somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"যয়নব ও মুহাম্মাদ : যে মালা সপ্তাকাশে গাঁথা"

১৪ ই মে, ২০১৬ রাত ৯:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"ছিঃ, ছিঃ,যে মুহাম্মাদ (সঃ) যায়েদকে নিজের পুত্রের মত বড় করেছেন শেষ পর্যন্ত কিনা তার ঘর ভাঙলেন?
পুত্রবধূ যয়নব কে বিয়ে করলেন?কিভাবে পারলেন নিজ পুত্রবধূ কে বিয়ে করতে?"
ইসলামবিদ্বেষীদের জন্য "হট কেক" টাইপের প্রশ্ন!
আমি বলি,"ঠিক যেভাবে যায়েদ তার ফুফুকে (যয়নব) বিয়ে করলেন,তেমনিভাবে
মুহাম্মাদ (সঃ) তার পুত্রবধূ (যয়নব) কে বিয়ে করেছেন।"
শুনতে তিতা তিতা লাগছে তাই না!
এবার চলুন, রহস্য উদঘাটন করে আসি।

যয়নব ও যায়েদের এর পরিচয় :
উম্মুল মুমিনীন যয়নব বিনতে জাহাশ (রাঃ) ছিলেন নবিজির আপন ফুফাতো বোন।
তিনি ছিলেন অনিন্দ্য সুন্দরী! তার বাবা জাহাশ ছিলেন আরবের সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্যতম।
অন্যদিকে,যায়েদ ইবনে হারিসা ছিলেন একজন তুচ্ছ দাস।জাহেলী যুগের প্রথানুযায়
খাদিজা (রাঃ) এর ভাতিজা হাকিম ইবনে খুযাইমা বাজার থেকে যায়েদ কে কিনে ফুফুকে উপহার দেন।
কিন্তু খাদিজা, যায়েদকে মুহাম্মাদ (সঃ) এর খেদমত করার জন্য দিয়ে দেন।
মুহাম্মাদ (সঃ) যায়েদকে মুক্ত করে নিজের পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।
যায়েদ ও নবিজির ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অচিরেই নিজেকে কুরান
আর হাদিসের জ্ঞান এ নিজেকে পারদর্শী করে তোলেন।

যয়নবের সাথে যায়েদের বিয়ে:
ইসলামে আশরাফ -আতরাফের কোন বালাই নেই।সব মুসলিম সমান।ইসলামের সাম্য প্রতিষ্ঠা
করতে গিয়েই মুহাম্মাদ (সঃ), যয়নবের অনুমতিক্রমেই তাকে যায়েদের সাথে বিয়ে দেন।
আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ কুরাইশ বংশের মেয়ে, অনিন্দ্য সুন্দরী যয়নব,স্বামী হিসেবে এক আযাতপ্রাপ্ত
গোলামকে পেয়ে মেনে নিতে পারেন নি।শুধুমাত্র মুহাম্মাদ (সঃ) এর ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি এ
বিয়েতে রাজি হন।তাদের মাঝে প্রচন্ড দাম্পত্যকলহ বিদ্যমান ছিল।এভাবে এক বছর কেটে গেল।
পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না দেখে একদিন যায়েদ এসে নবিজীকে বললেন,
"হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ),যয়নব আমার সাথে শুধু তর্ক করে।আমি তাকে তালাক দিতে চাই।"
একথা শুনে নবিজি প্রশ্ন করেন,
"তুমি কি তার মাঝে কোন ত্রুটি দেখেছো?" যায়েদ বলেন,"না।তাও আমি তার সাথে থাকতে পারব না।"
এরপর নবিজি যায়েদকে আল্লাহ্ র ভয় দেখিয়ে তালাক দেয়া থেকে বিরত থাকতে বলেন।
কারণ তালাক দেয়া শরীয়তে জায়েজ হলেওঅপছন্দনীয়।
এমন কি বৈধ কাজগুলার মাঝে এটি নিকৃষ্টতম আর সবচে ঘৃণিত!
কিন্তু শেষপর্যন্ত যায়েদ তাকে তালাক দিয়ে দেন।তালাকপ্রাপ্তা হবার পর সমাজের চোখে যয়নব হয়ে
অবজ্ঞা আর ঘৃণার পাত্রী!কানাঘুষা চলতে লাগল,"ক্রীতদাসের
তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে কে বিয়ে করবে?"
নিজ ফুফাতো বোনের এহেন অবস্থা দেখে মুহাম্মাদ (সঃ) নিজেই তাকে বিয়ে করতে মনস্থ করলেন।
কিন্তু জাহেলী প্রথা বাধা হয়ে দাঁড়াল। কারণ যায়েদ ছিলেন নবিজিরপালকপুত্র।আর সেকালে আরবের লোকেরা
পালকপুত্রকে আপন পুত্রের মত মনে করত।
তাছাড়া সেসময় তার পরিচিতি ছিল যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ নামে।তাই মুহাম্মাদ (সাঃ) অপবাদের আশংকা করছিলেন।
তাছাড়া মুনাফিকদের তর্জন-গর্জনও ছিল।যাহোক,আল্লাহ সুবহানুতায়ালা সব কুসংস্কার ছুড়ে নির্ভেজাল
ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মুহাম্মাদ (সঃ) দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন।

আল্লাহ সুবহানুতায়ালা আয়াত নাযিল করলেন :
" হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফের ও কপট বিশ্বাসীদের কথা মানবেন না।
নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"(৩৩:০১)
"এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র।
আল্লাহ ন্যায় কথা বলেন এবং পথ প্রদর্শন করেন।"(৩৩:০৪)
"তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত। যদি তোমরা
তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে
তোমাদের কোন বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোন গোনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা।
আল্লাহ ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু।"(৩৩:৪-৫)
"আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন,
তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন
করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই
অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে
আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। " (৩৩:৩৭)
"মুহাম্মদ তোমাদের কোন পুরুষ লোকের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।
আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।"(৩৩:৪০)

বিয়ের প্রস্তাব যায়েদের মাধ্যমে :
আল্লাহ আয়াত নাযিল করার ফলে নবিজি আশ্বস্ত হলেন।এরপর যায়েদকেই পাঠালেন বিয়ের প্রস্তাব
নিয়ে যয়নব এর কাছে যাবার জন্য।
যয়নব উত্তরে বলেন,"এত খুব খুশির খবর তবে ইস্তেখারা করে সিদ্ধান্ত নেব।তিনি ইস্তেখারায় বসে যান।
তবে ইতিমধ্যেই আয়াত নাযিল হয়ে যায়:
"অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে
বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে
সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে।
আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে।" (৩৩:৩৭)

এ বিয়ের সময় টা ছিল ৫ম হিজরীর জিলক্বদ মাস।
আর এ জন্যই যয়নব গর্বকরে বলতেন,"আমার বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন।"

বিয়ে থেকে শিক্ষা:
১)জাহেলী যুগে পালকপুত্র আসল পুত্রের মর্যাদাসম্পন্ন ছিল।এ প্রথার বিলুপ্তি ঘটানো।
২)কাউকে তার প্রকৃত পিতা ব্যতীত অন্যের পিতৃ পরিচয়ে সম্পর্ক করা যাবে না।
৩)মানুষের মাঝে উঁচু -নিচুর ভেদাভেদ করা যাবে না।
৪)ডিভোর্সী নারীর প্রতি কুধারণা পোষণ থেকে দূরে থাকা।
৫)ডিভোর্সী নারীকে বিয়ের মাধ্যমে সামাজিক বিভ্রান্তি দূর করা।

আফসোস! আমাদের সমাজে অনেক ডিভোর্সী নারী আছেন যারা সমাজের চোখে অচ্ছুত হিসেবে বিবেচিত হন।
অথচ আল্লাহ সুবহানুতায়ালা মুহাম্মাদ (সঃ) এর মাধ্যমে, সেই ১৪০০ বছর আগেই ডিভোর্সী নারীদের
উপযুক্ত মর্যাদা, অধিকার আর সম্মান দিয়ে গেছেন।
এরপরেও যারা মিথ্যা বলে,বানোয়াট কাহিনী রচনা করে আল্লাহর নবীর চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তারাই আসলে এ দুনিয়ার সবচে বড় হিপোক্রিট!
আল্লাহ আমাদের সকলকে হক কথা গ্রহণ করার জন্য উপযুক্ত করুন।আমিন।

তথ্যসূত্র :জান্নাতী ২০ রমণী
পিস পাবলিকেশন্স -ঢাকা

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০১৬ রাত ৯:১১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভারত কেন মক্কা চুক্তি নিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭


সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি যা মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত। সবেমাত্র এতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যা এখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ময়নাদ্বীপের মাঝি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭


(পদ্মানদীর মাঝী উপন্যাসের মূল চরিত্র ও প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত উত্তরকথা)

পদ্মা আর মেঘনার যেখানে বিয়ে হয়েছে, সেখান থেকে আরও গভীরে, বঙ্গোপসাগরের নোনা মোহনায় জেগে থাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডানপন্থীদের তোয়াজ বা মক্কা প্যাক্টে ঢোকার আগ্রহ দ্রুতই বুমেরাং হতে পারে বিএনপি সরকারের জন্য

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৮



জামাত-এনসিপিকে 'বিরোধী দল হিসেবে' হাতে রাখতে বা আওয়ামী লীগের ফিরে আসাকে ঠেকাতে জামাত-এনসিপি বা এদের মতো ডা*নপন্থীদের দাবি-দাওয়াকে খুব বেশি প্রাধান্য দিলে সেটা বুমেরাং হয়ে দেখা দেবে বিএনপি সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মক্কাহ চুক্তি কি ?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯



মক্কাহ চুক্তি লেখা হয়েছে আরবি ভাষায়। বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা - পূর্ণাঙ্গ “মক্কাহ চুক্তি” বাংলা অনুবাদ করে প্রকাশ করছে না কেনো ? দেশের মানুষ কিভাবে জানবে এই চুক্তিতে কি লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩



চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

উনি আমাদের ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু পোস্ট অফিসের প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×