এবারের গ্রীষ্মটা একদমই গ্রীষ্মকালের মতন নয়। মাত্র তিনচারদিন তীব্র গরম উপভোগ করলাম। আর বাকি দিন সেই একই রকম হালকা শীতের আমেজ। দু চারদিন তো আগুন জ্বালাতে হলো উত্তাপ নেয়ার জন্য।
শীতের কোম্ফটার তুলে রেখেছিলাম। দেশি কাঁথা গায়ে বেশ হালকা আরামের ঘুম ঘুমাতে চাইছিলাম। কিন্তু রাতেরবেলা শীতের তীব্রতা বেশ বেড়ে যায়। কদিন কুঁকড়ে যেতে হলো কাঁথার ভিতর। জুনের স্ট্রবেরি পূর্ণিমা চাঁদ আর জুলাইর রোজ ফুলমুন ডুব দিয়ে থাকল মেঘের ভিতর। দেখা হলো না ভালো করে।
মেঘলা শ্রাবণবেলার ভিতর বেলা চলে যাচ্ছে গরমকালের। রাত ভর বৃষ্টি কখনো পিলে চমকানো বজ্রপাত আর বিদ্যুত চমক। পাখিগুলোও ভয়ের চটে ডানা মেলে ছটফট করে উঠে।
মেঘ থমথম আকাশ মেঘের উড়াউড়ি আকাশ জুড়ে তার মাঝে হঠাৎ আলোর ঝিলিক খেলে সূর্যিমামা ছুটি পেয়ে লাফিয়ে আসে পৃথিবীর আঙিনায় খেলা করতে।
তার মাঝেই দেখলাম গাছের পাতায় রঙ লেগেছে এখনই। যেন বয়স বাড়ার আগেই চুলের এক কোনে পাক ধরে যায় অনেকের তেমন লাল টুকটুকে রঙ কিছু পাতায় লেগে গেছে।
বাগানের বারোটা বাজাচ্ছে চিপমাঙ্ক। সকালে উঠেই দেখা হয় তার সাথে প্রতিদিন। টুকটুক করে দৌড়ে বেড়ায়। বাগানের ভিতরে। এই গাছের আগা খাওয়া তো ওগাছের কুড়ি সাফ তার মানে এ বছরে আর ফুলের দেখা পাওয়া যাবে না। আধা খাওয়া লাউ, কুমড়ো, আলু। অনেক মিষ্টি কিছু আম কিনেছিলাম তার থেকে অনেক শখ করে আমের চারা বানালাম। ভাবলাম মাটিতে বুনে দেই গ্রীষ্মের কদিনে বেশ ঝরঝরে হয়ে উঠবে তারপর তুলে রাখব টবে। কিন্তু বাচ্চা গাছের পাত্তাই পাচ্ছিলাম না। খুঁজে খুঁজে পেলাম ঘাসের বনে কুটিপাটি করে ছেঁড়া টুকরা। পাতা আঁটি ডাল খেয়ে ঝরঝরে করে দিয়েছে দুদিনেই সব সাবাড়। এতদিন ধরে যত্নে বড় করা চাড়া আমগাছের।
বছর দুই আগে উড়ে যেতে যেতে এক দঙ্গল রাঁজহাস বেশ কিছু সময় পুকুরে সাঁতার কেটে খেলাধুলা করল। দেখতে ভালোই লাগল। দূরে থেকেই তাদের দেখলাম। কিন্তু পরে গিয়ে দেখি কুঁড়ি উঠে আসা পদ্ম ফুলের গাছের সাড়েবারোটা বাজিয়েছে তারা মহা আনন্দে। ছিঁড়ে কুটি কুটি করে খেয়ে ফেলেছে পাতা থেকে কুড়ি সব। সেবার আর পদ্ম ফোটা দেখার সুযোগ হয়নি।
মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় এই গাছের পিছনে আর সময় ব্যয় করব না। বনে বাঁদারে এত্ত গাছ থাকতে বাগানে কেন হামলে পরে সবাই এসে বুঝি না। আমার প্রিয়রা বুঝি তাদেরও প্রিয় হয়ে যায়।
যত্নে লাগানো বাগানের গাছে ঘুরতে তাদেরও খুব ভালোলাগে। বন্য পশু প্রাণীদের একটা স্বভাব লক্ষ করলাম তারা আমাদের বাড়ি ঘর বেশ পছন্দ করে। আগে জানতাম চড়ুই পাখি ঘরে বাসা বানায় এখন দেখি নানা পাখি ঘরের নানা আনাচকানাচে জায়গা খুঁজে ঘর বানাতে পছন্দ করে গাছের চেয়ে। বেশ কিছু দিন না চালানো যন্ত্রপাতি, গাড়ির মাঝেও তারা পরম সুখে ঘরসবতি তৈরি করে।
কিছুদিন অগে বেশ রাতে বসে লিখছিলাম। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। কে এলো এত রাতে কারো আসার কথা না কিন্তু কে ডাকে দরজার বাইরে থেকে। প্রথমে তেমন গা না করলেও পরে উঠতেই হলো ঘন ঘন শব্দে। এ দরজা সে দরজা পরখ করে পিছনের দরজায় এসে পেলাম ডেকে বসে, মানুষের মতন থেকে থেকে নক করছে মোটাসোটা এক র্যাকুন। আলো জ্বাললেও তার যাওয়ার নাম গন্ধ নেই যেন বলছে দরজা খোল আমাকে ভিতরে আসতে দাও। বাইরে খুব বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে।
র্যাকুনকে ঘরে আনার ইচ্ছ আমার নেই তাই তাকে তাড়িয়ে দিতে শব্দ করলাম। পরের দিন দেখি দেয়ালে বেশ ডেন্ট হয়েছে তার ধাক্কানোর ফলে।
আমার ভ্যানিজুয়েলার এক বন্ধু একদিন এক ভিডিও দেখাল। রেকুন জানলার বাইরে থেকে খাবার নিচ্ছে। আমি বললাম তোমার এই ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দাও ভাইরাল হয়ে যাবে। তবে রেকুন থেকে সাবধান থেকো। একটু আঁচড় লাগলে রেবিস হতে পারে।
ও বলে ওর নাকি খুব ভালোলাগে প্রাণীটাকে দেখতে।
আগে কখনো দেখেনি। তাই নিয়ম করে খাবার দেয়। রেকুন এসে জানালার পাশে দাঁড়ায় ও খাবার নিয়ে হাত বাড়ালে, রেকুন প্রথমে হাতদুটো মুছে নেয় তারপর ওর হাত থেকে খাবার নেয়।
বন্ধুটি বলে না ওরা খুব ভ্দ্র এবং পরিস্কার।
শুনে মনে হলো প্রাণীদেরও কিছু নিয়ম আছে। তবে রেকুন খুব চলাক প্রাণী। খাবার কোথায় পাওয়া যাবে তারা জানে। গার্বেজ ক্যানগুলোর, কম্পোজ বিন খুলে খাবার বের করে। সিটি এই ম্যাসাকার এড়াতে নতুন করে লক সিস্টেমের বিন দিয়েছে। রেকুন শিখে গেছে কি ভাবে লক মুচড় দিয়ে খুলতে হয়। রেকুন সব জায়গায় চলতে পারে। গাছে উঠে যেমন। বিদ্যুতের তার বেয়েও হাঁটে। বাড়ির এাটিক খুব প্রিয় জায়গা।
আমার বাড়ির পিছনের গ্যারাজে প্রতিবছর বসন্তে আসে । বাচ্চা করে দলবলে কয়েকদির পর চলে যায়। কখনো দেখি মা গাছে চড়ছে পিছনে ছয়টা বাচ্চা লাইন দিয়ে গাছে চড়ছে। এরা যে কয়দিন থাকে আমার খুব অস্বস্থি লাগে । কারণ এরা নানা রোগ ছড়াতে পারে। আমার বন্ধুর মতন অজ্ঞ নই তাই এদের কাজল টানা চোখের প্রেমে পরি না।
বাড়ির পিছনে বুনো ঝাড়ের দিকে অনেকদিন যাওয়া হয়নি। কদিন আগে হাঁটতে গিয়ে দেখি নানা রঙের ব্যারি। রেশব্যারিগুলো এমন টসটসে রসাল গাছ থেকে তুলেই টাটকা টপাটপ অনেকগুলো খেয়ে ফেললাম।
কিছু ব্যারি ঝুলে আছে যেন চুনি পাথরের ঝালর হয়ে। কিছু গোমেদের মতন গাড় খয়েরি বেগুনির মিশেল অদ্ভুত এক রঙ নিয়ে ঝুলে আছে অজস্র ফল।
ব্যারি নামের ফলগুলো যে এত্ত উপকারি। আগে জানতাম না। নানা রকমের ব্যারির সন্ধান পেলাম, বিদেশে এসে। দেশে বেতফল, ব্যারির মতন ছোট এই ফলটাই খেয়েছি। তবে খোসা ছিলে খেতে হতো। এখানে ব্যারির কোন খোসা নাই। এখন বাগান থেকে তুলে সরাসরি মুখে এই ব্যারিগুলোই দিয়ে দেই, ছোটবেলার মতন।
তবে বড়দের মতন শাসন করে আমার মেয়ে এভাবে খাওয়া ঠিক না। ধুয়ে খাও। তাও ঠিক কত কিছুই থাকতে পারে। তবে আমাদের ছোটবেলায় আমরা কত কিছু না ধুয়ে খেয়ে ফেলেছি।
তুত ফলের মতন ম্যালব্যারির গাছ থেকে পেরে ম্যালব্যারি খেতাম আমি আগের একটা বাসায়। তবে আমি যত না খেতাম তার চেয়ে বেশি খেত কাঠবেড়ালি। ম্যালব্যারি পারা আর খাওয়ার পর আমার হাত নখ আর দাঁতে তাদের পাকা রঙ বসে থাকত বেস কিছু দিন।
প্রকৃতি হয়তো বদলে যাচ্ছে বুঝি না। ক'দিন আগে একদম বাতাস ছিল না। কিন্তু বয়ে যাচ্ছিল একটা ধোঁয়ার প্রলেপ বিশ্রি পোড়া গন্ধ সকাল থেকে আর আঁধার কুয়াশা মাখা চারপাশ। আশেপাশে কোথাও আগুন লেগেছে কিনা জানতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওয়েদার ওয়েবসাইট দেখাল নর্থের আগুনের ধোঁয়া দক্ষিণের অনেকটা জায়গা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এতটা দূরে তার বিস্তৃতি হতে পারে ভাবতে পারি নাই। কিন্তু প্রত্যক্ষ করলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা আগস্ট, ২০২১ রাত ৩:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


