somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসরাইলী সৈন্যদের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী পাড়ি দিয়ে ফিলিস্তিনের হেবরনে নবী ইব্রাহিম আঃ এর রওজা জিয়ারত

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দিলু নাসের
আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত ভূমি পিএলও শাসিত ফিলিস্তিনের ওয়েস্ট ব্যাংকের ভেতর দিয়ে। ইসরাইল অধিকৃত ঐতিহাসিক নগরী জেরুজালেম থেকে ইসরাইলি সৈন্যদের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী, সীমান্তের সুউচ্চ প্রাচীর অতিক্রম করে আমরা যাচ্ছি ওয়েস্ট ব্যাংকের আলোচিত নগরী হেবরন অভিমুখে। ইসরাইল এবং ওয়েস্ট ব্যাংকের সীমান্তবর্তী নবী ইউনুসের স্মৃতিবিজড়িত শহর হালহুলে কিছুক্ষণ অতিবাহিত করে আমরা যাচ্ছি আমাদের মূল গন্তব্য নবী ইব্রাহিম আঃ প্রতিষ্ঠিত শহর হেবরনে।
গাড়ি হালহুলের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসতেই সামনে ভেসে উঠল ইতিহাসে মোড়া শহর হেবরন, আরবিতে যাকে বলে আল-খলিল, অর্থাৎ “বন্ধু” নবী ইব্রাহিম আঃ এর স্মৃতিবাহী পবিত্র শহর।
প্রবেশ মুখে দেখা গেল এক বিশাল তোরণ, তাতে বড় অক্ষরে লেখা “Welcome to Al-Khalil” মনে হলে শহরটি যেন আপন ভঙ্গিতে আগন্তুককে স্বাগত জানাচ্ছে।
আমি গাড়ির জানালা খুলে দিতেই মুখে এল জুদাইন পর্বতমালার পাহাড়ি হাওয়ার মৃদু ছোঁয়া, আর চোখে ধরা পড়ল ওয়েস্ট ব্যাংকের শহুরে জীবনের রঙিন ক্যানভাস।
রাস্তার দুই পাশে ছোট ছোট- বড় দোকান, কেউ বিক্রি করছে মিষ্টি খেজুর, কেউ রঙিন কাপড় আর আরবীয় চাদর; কোথাও কফির দোকান থেকে ভেসে আসছে তাজা কাওয়ার সুবাস।
দেখলাম প্রতিটি লাইটপোস্টে উড়ছে ফিলিস্তিনের পতাকা, লাল, কালো, সবুজ আর সাদা রঙে ঝলমল করছে শহরের প্রতিটি মোড় যেন প্রতিরোধ ও আশার প্রতীক।
রাস্তার ধারে স্কুলফেরত ছেলেমেয়েরা ব্যাগ কাঁধে ছুটে চলেছে, কেউবা সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে বাজারের দিকে।
নারীরা মাথায় রঙিন হিজাব পরে সাবলীলভাবে হাঁটছেন, হাতে বাজারের ব্যাগ, তাঁদের মুখে ক্লান্তি নয় বরং আত্মসম্মান ও স্থিতির ছাপ।
পুরুষেরা দোকানে বসে চায়ের পেয়ালায় আলাপ জমাচ্ছেন হয়তো রাজনীতি, ফসল, কিংবা পরিবারের খবরাখবর নিয়ে।
হেবরন হলো এমন একটি শহর, যেখানে তিন ধর্মের মানুষ (মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান) একই স্থানে তাদের পবিত্র ইতিহাস খুঁজে পায়। কিন্তু এই পবিত্রতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘকালীন সংঘর্ষের ইতিহাস।
হেবরন (Hebron) শহরটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শহর, যার ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। এটি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে (West Bank) অবস্থিত, জেরুজালেম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে। হেবরন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলিম—তিন ধর্মের কাছেই অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।
প্রাচীন কানা‘আন যুগে হেবরন ছিল কানা‘আনীয় সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র। বাইবেলের মতে, এটি কানা‘আন দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর, যার নাম ছিল কিরিয়াথ-আর্বা (Kiriath-Arba)।
নবী ইব্রাহিম আঃ'র জন্মস্থান ইরাকে উর, তুরস্কের হারান, সিরিয়া, মিসর এবং শামের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসের পরে হেবরনে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন এবং এখানেই তাঁর স্ত্রী সারাকে (সারাহ আঃ) কবর দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ইসহাক আঃ (ইয়াকুব আঃ) সহ তাঁদের পরিবারের অনেককে এখানে সমাধিস্থ করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে নবী ইব্রাহিম খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২০০০–১৯০০ সালের দিকে হেবরনে আগমন করেন।
কারও কারও মতে তিনি তার পুত্র ইসমাঈলকে (আঃ) মক্কার মরুভূমিতে রেখে পরবর্তীতে কাবাঘর নির্মাণ করেন এবং এর কয়েক বছর পরই তিনি হেবরনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অনেকের মতে পুরোনো হেবরন শহরটি নবী ইব্রাহিমের দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
এর পাশেই রয়েছে "মাকপেলাহ গুহা" (Cave of Machpelah), যেখানে তিনি এবং তার পরিবারের রওজা রয়েছে যা আরবিতে আল-হারাম আল-ইব্রাহিমি (Al-Haram Al-Ibrahimi) নামে পরিচিত। এই জায়গাটি তিন ধর্মের কাছেই এক পবিত্র স্থান।
রাজা দাউদ (David) প্রথমে হেবরনে ইসরায়েলের রাজধানী স্থাপন করেছিলেন এবং প্রায় সাত বছর এখান থেকে শাসন করেছিলেন, এরপর রাজধানী স্থানান্তর করেন জেরুজালেমে।
এই সময় থেকেই হেবরন ইহুদি ঐতিহ্যে একটি পবিত্র শহর হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।
খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর সময় (খ্রিস্টাব্দ ৭ম শতক) মুসলমানরা হেবরন জয় করে। তাঁরা নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর সমাধির উপর একটি মসজিদ নির্মাণ করেন যা আজকের 'আল-হারাম আল-ইব্রাহিমি' মসজিদ নামে পরিচিত। ইসলামি যুগে শহরটি ছিল ধর্মীয় কেন্দ্র এবং বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও সমৃদ্ধ। ক্রুসেডার যুগে (১২শ শতক): ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা শহরটি দখল করে এবং ধর্মীয় স্থানটি গির্জায় রূপান্তর করে।
মামলুক ও উসমানীয় (Ottoman) শাসনামলে শহরটি আবার মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং দীর্ঘকাল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হেবরন ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে আসে। ১৯২৯ সালে এখানে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে (Hebron Massacre), যেখানে বহু ইহুদি নিহত হন এবং শহরটি থেকে ইহুদিদের প্রায় সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করা হয়।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল হেবরন দখল করে নেয়।বর্তমানে শহরটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (Palestinian Authority) নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও ইসরায়েলি সেনা এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা এখানকার একটি অংশে অবস্থান করছে।শহরটি এখন দুই ভাগে বিভক্ত-
H1 এলাকা: ফিলিস্তিনি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে।
H2 এলাকা: ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে, যেখানে ইহুদি বসতি রয়েছে।
H2 এলাকায় কিছু প্রধান জায়গা (বিশেষ করে পুরনো শহর ও ইহুদিদের বসতি) ইসরায়েলি সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সড়ক, প্রবেশপথ, বাজার, চেকপয়েন্ট ইহুদি–ফিলিস্তিনি দ্বৈরথ এখানে বেশ তীব্র। এখানে বিভিন্ন সময়ে বহু সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তা অভিযান ও বহু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।
নতুন শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছিল। আধুনিক ভবন, দোকানের সারি আর গাড়ির হর্ণের শব্দ ক্রমে ফিকে হয়ে এলো। আমাদের গাড়ি এখন এগোচ্ছে ইতিহাসের গলিতে পুরোনো হেবরন শহরের দিকে, যেখানে প্রতিটি পাথরের দেয়াল যেন শতাব্দীর গল্প ফিসফিস করে বলে যায়।
ওয়েস্ট ব্যাংকের আলোচিত ও ঐতিহাসিক শহর। পুরোনো হেবরন, এই শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নবীদের পিতা হজরত ইব্রাহিম আঃ। নবুয়তের ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, সব মিলিয়ে হেবরন যেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
আমাদের গন্তব্য পবিত্র স্থান নবী ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পরিবারের সমাধিস্থল, যাকে স্থানীয়রা শ্রদ্ধাভরে “মাকাম ইব্রাহিম” বলে ডাকে।
শহরের ভেতর ঢুকতেই দেখা গেল পুরনো ওল্ড সিটি সরু গলি, পাথরের বাড়ি, লোহার জাল দিয়ে ঘেরা পথ। উপরে টানানো জালগুলো যেন এই শহরের ক্ষতচিহ্ন, ড্রাইভার মনতাহিরকে জিগ্যেস করলাম এই জালিগুলো কি?
তিনি উত্তরে বললেন, পাশের ইসরায়েলি বসতি থেকে ছোঁড়া পাথর ও আবর্জনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এগুলো। তবুও এই গলিতেই বাজে শিশুদের হাসির শব্দ, গলির কোণে বুড়ো কারিগর এখনো বানাচ্ছে রূপার অলংকার, যেগুলো একসময় আল-খলিলের গর্ব ছিল।
এখানে চারপাশে পাথুরে আঁকাবাঁকা রাস্তা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতি—সব মিলিয়ে এক ভিন্ন জগতের অনুভূতি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি দেয়ালে ঝোলানো বিশাল ছবি, ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের । ছবিটির দিকে তাকিয়েই মনে পড়ে গেল এই ঐতিহাসিক শহরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তাঁর সংগ্রামমুখর জীবনের অনেক স্মৃতি। একসময় তিনিও এই হেবরনে অবস্থান করেছিলেন।
নতুন শহরের চেয়ে পুরোনো শহরের রঙ আলাদা দেখলাম এখানে জীবন অন্যরকম । পুরোনো শহরের উঁচু-নীচু পথে যেতে যেতে চোখে পড়লো বেশ কয়েকটি কিশোর ছেলে ছুটাছুটি করছে। একজনের হাতে একটা সাপের বাচ্চা এই দৃশ্য দেখে ফিলিস্তিনীদের সাহসের পরিচয় পেলাম । এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই যেন হেবরনের বাস্তব চিত্র—সংগ্রাম, বেদনা, সাহস আর আশার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
একসময় আমরা গাড়ি থেকে পুরোনো শহরের ছোট গলি দিয়ে হেঁটে নবী ইব্রাহিমের রওজার পানে ছুটলাম। এখানের রাস্তাগুলো সরু, পাথরে বাঁধানো, কোথাও উঁচু কোথাও নিচু।
প্রাচীন দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে মসলার গন্ধ, ভাজা বাদামের সুগন্ধ আর দূর থেকে কোনো দোকানির ডাক — “আহলান, তাফাদ্দাল!”স্বাগতম, আসুন"
এইসব পথ ধরেই হাজার হাজার বছর আগে হেঁটেছিলেন নবীদের পিতা হজরত ইব্রাহিম আঃ, তাঁর পুত্র নবী ইসহাক আঃ এবং ইসহাক আঃ-এর পুত্র নবী ইয়াকুব আঃ। সেই ভাবনাই আমার হৃদয়ের ভেতর গভীর আবেগের ঢেউ তুলছিল।
এই তীব্র আবেগের মাঝেও মনে এক ধরনের চাপা শঙ্কা কাজ করছিল। কারণ আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম ইসরাইলি সৈন্যদের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় ইব্রাহিম মসজিদ ও পবিত্র সমাধিক্ষেত্র Cave of the Patriarchs–এর দিকে।
পাথরের গলি ধরে আমরা হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম দুই পাশে দোকান, কেউ বিক্রি করছে খেজুর, কেউ রূপার গহনা, কেউ বা রঙিন পাথর খোদাই করে বানানো তসবিহ, আতর আর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দোকানে দোকানে ঝুলছে অসংখ্য ফিলিস্তিনের পতাকা। লাল-সবুজ-সাদা-কালো রঙের সেই পতাকাগুলো যেন প্রতিটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে ঘোষণা করছে,এই মাটি সংগ্রামের, এই মাটি আত্মমর্যাদার।পথচারি মানুষের মুখে সৌজন্যের হাসি অথচ চোখে লুকানো ক্লান্তির ছাপ।
এ যেন এমন এক শহর, যেখানে প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম চলে তবুও বিশ্বাস আর আশার আলো নিভে যায় না কখনো।
আমরা দ্রুত পায়ে পুরোনো শহরের গলিতে হাঁটছি। চারপাশে পাথরের দেয়াল, ওপরে টানানো জাল, আর বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ, পুরোনো ধুলো, মসলা আর ইতিহাসের মিশ্রণ।
হঠাৎ দেখি, আমাদের পিছু নিয়েছে কিছু ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। তাদের মুখে ধুলো, চোখে কৌতূহল আর করুণ আবেদন।
কেউ হাত বাড়িয়ে বলছে, “মাসারি, মাসারি…” অর্থাৎ “টাকা, টাকা…”আমাদের একজন সহযাত্রী মমতার বশে একটি শিশুর হাতে কিছু কয়েন দিলেন।
এরপর যা ঘটল, যেন এক মুহূর্তেই চারদিক থেকে আরও অনেক বালক-বালিকা হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
ছোট ছোট হাত আমাদের জামা টানছে, কেউ পায়ের কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে, কেউ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে আছে। লক্ষ করলাম, কিছু ছোট ছোট ছেলে আমাদের পিছু পিছু আসছে। কেউ পানি এগিয়ে দিচ্ছে, কেউ পথ দেখাতে চাইছে, কেউ বা সামান্য কিছু বিক্রি করার চেষ্টা করছে, সবই যেন সাহায্যের আশায়। তাদের চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত পরিণত ভাব যা তাদের বয়সের সঙ্গে মোটেও মানানসই নয়। একজন স্থানীয় লোক ফিসফিস করে জানালেন, এই বাচ্চাদের অনেকের বাবা শহীদ, কেউ কেউ আবার ইসরাইলি কারাগারে বন্দি। কথাটি শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। মনে হলো-এখানে শৈশব বড় দ্রুত শেষ হয়ে যায় বাস্তবতার কঠিন আঘাতে।
আমরা দ্রুত পা বাড়ালাম। নামাজের সময় ঘনিয়ে আসছে, সূর্যের আলো এখন গলির দেয়ালে গা ছুঁয়ে পড়ছে।

মসজিদের দিকের পথে মানুষের ভিড় বাড়ছে, কেউ ওজুর জন্য ছুটছে, কেউ দোকানের দরজা নামিয়ে দিচ্ছে। গলির শেষ প্রান্তে দেখা গেল ইব্রাহিমি মসজিদের গেট।
এখানেই নবী ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁর পরিবারের সমাধি, যাকে দেখতে মানুষ আসে দূর দূর দেশ থেকে।
কিন্তু এর প্রবেশপথ যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রের মতো।
লোহার গেট, উঁচু প্রাচীর, তার ওপরে সিসিটিভি আর মেশিনগানধারী ইসরায়েলি সৈন্যদের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী। তাদের মুখে কোনো ভাব নেই, চোখে কেবল তীক্ষ্ণ নজর।
আমাদের গাইড হাসান আগে থেকেই ওখানে দাঁড়িয়েছিলেন এক হাতে কাগজপত্র, অন্য হাতে পাসপোর্টের কপি।
গাইড নিচু স্বরে বললেন, “ভয় পাবেন না, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসুন। শুধু পাসপোর্ট দেখাবেন। কথা বলবেন না, হাসবেন না, ছবি তুলবেন না।”
আমরা একে একে গেটের দিকে এগোলাম। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ভয় জমে উঠছে।
চিন্তা হচ্ছিল যদি ঢুকতে না পারি? যদি তারা কোনো অজুহাতে ফিরিয়ে দেয়?
তবু একটুখানি সাহস জেগে উঠল , আমরা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী, হয়তো সেটাই আমাদের পক্ষে কিছুটা সুবিধা হবে।
চেকপোস্টের ধাতব দরজার ভেতর দিয়ে ঢোকার সময় মনে হলো এক অদৃশ্য সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছি, একদিকে ইতিহাস, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন দেয়াল। ছোট ছোট বহু সরু রাস্তা আর মানুষের কোলাহল পেরিয়ে অবশেষে আমরা এসে দাঁড়ালাম সেই নিরাপত্তাবেষ্টিত গেইটের সামনে। এখানে চারদিকে অস্ত্রধারী সৈন্য, স্ক্যানার, কড়া পাহারা, সব মিলিয়ে পরিবেশটি ছিল থমথমে। আমাদের গাইড ভেতরে প্রবেশ করলেন অনুমতির জন্য আর আমরা গেইটের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
এই অপেক্ষার সময়েই আমাদের ড্রাইভার আমাদেরকে সংক্ষেপে এই স্থানের ইতিহাস জানালেন। তিনি বললেন আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে এখানে ছিল একটি প্রাকৃতিক গুহা। হজরত সারাহ আঃ-এর ইন্তেকালের পর নবী হজরত ইব্রাহিম আঃ এই গুহাটি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে ক্রয় করেন দাফনের জন্য। এটিই ছিল এই পবিত্র স্থানে প্রথম কবর। পরবর্তীতে একে একে এখানে শায়িত হন নবী ইব্রাহিম আঃ নিজে, তাঁর পুত্র নবী ইসহাক আঃ ও তাঁর স্ত্রী হজরত রিবকা আঃ এবং তাঁদের পুত্র নবী ইয়াকুব আঃ ও তাঁদের স্ত্রী হজরত লেয়া আঃ।
প্রায় দুই হাজার বছর আগে রোমান সম্রাট হেরোড দ্য গ্রেট এই গুহাকে ঘিরে বিশাল প্রাচীর ও প্রাসাদোপম স্থাপনা নির্মাণ করেন। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলমানরা হেবরন দখল করার পর এই স্থানটি মসজিদে রূপান্তরিত হয় যা পরবর্তীতে বিভিন্ন ইসলামী শাসনামলে সংস্কার ও সম্প্রসারিত হয়ে আজকের এই ইব্রাহিম মসজিদে পরিণত হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর গাইড ফিরে এসে জানালেন, ভেতরে যাওয়ার অনুমতি মিলেছে। ঢুকতে তেমন কোনো অসুবিধাই হলো না। আসার আগে মনে যে ভয় কাজ করছিল তা মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করতেই এক অপার্থিব আবহ আমাদের ঘিরে ধরল। বিশাল পাথরের দেয়াল, সুউচ্চ স্তম্ভ, মৃদু আলো আর গভীর নীরবতা,সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল সময় যেন এখানে থমকে আছে । চারপাশে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম জিয়ারতকারী,কেউ নামাজে রত, কেউ দোয়ায় মগ্ন, কেউ আবেগে চোখ ভেজাচ্ছেন।
আমাদের জিয়ারত শুরু হলো নবী ইসহাক আঃ-এর রওজা থেকে। তাঁর সমাধির পাশে আরও কয়েকটি কবর। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লাম।
এরপর আমরা একে একে দেখলাম-হজরত সারাহ আঃ-এর রওজা, নবী ইসহাক আঃ ও হজরত রিবকা আঃ-এর রওজা, নবী ইয়াকুব আঃ ও হজরত লেয়া আঃ-এর রওজা।
সবশেষে আমরা প্রবেশ করলাম নবীদের নবী হজরত ইব্রাহিম আঃ-এর রওজা শরিফের কক্ষে। এটি একটি প্রশস্ত কক্ষ, মাঝখানে শক্ত প্রাচীর দিয়ে বিভক্ত। এই কক্ষের এক পাশ মুসলমানদের জন্য, অন্য পাশ ইহুদিদের জন্য নির্ধারিত। একই ছাদের নিচে দুটি ধর্মের মানুষের প্রার্থনা, অথচ মাঝখানে বিভাজনের দেয়াল! এই দৃশ্য গভীরভাবে হৃদয় ছুঁয়ে গেল।
নবী ইব্রাহিম আঃ-এর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লাম। চোখের কোণে অজান্তেই পানি জমে উঠল। মনে হচ্ছিল, আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই মহান নবীর সামনে যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় সন্তানকেও কুরবান করতে প্রস্তুত ছিলেন যাঁর ঈমান, ধৈর্য ও ত্যাগ মানব ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাকে বলা হতো ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর বন্ধু।
আমি রওজার সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে দুরূদ পড়লাম। কৃতজ্ঞতা জানালাম মহান আল্লাহর দরবারে তার বন্ধুর রওজা জিয়ারতের সুযোগ করে দেয়ার জন্য। মসজিদে নামাজ পড়ে দোয়া করলাম নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য এবং ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের জন্য এবং পৃথিবীর সব মানুষের শান্তির জন্য।
প্রায় তিন ঘণ্টা আমরা এই পবিত্র প্রাঙ্গণে কাটালাম, নামাজ, দোয়া, জিয়ারত ও নীরব ধ্যানে। সময় কীভাবে যে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছিল, এই পবিত্র পরিবেশে আরও কিছুক্ষণ থেকে যাই।
অবশেষে ভারী হৃদয় নিয়ে আমরা ফিরে আসার পথে পা বাড়ালাম। পেছনে ফেলে এলাম ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে নিয়ে এলাম এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি যা সারাজীবন আলো হয়ে জ্বলবে।

এই সফরের ঠিক তিন মাস পরে আমার আবারও সৌভাগ্য হয় একটি গ্রুপ নিয়ে সেই পবিত্র শহর হেবরনে যাওয়ার। সেদিন আমরা আধুনিক হেবরন শহরে গাড়ি থেকে নেমে পুরোনো শহরের দিকে হেঁটে যাই। এবার দেখলাম আধুনিক জীবনযাত্রার ভিন্ন এক চিত্র। ব্যস্ত রাস্তা, মানুষের কোলাহল, দোকানপাট আর বাজারের প্রাণচাঞ্চল্য।
সেদিন আমরা ইব্রাহিম মসজিদে প্রবেশ করেছিলাম অন্য একটি গেইট দিয়ে। পুরোনো শহরের সেই সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখি সেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো আবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাকে দেখে তারা হাসিমুখে বলে উঠল-
“Welcome, friend!”
এই ছোট্ট সম্ভাষণ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল গভীরভাবে। মনে হলো হেবরনের মাটি আমাকে আপন করে নিয়েছে।
সেদিন আমরা মসজিদ ও রওজার ভেতরে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করেছিলাম। সেখানে যে প্রশান্তি, যে আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেছিলাম তা জীবনের এক অমূল্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে। সেই নীরব মুহূর্তগুলো, সেই দোয়ার সময়, সেই পবিত্র আবহ-সবকিছু যেন হৃদয়ের গভীরে স্থায়ীভাবে গেঁথে গেল।
এরপর আমরা এক স্থানীয় ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে দুপুরের খাবার খেয়েছি। তাদের আতিথেয়তায় ছিল প্রাণের উজাড় করা ভালোবাসা। সাধারণ ঘর, সাধারণ খাবার, কিন্তু তাদের আন্তরিকতা, সম্মান আর মমত্ববোধ আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো অপরিচিতের ঘরে নই বরং আপন কারও বাড়িতে বসে খাচ্ছি।
সেই দিনের স্মৃতি, সেই ভালোবাসা, সেই আতিথেয়তা সবকিছু মিলিয়ে এই হেবরন সফর আমার জীবনের এক অম্লান অধ্যায় হয়ে রইল যা সময়ের সঙ্গে কখনোই ম্লান হবে না।
এখনও ঘুমে জাগরণে নবীদের শহর আল-খলিল আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। জীবনে হয়তো আর সেখানে যাওয়া হবে না, হলেও সেই প্রথম ভ্রমণের স্মৃতি আমার হৃদয়ে স্থায়ী ভাস্কর হয়ে রয়ে যাবে, প্রশান্তি, আবেগ, ইতিহাস এবং মানবতার এক অম্লান ছাপ রেখে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:২০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দায়বদ্ধতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত: ২০০৬ থেকে বর্তমানের শিক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:২৫

Photo - আপলোড না হওয়ায় ইমেজ লিংক:

“দায়বদ্ধতা ও সময়োচিত সিদ্ধান্ত: ২০০৬ থেকে বর্তমানের শিক্ষা”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সে সময় রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইস্টার ফ্রাইডে এবং যিসাসের শেষ যাত্রা: জেরুজালেমের স্মৃতিবিজড়িত পথে

লিখেছেন সৈয়দ নাসের, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৪




দিলু নাসের
আমার এই তিনটি ছবির সঙ্গে পৃথিবীর খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বেদনাবিধুর ইস্টার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রতিটি ছবিই যেন এক একটি অধ্যায়, একটি যাত্রার, যা শুরু হয়েছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ঘটনা নয়, এগুলো আগে থেকেই তৈরি করা মৃত্যু

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:০৫

চারপাশ থেকে কালো ধোঁয়া ঘিরে ধরছে। দুই চোখ প্রচণ্ড জ্বলছে । সুন্দর করে সাজানো হলরুমের প্লাস্টিক, ফোম, সিনথেটিক সবকিছু পুড়ে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে বিষাক্ত গ্যাসে। ঘরের অক্সিজেন প্রতি সেকেন্ডে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব কিছু চলে গেছে নষ্টদের দখলে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


সংসদ ভবনের লাল ইটের দেয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত, তবে হয়তো তারা লজ্জায় শিউরে উঠত অথবা স্রেফ অট্টহাসি হাসত। আমাদের রাজনীতির মঞ্চটা ইদানীং এক অদ্ভুত সার্কাসে পরিণত হয়েছে, যেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান যুদ্ধ: স্বাধীনতা নাম দিয়ে শুরু, এখন লক্ষ্য ইরানকে প্রস্তরযুগে নিয়ে যাওয়া

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:২৩


আমার আট বছরের ছেলে ফোনে ফেসবুক পাতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "বাবা, এটা কিসের ছবি"? আমি তার মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর বৃথা চেষ্টা করে অবশেষে বললাম, এটা আমেরিকা- ইসরায়েলের ইরানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×