে সাইন নেই অথবা গাড়ি আসছে। দু তিনবার এটেম নিয়ে ওর পিছনে পিছনেই যাওয়া মনস্ত করলাম।
রাস্তা এমন ফাঁকা থাকে নিয়ম বর্হিভূত রাস্তা ক্রশ করলে কেউ দেখার নাই।
তবে নিয়মটা মানাই অভ্যাস হয়ে গেছে। একদম ফাঁকা চাররাস্তার স্টপেজে না থেমে চলে যাওয়া যায় কিন্ত নিজের অজান্তেই নিয়ম থামিয়ে দেয় তিন সেকেণ্ড অপেক্ষা করে,যদিও জানি কেউ নেই তবু ডানে বামে দেখে তারপর রওনা হই। এবং এই নিয়ম মানার জন্য নিজের ভিতর ভালোলাগা তৈরি হয়।
মাঝে মাঝে আজকাল দু একটা গাড়ির চালককে দেখি নিয়ম না মেনে চলতে বরং আপনি ফাঁকা রাস্তায় তিন সেকেণ্ড থামলে তাদের অসুবিধা হয়। কিছুদিন আগে এমন চৌরাস্তায় আমার সামনের গাড়ি শাই করে পার হয়ে গেল না থেমে। আর বাম পাশ থেকে বেশ দূরে থাকা পুলিশের গাড়িটা ওর পিছু নিয়ে ক্যাক করে ঘাড়টা ধরল।
একদিন শহরের বেশ বড় একটা রাস্তায় আমি সবার সামনে অনেকক্ষন রেড লাইটে দাঁড়িয়ে আছি। বিশাল লম্বা সময় নিচেছ লইট সবুজ হতে। প্রথমে আমি একাই ছিলাম পরে বেশ কটা গাড়ি আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক পিছনের গাড়িটা হর্ণ দিতে শুরু করল আমাকে। আমি বুঝলাম না, সে কেন এই অসভ্য আচরণ করছে। আমি তো নিয়ম বর্হিভূত কিছু করি নাই, তই চুপচাপ বসে থাকলাম। ভুল করলে অনেক সময় পিছন থেকে হর্ণ দিয়ে সর্তক করে। এখানে হর্ণ দেওয়াটা অভদ্রতা। যেহেতু আমি নিয়মে আছি তাই গা করলাম না।
তিনচারবার হর্ণ দিয়ে আমার নড়াচড়া না দেখে সে আমাকে কাটিয়ে লাল বাতির মধ্যেই লেফট নিয়ে চলে গেল। যা খুবই ডেঞ্চারাস। একজন ইণ্ডিয়ান অথবা শ্রীলঙ্কান মহিলা ছিল চালক। সে ধরা পরেনি সে দিন তবে আমি জানি, এই অভদ্র আচরণ আর নিয়ম ভাঙ্গার ফল সে একদিন ঠিক হাতে নাতে পাবে।
ইন্ডিয়ান এক ড্রাইভার সাসকাচুয়ানের একটি স্কুল বাস চালাচ্ছিল। হকি প্লেয়ারদের খেলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সাসকাচুয়ানের দীর্ঘ ক্ষেতি জমির জায়গা গুলো যারা পার হয়েছেন তারা জানবেন দীর্ঘ রাস্তা একাই গ্রামের রাস্তায় চলতে কেমন লাগে। কিন্তু নিয়ম মতন যে সব জায়গায় এক্সপার্টরা অনেক মাপজোখ মাথা ঘামিয়ে, স্টপ সাইন বা অন্য গাড়িকে ক্রস না করার নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন। সে সব অনেক সাবধানতার সাথে মানতে হয়। জুনিয়র হকিদলের স্কুল টিমের খেলোয়ারদের পনেরজন স্পট ডেড হয়ে যায় । এবং তেরজন পঙ্গু জীবনের বোঝা বয়ে বেঁচে আছে। শুধু চালকের আদেশ অমান্য করে চলার কারণে।
চারবার স্টপ সাইনে না থেমে চলে পরের বার ঠিক ধাক্কা খায় অন্যপাশ থেকে আসা গাড়ির সাথে। যেখানে তাকে থামতে হতো অন্য গাড়ির যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া। একটু সময় ব্যয় করে জীবন বাঁচানো যায় কিন্তু জীবন চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া যায় না।
তেরটি ফুটফুটে সুস্থ বাচ্চা আজীবন কত কষ্টের জীবন কাটাবে এই বেখেয়ালি চালকের জন্য। আর পনেরটি পরিবার থেকে যে বাচ্চা গুলো চলে গেল যাদের উজ্জ্বল জীবন ছিল সামনে, সে পরিবার কখনো শান্তি পাবে না আর পরিবারের সদস্য হারিয়ে।
চালকের রেসিডেন্সি বাতিল হয়েছে এবং তাকে ত্রিশ বছরের কারাগার জীবন পার করে ফিরে যেতে হবে ইণ্ডিয়ায়। বিচারক এমনই রায় দিয়েছেন নিয়ম অমান্যকারী চালকের জন্য। এবং যে আসলে হত্যাকারী এতগুলো জীবনের।
প্রসঙ্গ ক্রমে এসে গেলো গাড়ি চালানোর সতর্কতার কথা যা আমাদের দেশে কেউ মানি না। পঁচিশ হাজার ড্রাইভার জোড়ে চালানো টিকেট খেয়েছে গত বছরের করােনা লক ডাউনের সময়। অনেকের ড্রাইভার লাইসেন্স বাতিল হয়ে গেছে ফাইনের সাথে।
আসলে কিছু ভয়ানক রকমের স্পিডি গাড়ির সাথে দেখা হয়েছে বেশ কয়েকবার গত বছর রাস্তায় আমারও। এরা যেন ফাঁকা রাস্তাকে রেসের ফিল্ড মনে করে চলত।
কিছু জায়গা আছে এমন ঢালুতে নামতে হয় তারপরই শহর, সেখানে চট করে পঞ্চাস, চল্লিশে নেমে যেতে হয় নয়তো নিচে বসে থাকা পুলিশ খপ করে ধরে জোড়ে যাওয়ার আনন্দের বারোটা বাজিয়ে দেয়।
চলার পথের রাস্তাটা বড় মনোরম কোথাও দুপাশে উঁচু পাহাড়, তো কোথাও মনে হয় খোলা সবুজ ক্ষেতের বাংলাদেশ। কোথাও বনতল ফুলে ফুলে সেজে আছে। কত রকমের ফূল পথের ধারে আপন মনে হাসছে।
সাজানো বাড়িগুলো পাশে পাশে। মহিলারা ঘাসকাটার ট্রাকটারে চড়ে উঠানের ঘাস কাটছেন। কি সুন্দর ঘাসের সবুজ গালিচা হয়ে যাচ্ছে জঙ্গল সাফ হয়ে। এই মহিলারা হয় তো বড় বড় কর্পোরেট অফিসের কর্মকর্তা, বিজন্যাসম্যান। এখানে সবাই নিজের বাড়ির কাজ নিজে করেন। বিশাল ক্ষেতে যব বা ভুট্টা, ক্যানলা বা ঘাসকাটা, নারীরা একাই হালচাষ থেকে ফসল তোল পর্যন্ত করে ফেলেন। সাথে হাসি মুখে পরিচ্ছন্ন টিপটপ রাখেন বাড়িঘর আসপাশ। কেয়ার করেন বাড়ির সদস্যদের।
আমাকে যেতে হবে দূরে বেশ দূরে প্রায় আশি কিলোমিটার। সময় একঘণ্টা এবং এক ঘণ্টার মধেই পৌঁছে গেলাম। মোটা ট্রাকের পিছনে আস্তে চলেও। কি সুন্দর ব্যবস্থা তাই না।
আমি যাচ্ছিলাম আমার দ্বিতীয় ভ্যাকসিন নিতে। প্রথমেই একজন এগিয়ে এসে ফ্রি পার্কিং করার জায়গা দেখিয়ে দিলেন।
যেখানে গেলাম, সেই কেন্দ্র একটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্তর। বাচ্চারা ভ্যালায়ান্টিয়ার। ধাপে ধাপে তারা অপেক্ষা করছে নির্দেশ দেওয়ার জন্য। কোন দিকে যেতে হবে থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যে কোন সিন্টম নেই থেকে, দেশের বাইরে কোথাও যাইনি সব জেনে পরবর্তি ধাপে পাঠালেন। তারা ঢুকার মুখে সব প্রযোজনীয় প্রশ্ন করে আমি কতটা নিরাপদ ভিতরে যাওয়ার জন্য সে বিষয়ে জেনে আরেক জনের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এবং সেখানে নাম এবং কার্ড জন্ম তারিখ দিয়ে আমাকে যাচাই করে লাইনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কোন ভ্যাকসিন আমার জন্য অপেক্ষা করছে তাও জানালেন। এবং হাত পরিচ্ছন্ন করে নিজের মাস্ক ফেলে পরিচ্ছন্ন নতুন মাস্ক পরে নিতে হচ্ছে এবং আবারো হ্যাণ্ড সেনেটাইজার করতে হচ্ছে। একজন মানুষ ভ্যাকসিন নিয়ে উঠে গেলে একজন চেয়ারটা মুছে স্যানেটাইজ করছেন।
ঠিক ত্রিশ মিনিট অপেক্ষার পালা, শেষ হলেও একজন চেয়ার গুলো মুছে আরেক জনের বসার উপযোগী করছেন । প্রথম ভ্যাকসিনের চেয়ে এবার অনেক ছোট জায়গা। বোঝা গেল সংখ্যা কমে আসছে, ভ্যাকসিন না নেওয়া মানুষের। প্রতিযোগীতা করে ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে ক্লিনিক গুলোতে। একজন আরেক জনের রেকর্ড ভাঙ্গার চেষ্টা করছে। কে কত ভ্যাকসিন একদিনে দিতে পারেন। কিছু ক্লিনিক রাত দিন চব্বিস ঘণ্টা ভ্যাকসিন দিচ্ছে।
অল্প বয়সীরা এখন অনেক বেশি লাইনে। তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায় তাই সুরক্ষা কবজ ভ্যাকসিন নিয়ে নিচ্ছে। আবার এত সুবিধার পর কিছু মানুষ এখনো বিশ্বাস করে না ভ্যাকসিন তাদের বাঁচাতে পারে।
আমি আরো আগে নিতে পারতাম তবে অন্য মানুষদের নিতে সুবিধা দিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম যেহেতু আমার জায়গাটা অনেক মানুষের ভীড় নেই হটস্পট না। কত মানুষকে ঠেলাঠেলি করে বাসে চলতে হয় কাজে যেতে হয়।
আবার কিছু বাংলাদেশির খবর জানলাম তারা দেশে দুটো ভ্যাকসিন নিয়ে এসে এখানে আরো দুটো নিয়ে নিজেদের সুরক্ষা করছেন।
অথচ বাংলাদেশে অনেক মানুষ ভ্যাকসিন চেয়েও পাচ্ছে না।
একটা অভিজ্ঞতা এত ভালো লাগল। এখন যে কোন দোকানপাট বা অফিসে গেলে হ্যাণ্ড স্যানেটাইজ করে ঢুকতে হয় দরজায় রাখা তাদের বোতল থেকে তরল নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে হ্যাণ্ড সেনেটাইজার হাতে দয়ার সাথে সাথে হাতের চমড়ায় তার ভয়াবহ রকম বাজে প্রতিফলন দেখা যায়। শুষ্ক হয়ে যায় চামড়া। বা স্কিন উঠে আসে এমন মনে হয়। অনেক সময় জ্বালা পোড়াও করে। কিন্তু এখানে সরকারের দেয়া মাস্ক পরে যেমন হালকা আরাম এবং এবং নিঃশ্বাসের সুবিধা পেলাম তেমনি হ্যাণ্ড সেনেটাইজার ব্যবহার করেও মনে হলো চমড়া যেন মোলায়েম হয়ে গেছে।
সরকারী কাজে কোন ফাঁকি নাই। দেশে শুনলাম অনেক ক্লিনিকে হ্যাণ্ড সেনেটাইজারের জন্য দাম নেয় আস্ত বোতলের । অথচ আপনি হয়ত একবার কি দুবার মাত্র ব্যবহার করেছেন। জনগনের গলা কাটার কি সুন্দর ব্যবস্থা!
এখন অনেক বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশের মানুষের ভ্যাকসিন নিয়ে নেয়া। শুনেছি ভ্যাকসিন দুটো নিয়েও অনেকে অসুস্থ হচ্ছেন । জীবন অবসানও হচ্ছে। কারণ ভ্যাকসিন নিলেই আপনি সুরক্ষিত নন শত ভাগ। মাক্স এবং পরিচ্ছন্নতা জরুরী। মুখে হাত দিবেন না কেউ ভুল করেও প্লিজ। এই অভ্যাসটা নিজের স্বার্থে চালু রাখেন।
বিজ্ঞানই এক মাত্র রক্ষা করতে পারে এই মহামারী থেকে বিজ্ঞানীদের নির্দেশনাগুলো মেনে চলুন।
আমার মন পরে আছে বাংলাদেশে কিন্তু এখন যে ভাবে বাড়ছে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট দেশের সবার জন্য মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তারপরও আশা করি এই মহামারী কাল শেষ আমরা করবই। ফিরব হাসিখুশি স্বাভাবিক জীবনে।
ভ্যাকসিন নিয়ে অনেকটা সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজানো বাগানে বসে ছিলাম। কত অদ্ভুত ধরনের গাছ ফুলে ফুলে সুন্দর করে রাখা। একা বসে থাকতেও ভালোলাগল। তারপর ফিরে এলাম অন্য একটা পথ ধরে।
নাহ রেড লেইকের কোন বাঁধা আমার পথে পরেনি। তবে বনাঞ্চল পুড়ছে যা মন খারাপ করে দেয়। নিশ্চয়ই কোন অসর্তক মানুষের ফেলে দেয়া আগুন ছড়িয়ে গেছে বিশাল ভূমি ব্যাপী। পুড়ছে গাছ।
একটা নদী আছে পথে আঁকাবাঁকা যেন আমাদের ছোট নদী, চলে বাঁকে বাঁকে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টি শেষে টইটুম্বর হয়ে আছে নদী জলে। অনেকে মাছ ধরছেন সেই জলে।
প্রচুর রোদের আলো ছিল আমি বেশ খানিকটা সময় ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখলাম। এখন বাড়ি ফেরার জন্য আমার কোন তাগদা নেই।
সব কাজ গুছিয়ে রেখেছি। বাড়ি গিয়ে গোসল দিয়ে খেয়ে শুধু আরাম করব তিনচারদিন, রি এ্যাকশন যদি হয় বিছানায় শুয়ে কাটিয়ে দিতে পারব। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম দিয়ে খাবো আর লিখব, পড়ব।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০২১ রাত ৩:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




