somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এডিসন’রা এখনো ভোগায়!

০৯ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি ছোটবেলায় গারো ছেলেদের দেখেছি, ওরা নিজ ভূমি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল কাজের খোঁজে দেশের ভিতরেই অনেক জায়গায়। তাদের কয়েকজন আমাদের বাড়িতেও কাজ করত; খুবই নিম্নশ্রেণীর কাজ! এই যেমন - গরুর রাখাল, বাড়ীর পাহারাদারসহ আরও অনেক শ্রমঘন কাজ কিন্তু মজুরী ছিল অনেক কম, পেটে-ভাতে আর মাসে মাসে কিছু টাকা। এ নিয়েই তারা খুব সন্তুষ্ট থাকতো।

ওরা ছিল অসম্ভব বিশ্বাসী। লক্ষ টাকা ওদের হাতে দিলেও তা থাকতো নিরাপদ! আমাদের মা-দিদিরা ওদেরও মা-দিদি হয়ে যেত! যে বাড়ী বা পাড়ায় ওরা থাকতো- সে এলাকা চোরেরা মাড়াতও না কারণ চোররা জানতো ওরা নাকি বাঘ-হাতির সাথে যুদ্ধ করে, রাতে তাদের মতই চোখে দেখে আর কোমরে দা নিয়ে ঘোরে; যা আবার যখন তখন ব্যবহারও করে। এই ভয়েই এলাকায় চুরি বন্ধ থাকতো। আবার রাতে ওরা খুব সুন্দর বাঁশী বাজাত, যমুনার বাতাসে তা ছড়িয়ে পড়তো আমাদের পুড়ো পাড়ায়। ভাল লাগতো সেই সুর। ভীষণ ভাল!

ওরা ছিল সরল, খুবই সরল। আমাদের গরুর রাখাল এডিসন; মাঝে মাঝেই গরুর খাবারের চারি থেকে হাতের আঁজলে জল মেশানো খাবার তুলে মুখে দিত। একদিন আমার বড়মা ওকে জিজ্ঞাসা করলো, হ্যাঁরে এডিসন তুই এটা কি করস? এডিসনের উত্তর ছিল, দ্যাখো না বড়মা, এত সুন্দর করে খাবার বানিয়ে দেই তাও ওরা খায় না, তাই খেয়ে দেখলাম লবণ হয়েছে কিনা! স্বাদ কেমন! গরুরাও ওকে খুব পছন্দ করত; কথা মানতো ওর। এমনকি নদীতে স্নান করতে নেমে যেতে বললেও একাই নেমে স্নান-টান করে উঠে আসতো গরুরা। অথচ যে জানে, সে নিশ্চয় বুঝবে গরুকে স্নান করানো কত কষ্টের। তাও আবার নদীতে? গুঁতা-লাত্থি কারে কয় যে খেয়েছে সে ঠিক জানে।

একদিন খুব শীতের সকালে পরিচিত একজন গারো আদিবাসী; হাফপ্যান্ট পড়া খালি গায়ের ছোট একটা কালো ছেলেকে নিয়ে এসে হাজির আমাদের বাড়ীতে যার নাক মুখে তখনো সর্দি-ময়লায় জট পেকে আছে। সেই মানুষটি ছেলেটিকে আমার জ্যাঠার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “বড়বাবু ছেলেটাকে আপনার বাড়ীতে রেখে দেন, খুবই গরীব আর এতিম। আমার ভাগ্নে, রেখে দেন ওকে”। তখন আমাদের বাড়ীর অবস্থা এমন ছিল যে, এই রকম দুই-পাঁচটা ছেলেকে রেখে কাজে লাগানো ছিল ডালভাত। আর বড়মা তার বিশাল গরুর পালের জন্য এমন ছেলেই খুঁজছিল। তাই ছেলেটির কাজ হাতেনাতে মিলে গেল। অপরদিকে আমার বাবার টোটকা চিকিৎসা আর বাড়ীর খাওয়ায় সুস্থ-তাগড়া হয়ে গেল এক মাসেই। বড় ষাঁড়েরাও ওকে সমজে চলতে শুরু করলো। - সেই ছেলেটি ছিল আমাদের এডিসন।

কিন্তু ওরা ছিল চরম নিরীহ। আমরা বাঙালীরা অনেকেই ওদের চরম অপমান করতাম! খেপাতাম! দেখে আমরা ছোটরা মজাও পেতাম, কখনো কখনো পেতাম কষ্ট! খুব কষ্ট! তাদের অপমানিত হতে দেখে! শেষের দিকে বাধা দিতাম বড়দের এসব করতে; আর ছোটদের দিতাম দৌড়ানি, ঠ্যাঙ্গানি নগদে! তাতে বড়রাও বুঝতো আমাদের মোটিভ! থেমে যেত তারা!

আমরা দেখেছি ও বুঝেছি- ওদের মধ্যে ছিল সবাইই ছিল কম-বেশী শিক্ষিত ও জ্ঞানী। কখনো তারা তা প্রকাশ করত না; কিছু বলতোও না কাউকে। কিন্তু আমরা জেনে ফেলেছিলাম ওদের আদান প্রদানের চিঠি দেখে। ওরা যে সেই সময়েই ইংরেজিতে চিঠি লিখতো। গোপনে ইংরেজি ভাষার বড় বড় বই পড়ত; যা ছিল আমাদের বড়দের কল্পনার বাইরে। কেউ কেউ ছিল বিএ পাশ বা তারও বেশী কিন্তু কাজ করত কামলার!

পরবর্তীতে আমাদের ধারণা পাল্টাতে থাকে ওদের প্রতি; কেউ কেউ গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে থাকে পার্ট টাইম জব হিসেবে কারণ রাতে থাকতো পাহারার কাজ বা দিনে কামলার! কেউ কেউ দায়িত্ব পায় ব্যাংকে, মহাজনের নগদ টাকা লেনদেনের বিশ্বস্ত কর্মচারী হিসেবে। আর ছিল ছোট বাচ্চা স্কুলে আনা নেওয়ার কমন ডিউটি। তবে একটাই সমস্যা ছিল ওদের নিয়ে; একবার ছুটিতে বাড়ী গেলে সহজে আসতো না, ওদেরই কাউকে দিয়ে খবর পাঠাতে হত। কখনো কখনো রিপ্লেস আসতো। আর ছিল অভিমানী ভীষণ! ওদের নিজেদের মধ্যে বলা ভাষাটা আবার আমরা কেউ বুঝতাম না; যা ওদের খেপানোর একটা কারণ ছিল।

ওদের দেখে আমাদের খুব কষ্ট হত! এখনো মনে পড়লে হয়। শরৎ, এডিসন নাম গুলো মনে পড়ে মাঝে-মধ্যে! তাদের সাথে কাটানো ছোটবেলাটা; ভোগায়।

আর ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষ দেখলে কষ্ট হয়!

বুঝি !!!

৮/১১/২০১৪ রাত, ১০.১৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ কি আজন্ম পাপ?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬



রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আছে, জনগণের নিরাপত্তা কোথায়?

বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কি নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারটুকুও আমাদের নেই? সরকার ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর থাকে। কিন্তু সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:০৫




১৯৯৭ সাল।

আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে মামুন ভাইয়ের একটা অডিও ক্যাসেটের দোকান ছিল। পাশেই মির্জা ভাইয়ের কনফেকশনারি। টিফিনের সময় ওখানে প্যাটিস খেতাম।

সেই সময় অডিও ক্যাসেটের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×