
সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। গল্পের সমস্ত চরিত্র, নাম, স্থান এবং ঘটনা লেখকের কল্পনাপ্রসূত। বাস্তব কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলে গণ্য হবে।
ঢাকার কারওয়ান বাজারের একটা স্যাঁতসেঁতে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং লটে তখন অনেক রাত। চারপাশটা থমথমে। ল্যাম্পপোস্টের ঝপসা আলোয় একটা কালো রঙের প্রিডো জিপের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান। ওঁর চোখের নিচে জমে থাকা ইনসোমনিয়ার গাঢ় ক্লান্তিটা এই মৃদু আলোতেও স্পষ্ট।
পাশে দাঁড়িয়ে পরিদর্শক তানভীর, ওঁর চওড়া বুক আর শান্ত অবয়ব আজ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক। ঢাকার একটি কোরবানির পশুর হাট থেকে চার কোটি টাকার ১০০০ ও ৫০০ টাকার জাল নোট উদ্ধারের পর এই জিপের ব্যাকসিটে এখন হাতকড়া পরা অবস্থায় বসে আছে চক্রের অন্যতম পাণ্ডা রিয়াজ।
“তুই কি ভাবছিস, আমি তোকে টেকনাফ যাওয়ার হাইওয়েতে এনকাউন্টার করে দেব?” তানভীর জিপের খোলা জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে রিয়াজের মুখোমুখি দাঁড়াল। ওঁর কণ্ঠে কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না, ছিল এক জমাট বাঁধা বরফ। রিয়াজের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ল।
“আমি স্রেফ ডিস্ট্রিবিউটর, স্যার,” রিয়াজ মড়মড় করে উঠল। “আসল কারখানা টেকনাফের মুচনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে একটা ভাড়া বাসায়। মূল কারিগর প্রদীপ আর তার লোকাল পার্টনার ইদ্রিস। প্রদীপ আগে নীলক্ষেতের একটা প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করত, টাকার ডাইস বানাতে ওর ওস্তাদ কেউ নাই। সামনে ঈদ, তাই পশুর হাটগুলো টার্গেট কইরা কোটি কোটি টাকার জাল নোট অলরেডি ট্রাকে লোড করাইয়া দিছে। কাল ভোরে ওরা মেরিন ড্রাইভ দিয়া বাকি নোটের চালান সরাইয়া ফেলব।”
আরিয়ানের কণ্ঠটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে গেল। “প্রদীপ খুব চালবাজ, তানভীর। ও জানে ঢাকা পুলিশ এখন পশুর হাটে ব্যস্ত। এই সময় ও বর্ডার দিয়ে মেটেরিয়াল সরাবে। বর্ষা ব্যাকআপ টিম নিয়ে ঢাকা হ্যান্ডেল করছে। আমরা দুজন টেকনাফ যাচ্ছি।”
আরিয়ান জিপের ড্রাইভিং সিটে বসলেন। ওঁর কোমরের হোলস্টারে থাকা পয়েন্ট নাইন এমএম পিস্তলটা আজ ওঁর শরীরের একটা অংশ হয়ে গেছে। ইঞ্জিন গর্জে উঠল, জিপ ছুটে চলল অন্তহীন হাইওয়ের অন্ধকারে।
ভোর সাড়ে পাঁচটা। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ রোড।
একপাশে দিগন্ত বিস্তৃত নীলাভ সমুদ্রের গর্জন, অন্যপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাহাড়। শান্ত, নির্মল এই প্রকৃতির বুকেও এক ধরণের অদৃশ্য রণক্ষেত্রের গন্ধ পাচ্ছিলেন আরিয়ান। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া ওঁর মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওঁর চাউনিতে আজ এক জমাটবদ্ধ মনোযোগ।
কক্সবাজার পেরিয়ে মেরিন ড্রাইভের ২০ কিলোমিটার ভেতরে ইনানীর কাছাকাছি আসতেই আরিয়ানের জিপের জিপিএস ট্র্যাকারে একটা লাল বিন্দু দপদপ করে উঠল। রিয়াজের ফোন ট্র্যাক করে প্রদীপের লোকেশন লক করা হয়েছিল।
“স্যার, সামনে একটা সাদা রঙের হাইয়েস মাইক্রোবাস,” তানভীর ওঁর শটগানটা সিটের নিচ থেকে তুলে নিল। “স্পিড একশর ওপরে। ওরাই।”
আরিয়ান জিপের এক্সিলারেটরে চাপ দিলেন। প্রিডোর ভারী ইঞ্জিন গর্জে উঠে মেরিন ড্রাইভের মসৃণ পিচ ঢালা রাস্তা কাঁপিয়ে ছুটে চলল। মাইক্রোবাসটি বুঝতে পারল তারা ধাওয়ার মুখে পড়েছে। আচমকা জানালার কাঁচ গলে একটা সাব-মেশিনগানের নল বের হয়ে এল।
ধাঁই! ধড়াম!
একটা বুলেট জিপের উইন্ডশিল্ড ফুঁড়ে ভেতরে ঢুকতেই স্টিয়ারিং কলামের ভেতর থেকে সাদা রঙের এয়ারব্যাগগুলো প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ফুলে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ কাঁচের টুকরো আর পাউডারের ধোঁয়ায় আরিয়ানের চোখের সামনের দৃশ্যপট উধাও হয়ে গেল। কানের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো এক তীব্র আওয়াজে সাময়িকভাবে ওঁর কান দুটো সম্পূর্ণ তালা লেগে গেল, কেবল একটা একটানা ভোঁ-ভোঁ শব্দ ওঁর মগজে বাজতে লাগল।
আরিয়ান অবদমিত রিফ্লেক্সে শরীর নিচু করে এয়ারব্যাগের বাধা ঠেলে স্টিয়ারিং সোজা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু টায়ার ব্লাস্টের পর ভারী জিপটা তীব্র গতিতে রাস্তার ওপর অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্কিড করতে শুরু করল। চাকার নিচে পিচ পোড়া কালো ধোঁয়া আর ঘর্ষণের বিকট শব্দে গাড়িটা ডান-বামে দুলতে দুলতে কোনোমতে একটা বালির ঢিবির পাশে এসে থামল।
ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধের মাঝেই তানভীর লাথি মেরে জিপের দরজা খুলল। ওঁর কপাল কেটে রক্ত নামছে, কিন্তু সেদিকে ওঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে চিতার মতো বেগে ছুটে গেলেন উল্টে যাওয়া মাইক্রোবাসের দিকে, যা ব্রেক ফেল করে রাস্তার পাশে কাত হয়ে পড়েছিল।
মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে দুজন লোক টলতে টলতে বের হয়ে এল। ওনাদের একজনের হাতে চাইনিজ কুড়াল, আরেকজনের হাতে পয়েন্ট থ্রি-টু বোরের পিস্তল। পিস্তলধারী আরিয়ানের দিকে নিশানা সোজা করতেই আরিয়ানের পয়েন্ট নাইন এমএম গর্জে উঠল—ঠাস!
বুলেট পিস্তলধারীর ডান হাতের কবজি ফুঁড়ে বেরিয়ে গেল। আরিয়ানের নিখুঁত নিশানা অপরাধীকে এক নিমেষে বিকল করে দিল।
কিন্তু অন্যজন, যে ছোকরা কুখ্যাত লোকাল ফাইটার হিসেবে পরিচিত, সে চপার উঁচিয়ে তানভীরের দিকে তেড়ে এল। তানভীরের হাতে তখন শটগান রি-লোড করার সময় ছিলনা। সে এক ঝটকায় নিজের ভারী বন্দুকটা মাটিতে ফেলে দিয়ে খালি হাতে পজিশন নিল।
চপারটা তানভীরের ঘাড় লক্ষ্য করে নেমে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে তানভীর নিজের শরীরটাকে সামান্য বাঁকা করে ডজ করলেন। ওঁর ডান হাতের কনুইটা সাপের মতো নিখুঁত গতিতে গিয়ে আঘাত করল ওই অপরাধীর চোয়ালে।
অপরাধী ছিটকে পড়ার আগেই তানভীর ওঁর বা হাত দিয়ে ওর চপার ধরা হাতটা লক করলেন। একটা নিখুঁত রিস্ট-লক। মোচড় দিতেই চপারটা বালিতে পড়ে গেল। অপরাধী ওর অন্য হাত দিয়ে তানভীরের পেটে পাঞ্চ করার চেষ্টা করতেই তানভীর ওঁর চওড়া হাঁটু দিয়ে অপরাধীর পাঁজরে একটা মারাত্মক কাউন্টার থ্রাস্ট করলেন। ছেলেটি দম আটকে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তানভীর ওর পিঠের ওপর নিজের পুরো শরীরের ভর দিয়ে হাত দুটো পেছনে এনে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলেন। পুরো কমব্যাট ফাইটটা শেষ হতে সময় লেগেছে ঠিক সাত সেকেন্ড।
“তোদের দম বড্ড কম,” তানভীর ওঁর মুখের ওপর এক দলা রক্ত ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। ওঁর শার্টের হাতাটা ছিঁড়ে গেছে।
মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে একটা কালো ব্যাকপ্যাক টেনে বের করলেন আরিয়ান। চেইন খুলতেই দেখা গেল থরে থরে সাজানো জাল নোটের মাস্টার প্লেট, ডাইস আর প্রায় দুই কোটি টাকার প্রিন্ট করা সুপার-নোট।
গাড়ির পেছনের সিট থেকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বের করে আনা হলো মূল হোতা প্রদীপকে। প্রদীপের কপালে কাঁচের টুকরো লেগে রক্ত ঝরছে। সে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ঠাণ্ডা হাসি হাসল।
“পিবিআই আরিয়ান, তাই না?” প্রদীপ থুতু ফেলে বলল, ওঁর কণ্ঠে কোনো অপরাধবোধ ছিল না, ছিল এক ধরণের বিকৃত দর্শন। “টাকার এই সুনামি আপনি ঢাকতে পারবেন না স্যার। এই সিস্টেমটাই নষ্ট। সততার নাটক কইরা লাভ কী? বড় বড় অফিসাররা কোটি টাকা সরায়, আর আমরা একটু কাগজ ছাপাইলেই চোর? এই কোরবানি ঈদে মানুষ চেনা টাকা আর অচেনা টাকার তফাত বুঝতে বুঝতেই আমার খেলা শেষ হয়ে যাবে।”
আরিয়ান ধীর পায়ে প্রদীপের সামনে এলেন। ওঁর কণ্ঠস্বর এবার আরও বেশি গম্ভীর। তিনি প্রদীপের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, বাস্তবসম্মত গলায় বললেন:
“খেলাটা তুমি শুরু করেছিলে প্রদীপ, কিন্তু শেষ পাতাটা সবসময় আইনের হাতেই থাকে। আজ থেকে তোমার পৃথিবীর সীমানা জেলখানার চার দেওয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।”
ভোর ছয়টা।
মেরিন ড্রাইভের ওপর তখন ভোরের সোনালী রোদ এসে পড়েছে। সমুদ্রের নোনা বাতাস বারুদের গন্ধটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূর আকাশে। টেকনাফ মডেল থানার প্রিজন ভ্যান এসে অপরাধীদের তুলে নিয়ে গেল।
তানভীর জিপের বনেটে হাত রেখে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওঁর চোখের আদিম হিংস্রতা কমে এখন সেখানে এক ধরণের মানবিক ক্লান্তি নেমে এসেছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে ওঁর ছোট মেয়েটাকে একটা কল দিলেন।
“ভালো আছি রে মা... কাজ শেষ। কালই ঢাকা ফিরছি তোর কাছে,” তানভীর ফোনটা রাখলেন।
আরিয়ান জিপের ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন। ওঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপছে, বুকটা নিংড়ে একটা তীব্র অস্বস্তি ওঁর গলা পর্যন্ত উঠে আসছিল। ওঁর চশমার কাঁচের ওপারে চোখ দুটো জানালার বাইরে নিস্পৃহ চেয়ে রইল।
জিপটা স্টার্ট নিল। নীল সমুদ্র আর শান্ত পাহাড়কে ডান পাশে রেখে গাড়িটা আবার ঢাকার হাইওয়ের দিকে চলতে শুরু করল। আরিয়ান স্টিয়ারিং ঘোরালেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

