somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কয়েকটি লাশের আত্মকাহিনী

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'এভাবে আর ভালো লাগে না'- এমনটাই মনে হল নুরুল সাহেবের, ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে ন'টা, ঠিক করে বললে দু'তিন মিনিট এদিক-ওদিক হবে হয়তো। শরতের স্বচ্ছ আকাশ, নরম উজ্জ্বল আলোয় চারপাশ স্নিগ্ধ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঝরঝরে বাতাসে চারতলার বারান্দায় চুপচাপ বসে থাকতে খুব একটা খারাপ লাগে না, অন্তত ঢাকা শহরে। এটা কি দখিনে বারান্দা? নুরুল সাহেব ঠিক মনে করতে পারেন না কিংবা মনে করতে চান না। অর্থহীন দৃষ্টি প্রসারিত করে বসে থাকেন। কোনো চাঞ্চল্য নেই, দৃঢ়তা নেই, নির্লিপ্ত আর জবজবে ভেজা দৃষ্টি। তিনি সমস্ত ঘটে যাওয়া দেখে যান শুধু। সময় এসে স্থির হয়ে থাকে পলেস্তারা খসে পড়তে থাকা চার তলার এই মলিন বারান্দায়।


ঢাকায় চারপাশটা এখন ঠেসে যাচ্ছে আকাশচুম্বী উঁচু ভবনে। রাস্তায় হাঁটতে ভালো লাগে না, কোনোদিকে তাকাতে ভালো লাগে না; শহরের প্রাণটাই মরে গেছে। সে হিসেবে নুরুল সাহেবের চারতলার এই বিল্ডিংটাকে ভাগ্যবানই বলতে হয়।এর দুই দিকে মোটামুটি দুইশ ভেতরে কোন উঁচু ভবন নেই, ভাবা যায়! নুরুল সাহেব যেদিকে মুখ করে বসে আছেন সেখানে একটা ছোট পচা ডোবা। কোনোকালে হয়তো দীঘি ছিল। আর অন্যদিকে বস্তি; সচরাচর দেখা বস্তিগুলোর মত না, বেশ অবস্থাসম্পন্ন বস্তি। এক চালের নিচে পাশাপাশি তিরিশ-চল্লিশ ঘর। বেশিদিন নাই এসবের চিহ্নটাও থাকবে না। দুই পাশ ঢেকে যাবে উঁচু দালানে। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব ছড়িয়ে পড়বে চার তলার এই বারান্দায়। ডোবার জায়গাটা নিয়ে একটা ঝামেলা হচ্ছে শোনা যায়; একজন খুন হয়েছে কদিন আগে। এর পেছনে নুরুল সাহেবের ছোট ছেলের নাম এসেছে বেশ কয়েকবার। হয়তো কোনোভাবে জড়িত সে।


একটু নড়ে চড়ে বসতে গিয়ে বাম হাঁটুর ব্যথাটা চড়িয়ে দেন আর চেয়ারের পেছনের পায়ে মট করে একটা শব্দ হয়। হাঁটু থেকে কোমর বেয়ে লতিয়ে উঠতে থাকে ব্যথা। নুরুল সাহেব ব্যথায় কুঁকড়ে যান- দুহাতে হাঁটু চেপে ধরেন আর ঠিক তখনই মাংস পচা উৎকট গন্ধ তার নাকে এসে লাগে। বেশ কিছুটা সময় লাগে ব্যথার রেশ মিলিয়ে যেতে। নুরুল ইসলাম আবার অর্থহীন দৃষ্টি মেলে ধরেন। হাঁটুর এই ব্যথা বেশ পুরনো, নুরুল সাহেবের স্ত্রী রাহেলা বানু যে বছর মারা যান তারও প্রায় সাত বছর আগের। রাহেলারও হাঁটুতে ব্যথা ছিল। তিনি অবশ্য ছিলেন অসুখ-বিসুখের কারখানা, কি ছিল না তার! ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড-প্রেসার, এজমা, রক্তশূন্যতা; শেষ বয়সে চোখেও ভালো দেখতেন না। নুরুল ইসলামের সামনে সব ছবির মত ভাসতে থাকে। চোখ যেন একটু চঞ্চল হয়!


পরীর মত সুন্দরী ছিলেন রাহেলা বানু। বিয়ের আসরে রাহেলার মুখ দেখে তার মনটা ভরে গিয়েছিল। বার বার ভাবছিলেন -এ কি আমার জন্য! খোদা তো জোড়টা ঠিক করলেন না, অন্তত রাহেলার দিক থেকে। সংসার জীবনের প্রথম থেকেই তিনি কেমন যেন বউ পাগলা হতে থাকেন। রাহেলাও একটু পাগলী ছিলেন- নুরুল ইসলামের ভালোই লাগত। টোনাটুনির সংসার- রাগ, অভিমান আর দু'কূল ভাসানো ভালোবাসায় দিন কেটে যেতে থাকলো। নুরুল ইসলাম কোনোদিন খুব বড় চাকরির চেষ্টা করেন নি, ষাট-সত্তর দশকের গড়পড়তা বাঙালি মধ্যবিত্ত যে ধরনের চাকরির ঘেরাটোপে জীবন কাটাত, তিনি তা থেকে বেরুতে পারেন নি। তবে যা করেছেন সেটাই বা কম কিসে? ঢাকা শহরের এক নামিদামি উকিলের মুহরি ছিলেন তিনি। সেই উকিল সাহেবের নাম বলছি না, অনেকেই চিনে ফেলবেন। এতোটুকু জেনে রাখতে পারেন আশির দশকে বরিশালের বিখ্যাত ''পাঁচশালা হত্যা মামলায়'' আসামি পক্ষকে জিতিয়ে দিয়ে খুব নাম করেছিলেন। উকিল সাহেব ছিলেন নুরুল ইসলামের নিজের এলাকার লোক। এস.এস.সি. দিয়ে প্রথমে কিছুদিনের জন্য চেয়েছিলেন কাজটা করতে। পরে এক সময় কাজের নেশায় পড়াশোনাই ছেড়ে দেন। টাকা যা রোজগার করতেন, খুব একটা খারাপ ছিল না, অন্তত সেই সময়ে। প্রথম জীবনের কাঁচা পয়সা- গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়েও নিজের জন্য অনেকখানি রয়ে যেত। নুরুল ইসলামেরও নতুন কিছু করার প্রতি দিন দিন আত্মবিশ্বাস কমতে থাকে। মনে হচ্ছিল এর চেয়ে ভালো কিছু বুঝি তার পক্ষে করা সম্ভব না। উকিল সাহেবেরও সেই সময় পসার হচ্ছে- টাকায় পেয়ে বসেছে তাকে। এক সময় নুরুল ইসলাম লক্ষ্য করলেন মাস শেষে তিনি টাকা জমাতে শুরু করেছেন।


নিচের ডোবার ডান কোণায় ভিড় লেগেছে। জনা পঞ্চাশেক মানুষ সেখানে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। নুরুল সাহেব একটু উঁকি দিতে চেষ্টা করেন। পরে হাল ছেড়ে দেন। হাঁটুর ব্যথার কথা চিন্তা করে একটু ভয় পান যেন। লোকজনের কথা বার্তা একটু একটু কানে আসছে কিন্তু তিনি ধরতে পারছেন না। ভালোই জটলা লেগেছে। এমন সময় দশ বছরের কাজের ছেলে রুবেল দৌড়ে আসে, ''দাদাজান, নিচের ডোবায় একটা মরা মাইনসের লাশ ভাইসা উঠসে!'' কোন কথা বলেন না তিনি। কোন কথা বলার প্রয়োজনও বোধ করেন না। আর এই পিচ্চির সাথে কিই বা কথা বলবেন? যেমন হুস করে এসেছিল তেমনি হুস করে চলে যায় রুবেল। পচা মাংসের গন্ধ আবার নাকে এসে লাগে। নুরুল ইসলাম আবার কোন ভাবনায় ডুবে যান।


বিয়ের পর প্রায় তিন বছর ছিলেন ঝিগাতলায়। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তখন। দুই কামরার ছোট ঘর; রান্নাঘর আর বাথরুম আরেক পরিবারের সাথে ভাগ করতে হতো। সেই বাসা ছাড়ার দুই মাস আগে বড় ছেলে বদরুলের জন্ম হয়। তারপর আরামবাগ, খিলগাঁও, উত্তর শাহজানপুর হয়ে মুগদা পাড়া আসেন। মাসে তখন তেরশো টাকা ভাড়া দিতেন। ভালোই যাচ্ছিল সবকিছু। এক শীতের দুপুরে উকিল সাহেব নুরুল ইসলামকে ডাকলেন, ''নুরুল, তোমার সাথে কথা আছে, সন্ধ্যার পরে আমাকে মনে করিয়ে দিয়ো।'' সন্ধ্যার পর দেখা করতে গেলে উকিল সাহেব বলতে থাকেন- '' উত্তর মুগদার একটা জায়গার মামলা হাতে এসেছে, রব্বানি লড়বে। আমি কাগজপত্র দেখলাম- মালিকানায় জটিলতা আছে। এক বেচাতে কয়েক হাত ঘুরেছে। পার্টিও খুব ভালো না। মামলা চালাতে পারবে বলে মনে হয় না। আমি বলি তুমি জায়গাটা রেখে দাও''। নুরুল সাহেব বজ্রাহতের মত বসে থাকেন। তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। বলে কি বুড়ো! এতো টাকা কোথায় পাবেন তিনি? উকিল সাহেব বলে যান- '' ... প্রথমে বায়না করে ফেলো। গ্রামে যা কিছুজমি জমা আছে বিক্রি করে দাও, ধার-দেনা করে আরও কিছু জোগাড় করো, দেখো কিছু করতে পারো কিনা। আর শোনো ঢাকা শহরে এক টুকরা জমি- কিছু করতে পারলে বুড়ো বয়সে জমিদারের মত জীবন কাটাবে... '' এরপর কিভাবে যেন সব কিছু হয়ে গেলো। নুরুল সাহেব টেনে টুনে জোগাড় করলেন লাখ দুয়েক টাকা। বাকি সাড়ে তের লাখ টাকা উকিল সাহেব নিজেই কি মনে করে দিয়ে দিলেন। তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন- এতোগুলো টাকা কেউ এভাবে দিয়ে দেয়! পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত যুবক- ঘরে ফুটফুটে বাচ্চা আর মন খারাপ করে দেয়া চোখে তাকানো স্ত্রী, ঢাকা শহরে উত্তর মুগদায় সাড়ে পাচ কাঠা জমির মালিক!


কেমন করে যেন বাড়িটা হয়ে গেলো। একতলা, দুতলা, তিনতলা, চারতলা। পরে শুনেছিলেন উকিল সাহেবের দেয়া টাকার পুরোটাই ছিল বেহাতে পাওয়া, হজম করতে না পেরে তাকে দিয়েছিলেন; না হয় জেলে পর্যন্ত যেতে হতো। এটা নিয়ে একটা খচখচানি অবশ্য নুরুল ইসলামের মনে অনেকদিন ছিল। পরে সময়ে ধীরে ধীরে সব সয়ে যায়। আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়। মেয়ে হাসনা আর ছোট ছেলে রুহেল। ছোট ছেলের নাম রাহেলাই রেখেছিলেন। তারপর পদ্মায় পানি গড়িয়েছে অনেক। তাদের স্বামী-স্ত্রীর বয়স বাড়তে থাকে, ছেলে-মেয়ে বড় হতে থাকে। বাড়িটাও একতলা, দুতলা করে চারতলা হয়ে যায়।


শেষ জীবনে রাহেলাকে বেশ কষ্ট দিয়েছেন তিনি; যদিও রাহেলা বেঁচে থাকতে তা কোনোদিন মনে হয় নি। যাপিত জীবনে নুরুল ইসলাম বেশ ভদ্র আর সজ্জন ছিলেন। কিন্তু রাহেলার শেষ দিনগুলোতে তিনি কেমন যেন খ্যাপাটে হতে থাকেন। বড় ছেলে বদরুল ভার্সিটিতে পড়ার সময়ই এক সহপাঠীকে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। খুব একটা টান ছিল না বাবা মার প্রতি। পড়াশোনায় ভালোই ছিল। একদিন শুনতে পান কানাডা চলে যাচ্ছে বউ সহ। দুবছর পর ওখানেই স্থায়ী হয় বদরুল। শেষ এসেছিল রাহেলা মারা যাবার পর- সেও প্রায় নয় বছর হতে চলল। প্রথম জীবনে রোজগার, পরিবার আর এই বাসার জায়গা সামলাতে গিয়ে এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন তিনি যে ছেলেটার প্রতি স্বাভাবিক হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তার। যখন কিছুটা থিতু হয়েছেন বদরুল তখন কলেজ শেষ করার পথে। এতোটা সময় পরে এসে সম্পর্ক আর সহজ হয় না। বদরুলকে তিনি যেন হারিয়ে ফেললেন। মেয়ে হাসনাও হঠাৎ বড় হয়ে গেলো। বদরুল আর হাসনা ছিল তিন বছরের ছোট-বড়। কলেজের শেষ বর্ষে পড়ার সময় কাপড়ের ব্যবসা করা এক ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। হাসনার বড়মামা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিলেন। বলেছিলেন ছেলের পড়াশোনা না থাকলেও পরিবার ভালো। উনার জারিজুরিতেই বিয়েটা হয়ে যায়। খুব ভালো কিছু হয় নি তাতে। এখনও টেনেটুনে সংসার পার করছে হাসনা।


সে হিসেবে রুহেল কে তিনি বড় করেছিলেন নিজের মত করে। বদরুল আর রুহেলের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় তের বছরের। রুহেল ছিল তার শেষ বয়সের সন্তান। রুহেলের বড় হওয়ার সাথে সাথে নুরুল ইসলাম ও নতুন করে বড় হতে থাকেন- বাবা হিসেবে। ক্লাস এইট পর্যন্ত নিজেই পড়িয়েছেন। টাকা বাঁচানোর জন্য নয়, ছেলেকে সঙ্গ দেয়ার জন্য- ছেলের সঙ্গ পাওয়ার জন্য। কি ভালোই না বাসতেন তিনি রুহেল কে! এখনও কি ভালোবাসেন না? নুরুল ইসলাম হঠাৎ-ই খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন।


অনেক কাক জোড় হয়েছে বস্তির টিনের চালে; কর্কশস্বরে তার চিন্তার সুর কেটে যেতে থাকে। আশেপাশে কোথাও কি কাক মরে পড়ে আছে? না হলে এতো কাক কোত্থেকে আসলো? একটা বিরক্তির ভাঁজ ফুটে ওঠে নুরুল ইসলামের কপালে। কাজের ছেলে তো বলে গেলো একটা লাশ ভেসেছে নিচের ডোবায়- এমনটা ভাবেন। এক সময় আবার ডুবে যান তিনি। আজ তাকে নেশায় পেয়েছে।


রুহেলের বড় হতে থাকা আর নুরুল ইসলামের পিতৃত্ব উপভোগ করতে থাকার সাথে সাথে আরেকটা ব্যাপার ঘটতে থাকে- রাহেলা বানু অসুস্থ হতে থাকেন, ভেঙে যেতে থাকেন। সেটা শারীরিক আর মানসিক দু'ভাবেই। ক্রমাগত অসুখের বিস্তার তাদের আর্থিক সামর্থ্যকেও প্রকট করতে থাকে। প্রতিদিনের এক গাদা ওষুধ মাস শেষে অনেকগুলো টাকা বের করে নিত। এরই মাঝে নুরুল সাহেব হার্ট এটাক করে বসলে এক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুরো পরিবার। তারপরও ভালোই যাচ্ছিল। বদরুল মাঝে মাঝে যা টাকা পাঠাতো- বলার মত কিছু ছিল না। বাসা ভাড়ার টাকাই তখন সব। রাহেলার শরীর দিন দিন খারাপ হতে থাকে। দিন বুঝি এভাবেই শেষ হয়ে যায়!


নুরুল সাহেব রুহেলের প্রতি যতটা দুর্বল ছিলেন, রুহেল ছিল তারচেয়েও বেশি মা-ন্যাওটা। সবকিছুতে সে মাকে খুঁজে বেড়াতো। মায়ের কাছে তার যত আবদার, উচ্ছ্বাস, কান্না, জেগে থাকা, ঘুমিয়ে পড়া। নুরুল সাহেব রুহেলের যত কাছে যেতে চাইতেন রুহেল ততই বাবাকে এড়িয়ে চলত। এতে তিনি রাহেলার প্রতি যে কিছুটা ঈর্ষা অনুভব করতেন, তা বোঝা যেত। কিন্তু রাহেলার অসুস্থতা সব কিছু বদলে দিতে থাকে। ধীরে ধীরে এমন হল একা একা টয়লেট করতে পারেন না, গোসল করতে পারেন না, বিছানায় শুলে পাশ ফিরতে পারেন না, একা একা হাঁটতে পারেন না- সব সময় কাউকে সাথে থাকতে হয়। আর সেই কেউ একজন হলেন নুরুল ইসলাম। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এভাবে যেতে থাকে। একসময়ের ভদ্র শান্ত সৌম্য নুরুল ইসলাম ভয়াবহ ধরনের খ্যাপাটে স্বভাবের হতে থাকেন।


তারও বয়স হচ্ছিল, রাহেলার আট বছরের বড় ছিলেন তিনি। রাহেলা তখন চলাচলে প্রায় অক্ষম। তাছাড়া তার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা একেবারেই ছিল না। একটুতেই কান্না কাটি শুরু করতেন। একদিন দেখা গেলো নুরুল ইসলাম তার স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন, গালিগালাজ করছেন। কয়েকদিন বৃদ্ধ-অসুস্থ স্ত্রীর উপর হাতও তুলেছেন। রাতের বেলা টয়লেটে নিয়ে যাও, গোসল করিয়ে দাও, খাবার টেবিলে ভাত বেড়ে দাও- রাহেলার শেষ দিনগুলোতে এসব কিছুতেই নুরুল ইসলামের জীবন আটকে পড়েছিল। আজও ভাবেন, কতটা বিরক্ত ছিলেন তিনি স্ত্রীর প্রতি? অসুস্থতায় মানুষের হাত কতটুকু? এদিকে মায়ের প্রতি বাবার এমন আচরনে রুহেল ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে। প্রথমদিকে খুব বাহাস করত বাবার সাথে। কিন্তু এতে নুরুল সাহেব আরও রেগে যেতেন আর রুহেলের মায়ের সাথে আরও খারাপ ব্যবহার করতেন। এক শীতের মাঝরাতে রাহেলা টয়লেটে যেতে নুরুল ইসলামকে ডাকেন। কাঁচা ঘুম ভেঙে যেতেই নুরুল ইসলাম রাগে ফেটে পড়েন। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাহেলার গলা চেপে ধরেন। কতক্ষণ চেপে ধরেছিলেন? ছয়-সাত সেকেন্ড? তাতেই রাহেলা চলে গেলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কে যান নুরুল ইসলাম। কাউকে কিছুই বলেননি তিনি। রাতে ঘুমের মধ্যে মারা গেছেন- এমনটাই সবাই জানতে পারে।


রাহেলার মৃত্যুশোক এক সময় স্বাভাবিক হলেও বদলে যেতে থাকেন নুরুল ইসলাম আর তার ছেলে রুহেল। নুরুল সাহেব নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন আর রুহেল হতে থাকে বাবার অবাধ্য। যেদিন রুহেল তার বাবাকে বলে,''আমার মায়ের মৃত্যুতে আশা করি খুশি হয়েছ, এখন আরাম করো...'' সেদিন থেকেই তাদের সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। এখন সম্পর্ক প্রায় নাই বললেই হয়, অথচ একই বাসায় থাকেন দুজন। রুহেল কখন বাসায় আসে কখন যায় তিনি জানেন না। জানতে চান ও না। প্রথম প্রথম হুট করে রুহেলের সামনে পড়লে খুবই বিব্রত হতেন তিনি। এখন কিছুই অনুভব করেন না। প্রায়ই শেষ রাতের কথা ভাবেন। আসলেই কি তিনি গলা চেপে ধরেছিলেন? পরিস্কার মনে করতে পারেন না। জীবনের শেষ অংশটা কেটে ফেলতে চাইতেন এক সময়। ধর্ম-কর্ম থেকে দূরে সরে গেলেন। কারো সাথে মেশেন না, কথা বলেন না। শুধু চেয়ে থাকেন আর ভাবেন। রুহেল ভয়াবহভাবে বখে যেতে থাকে। কলেজে থাকার সময় পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। মায়ের প্রতি বাবার আচরণ সে কোনদিনও মেনে নিতে পারেনি। অনেকটা যেন বাবাকে দেখাবে বলে সে নষ্ট হতে থাকে। বাবা যেন তাকে বকেন এমনটাই প্রত্যাশা করে সে। কিন্তু নুরুল সাহেব কথা বলেন না, বকেন না, কিছুই করেন না। শুধুই বেঁচে থাকেন।


-''দাদাজান, আফনের ফুন'' কর্ডলেস এগিয়ে দেয় রুবেল। নুরুল ইসলাম বামকানে ধরেন। হাসনা কথা বলছে,

-''বাবা, কি করছ?''

-''বারান্দায় বসে আছি''

-''বাবা, তোমার জামাইকে নিয়ে আসছি। কদিন থাকবো।''

-''কেন?''


লাইনটা কেটে যায়। নুরুল ইসলাম আবার সামনে তাকিয়ে অর্থহীন দৃষ্টি মেলে ধরেন। এই চেয়ে থাকার মাঝে দেখার কোন আকাঙ্খা নাই, তৃপ্তি নাই। প্রায়ই তার মনে হয় চেয়ে থাকা আর চোখ বন্ধ করে থাকার মাঝে কোন তফাৎ নাই, অন্তত তিনি বুঝেন না। মানুষের সবার আগে বুঝি চোখটা মরে যায়। তিনি ভাবতে থাকেন-রাহেলা তো দেখতেই পেত না ভালো করে... নিচে আবারও কিছুটা হট্টগোল শোনা যায়। পচে যাওয়া গলে যাওয়া মাংসের উৎকট গন্ধ নাকে এসে লাগে। পুলিশের গাড়ি এসেছে, সাইরেন বাজিয়ে। নুরুল ইসলাম এবার দাঁড়াতে চেষ্টা করেন। চেয়ারে মট করে শব্দ হয় আর হাঁটুর ব্যথাটা একটু চড়ে যায়। এবার আর তিনি হাঁটুতে হাত চেপে ধরেন না। অর্থহীন দৃষ্টি মেলে ধরেন।


কলিং বেল বেজে ওঠে। নড়ে চড়ে বসেন নুরুল ইসলাম। বাইরের ঘর থেকে হাসনার গগন বিদারী কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। অনেক ভেবেও তিনি মনে করতে পারেন না হাসনার ঘরে তার কোনো নাতি-নাতনি আছে কিনা। থাকার তো কথা!


রুবেল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে, ''দাদাজান, পুলিশ আইসে!''
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:২৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২


একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা
শুধু ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলাই নয- বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - প্রমাণ

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১২



ব্লগার সাহেব আমেরিকা থেকে লিখেছেন, “অমুক আসলে মুক্তিযোদ্ধা নন।”

আমি বন্ধুকে ফোন করলাম।
বললাম, “তুমি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?”

সে বলল, “বুঝতে পারছি না।”

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×