somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রোকসানা লেইস
স্রোতের অজানা টানে সমুদ্র বালিয়াড়ি বেয়ে বোহেমিয়ান- গৃহকোন, জীবন যাপন ফেলে চলে যায়। তুমি দুহাত বাড়িয়ে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাও জোছনা গলে হারিয়ে যায় সুখ । আছড়ে পরা ঘূর্ণিজল মনে বাজায় অচেনা সবুজ দিগন্ত ..

দেহ ঘড়ির প্রাণ পাখি থেমে গেলো

২৪ শে জুলাই, ২০২১ সকাল ৭:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সেদিন শহরে যাচ্ছিলাম সারা পথ শুনছিলাম গান ব্লুটুথে। এখন গাড়িতে আর ক্যাসেট বা সিডি প্লেয়ার নেই। মোবাইলে সব সংযোগ। মোবাইলে গান দিলাম ব্লুটুথ বেয়ে স্পিকারে গম গম করে বাজছিল পছন্দের গান। যে ধরনের গান বাজাই তা থেকে একটা অটো প্লে লিষ্ট হয়ে আছে আমার।
নিজের পছন্দের গানের সাথে অনেক সময় অন্য অনেক গান যোগ হয়ে বাজতে থাকে । যত লম্বা হয় আমার চলা। গানও চলে তার সাথে। গাড়ি চালানো সময় অনেক সময় গান আর বদল করা হয় না। ভালোই লাগে আমার অনেক সময় অজানা গান আসে অনেক সময় আসে অনেকদিন না শোনা পুড়ানো স্মৃতিময় গান।
সেদিন আমার পছন্দের কয়েকটা গান শেষ হওয়ার পর বেজে উঠল সুমন কবিরের, খোদার কসম জান আমি ভালোবেসেছি তোমায়। এরপর এ তুমি কেমন তুমি। তারপর বেজে উঠল। ঘর করলাম নারে আমি সংসার করলাম না।
কি দারুণ কথা দারুণ গান। আহমদ ছফা খুব রাগ হয়েছিলেন নিজের সুরে তার লেখা গানটি ফকির আলমগীর করেন নাই বলে। বেশি মাত্তব্বরী করে নিজের মতন সুর দিয়েছে ফকির।
কিন্তু ফকির আলমগীর কথাগুলোকে সুর দিয়ে যাদুকরী একটা অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন। যেদিন প্রথম বিটিভিতে দেখেছিলাম এবং শুনেছিলাম সে গান তখন থেকে সে গান হৃদয়ে গেঁথে আছে।কথা শিল্পী আর গায়ক ছিলেন দূরের মানুষ। এরপর আরো অনেক গান বাজল আমার চলার পথ জুড়ে। অনেক গুলো গান শুনলাম ফকির আলমগীরের সেদিন আর ঘরে গিয়ে অনলাইনে খবর দেখে চমকে গেলাম ফকির আলমগীর আইসি ইঊএ ভর্তি। গানের মানুষের শ্বাস কামড়ে ধরেছে করোনা।
এ এক ভয়ানক কষ্ট। এ কি ট্যালিপ্যাথি আজই উনার গান বেজে চলছিল আমার ব্লুটুথে।
ভেবেছিলাম তিনি সে কষ্ট অতিক্রম করে চলে আসবেন, আইসিইউর বাইরে অথচ আশা নিরাশা হয়ে গেলো। পারলেন না জয়ি হতে শিল্পী ফকির আলমগীর। চলে গেলেন অন্যলোকে। কত স্মৃতি মনে পরে যাচ্ছে। ভালো থাকবেন ভাইডি আমার অন্যলোকে।
অতি সাধারন মানুষের মাটির কাছের গান গেয়ে জনগণের অনেক কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন ফকির আলমগীর। শ্রমজীবি মানুষ প্রিয়াকে রেখে যারা, দূরে অবস্থান করছেন তাদের হৃদয় আকুল করে তিনি গেয়ে উঠলেন ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে। কি হৃদয় বিদারক অনুভুতির প্রকাশ। যেমন প্রেম তেমন কান্না ছড়ানো গান কষ্ট আর বাস্তবতার অনুভূতি।
তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আমার বন্ধু খুব গান নিয়ে ব্যাস্ত সে সময়। ছায়ানটে যায় গান শিখতে সানজিদা খাতুন, ওয়াহেদুল হক এর প্রিয় ছাত্রী। আমি গানের ক্লাসে না গেলেও ওর শিক্ষকরাও আমার প্রিয় মানুষ হয়ে যান, গল্প শুনে। তাছাড়া উনাদের গান তো জানাই ছিল।
ছায়ানটের সাথে এখন সে শিল্পকলায়ও ভর্তি হয়েছে আরো কোর্ষ করার জন্য। আলিমুজ্জামন তখন মিউজিক ডিরেক্টর শিল্পকলা একাডেমীর সংগীত পরিচালক। বন্ধুটি উনারও প্রিয় ছাত্রী। ছুটির দিনে ওর গানের ক্লাসে অনেক দিনই আমিও সঙ্গী হই। সেদিন এমনি এক দুুপুরে আমরা গেলাম শিল্পকলা একাডেমিতে। সেদিন ওর কিছু কাজ ছিল দুপুরে শিল্পকলা একাডেমিতে। আমরা দুজন গেলাম।
কাজ শেষে বেরিয়ে আসার পথে আলিমুজ্জামানের সাথে দেখা। গল্প করতে করতে আমরা গেইটে পৌঁছালাম। সবাই বাড়ি ফিরছি। তখন উল্টা দিক থেকে ঢুকছেন ফিরোজ সাঁই আর ফকির আলমগীর। সে সময়ের দুজন নামকরা শিল্পী।
সেখানে দাঁড়িয়ে পরিচয় পর্ব সারা হলো। তাদেরকে তো আমরা চিনি কিন্তু তারা চিনলেন আমাদের। আর তারপর শুরু হলো কথার দীর্ঘ মিছিল। তারা জরুরী প্রয়োজনে আলিমুজ্জামানের সাথে দেখা করতেই আসছিলেন। এই কথা সেই কথা। হাসাহাসি। দুপুর রোদের সময় কখন ঢলে গেছে পশ্চিমে। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে কত কথা। কত প্রয়োজনীয়, জরুরী সিদ্ধান্ত থেকে অকারণ হাসাহাসি। সঙ্গীত জগতের তিন তারকার মাঝখানে থেকে বেশ কিছু অন্যরকম বিষয় জানা হলো। এরপর বেড়াতে আসলেন ফকির আলমগীর আমার বন্ধুর বাসায়। সেদিনও আমরা অনেক গল্প করলাম।
তারপর বেশ অনেকদিনের দূরত্বও হয়ে গেলো ।
এরপর দেখা হলো চাইনিজ রেস্টুরেন্টে রুদ্র এবং নাসরিনের বিবাহ উত্তর সর্ম্বধনা অনুষ্ঠানে। তখন ফকির আলমগীর বিয়ে করেছেন। সিলেটের জামাই তিনি কমলার মতন সুন্দর রমনীকে বিয়ে করেছেন। সিলেটের জামাই হয়ে দেশের আরেক প্রান্তের সাথে যোগ সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে এ জন্য তিনি খুব খুশি। উনার স্ত্রীকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিলেন। নতুন দম্পত্তির সাথে এক সাথে গ্রুপ ছবি তুললেন আমাকে নিয়ে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম সে ছবির কথা মনে করিয়ে দিলেন অনেকদিন পর যমুনা নদীতে নৌকায় যেতে যেতে। সিরাজগঞ্জ যাচ্ছিলাম এক সাথে। উনার একটা গানের প্রোগ্রাম ছিল সেখানে। আমার মেয়ের সাথে খুব দুষ্টামি করছিলেন। খুনসুঁটি করে ওকে হারানোর চেষ্টা কিন্তু ছোট্ট মেয়ে ভয় নেই উনার সাথে ক্রমাগত কথা বলছে। প্রতি উত্তর দিচ্ছে। বলেছিলেন মেয়েটি অনেক বড় হবে। ছাড়িয়ে যাবে আমাদের সবাইকে। দেখবে ও একদিন পৃথিবী কাঁপাবে। কি সুন্দর প্রার্থনা। ভালো লেগেছিল খুব উনার কথা।
কত স্মৃতি মনে পরে যায়। খুব বলতেন তার বাড়িতে যেতে।
পহেলা বৈশাখে ট্রাকে করে শহরের অনাচে কানাচে, পার্কে মানুষের জন্য গেয়ে বেড়ানোর আয়োজনটা উনিই করেছিলেন উনার দল ঋষিজকে নিয়ে।
কবিতা উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের গানের দ্বায়িত্ব উনার। কতবার উনার নেতৃত্বে গান করেছি মঞ্চে।
একদিন বইমেলায় আমি ঢুকছি, উনার সাথে দেখা আমাকে সাথে নিয়ে চললেন। একটু যেতেই দেখা হলো লুৎফুন নাহার লতার সাথে। লতার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, লতা এই আমার বোন। খুব ভালো কবিতা লিখে।
আমরা তিনজন হাঁটছি এক সাথে আরো মানুষ যোগ হয়ে যাচ্ছে চলতি পথে। আমাদের সাথে।
দেখা হয়েছে বিদেশে কয়েকবার। আমাকে দেখেই ছুটে এসেছেন উনাকে ঘিরে থাকা ভিড় ঠেলে। আরে বোনডি আমার, তুমি এখানে। তাই তো বলি দেশে তোমারে দেখি না কেন?। খুব দ্রুত কথা বলতেন। একজন মানুষকে দেখেই সব কথা মনে পড়ে যেত যেন উনার অথবা মানুষটি থাকতেন তার মনে কখনো ভুলে যেতেন না। স্মৃতি শক্তি অনেক প্রখর ছিল উনার। এক নিমিশে সবার খবরা খবর কুশল জিজ্ঞেস করে নিলেন। সেই মেয়েটি কেমন আছে মিষ্টি মেয়েটি। অনেক বড় হবে মেয়েটি দেখো।
এত উঁচু আসনে থাকা একজন মানুষ র্নিদ্বিধায় চলে আসতেন মানুষের কাছে। উনার মতন এমন সহজ ব্যবহার সচরাচর কেউ দেখাতে পারে না। যাকে দেখে মানুষ এগিয়ে যাবে কি না ভাবে তিনি নিজে থেকে কাছে চলে আসেন, তাঁর আন্তরিকতায় আপন করে নেন। তাঁর এই অসাধারন ব্যবহার তাকে আরো উঁচু আসনে বসিয়ে দেয়।
সেবার মান্না দে আর উনি গান করবেন । যখন বসে থাকার কথা মঞ্চে উনার। তখন তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন সবার মাঝে। কথা বলছেন আন্তরিকতায় প্রতিটি মানুষের সাথে মাটির মানুষ তিনি। মানুষের জন্য যেমন গান করেন। তেমন ভালোও বাসেন মানুষকে।
কয়েক বছর আগে দেখা হলো বই মেলায় । সেই শেষ দেখা । মানুষের ভিড় ঠেলে চলে আসলেন আমার কাছে আমাকে দেখেতে পেয়েই।বোনডি কবে আসছো। এখন থাকবে তো দেশে। কত কথা একটার পিছে আরেকটা উনি বলে যেতেন । আর কথা বলবেন না। ভাবতেই মন খারাপ লাগছে। বয়স হয়েছিল চলে যাবনে । কিন্তু করোনার জন্য যেন তাড়াতাড়ি জীবনপাট গুছিয়ে ফেললেন।
এমন একজন আন্তরিক মানুষ আর পাবোনা। শেষ হয়ে গেলো জীবনের একটা পর্ব। ভালো থাকুন অন্যলোকে মানুষের মানুষ, ভাইটি আমার।






সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০২১ সকাল ৭:৪৫
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একাত্তরের আগের আর পরের জামাত এখনও এক

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০২ রা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮


গোলাম পরওয়ার বলেছে একাত্তরের জামাত আর বর্তমান জামাত এক নয়। অথচ এক। স্বাধীনতার আগের জামাত আর পরের জামাত একই রকম।
একাত্তরের আগে জামাত পাকিস্তানের গো% চাটতো এখনও তাই চাটে। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনার ধানে নোনা জল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের শিক্ষা - ১

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ৯:২৬



সমাজ আমাদের বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করে। কখনো ধন-সম্পদ দিয়ে, আবার কখনোবা কপর্দকশূন্যতা দিয়েও! সমাজের এই পরীক্ষায় কেউ জিতেন, আবার কেউবা পুরোপুরি পর্যুদস্ত হয়ে বিদায় নেন এই ধরাধাম থেকে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিষন্ন মেঘের ভেলায় ভেসে....

লিখেছেন ইন্দ্রনীলা, ০২ রা মে, ২০২৬ রাত ১০:২৯



তোমাকে শুধু একটাবার বড় দেখতে ইচ্ছা করে...
এই ইচ্ছায় আমি হয়ে যাই একটা ঘাসফড়িং
কিংবা আসন্ন শীতের লাল ঝরাপাতা,
উড়ে যাই ভেসে যাই দূর থেকে দূরে...
অজানায়...

শরতের কাঁশফুলের পেঁজা তুলো হয়ে
ফুঁড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×