somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রইসুদ্দিনের পহেলা বৈশাখ!

১৩ ই এপ্রিল, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রইসুদ্দিনের মনমেজাজ বড়ই খারাপ। রতন আজ পত্রিকা নিয়ে আসেনি। দুপুরের ট্রেন চলে গেছে সেই কখন। রইসুদ্দিন এখনো স্টেশনেই বসে আছে। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ। তার বিবি তাকে বিরাট দেখে একটা ইলিশ মাছ নিয়ে যেতে বলেছে। পান্থার সাথে বিরাট ইলিশ খেয়ে তার বিবি পহেলা বৈশাখ পালন করবে। পান্থা-ইলিশ খাওয়ার সাথে পহেলা বৈশাখের কি সম্পর্ক রইসুদ্দিনের মাথায় সেটা ঢুকে না। তবে এই রীতি প্রচলনের পেছনে যে ব্যবসায়ীদের বিরাট হাত আছে এটা সে ভালোভাবেই আন্দাজ করতে পারে। এই ধূর্ত ব্যবসায়ীরা বৈশাখের অনেক আগে থেকেই ইলিশ মজুদ করার মাধ্যমে বাজারে একটা ইলিশ-সংকট তৈরি করে। এরপর বৈশাখের পূর্বমুহূর্তে ইলিশকে সোনার হরিণ বানিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয় সুড়সুড় করে। কই তাদের সময়ে তো পহেল বৈশাখে এসব ইলিশ ফিলিসের চাল ছিলো না। কিন্তু এসব কথা বিবিকে বলে কোন লাভ নেই। ইলিশ তাকে কিনে দিতেই হবে। পাশের বাড়ির কর্ত্রী যদি এসে বলে, ওমা! ভাবী আপনার ইলিশ কই? বিবির তো মানসম্মান ধূলায় মিশে যাবে। বিবি রাগে ক্ষোভে তল্পিতল্পা গুছিয়ে বাপের বাড়িও চলে যেতে পারে। ইলিশের এখন বিরাট ক্ষমতা। পরের দিন পত্রিকায় সংবাদ আসবে, পদ্মার ইলিশ ভাঙলো রইসুদ্দিনের সংসার। সংসার ভাঙনের কথা ভেবে মর্মাহত রইসুদ্দিন পত্রিকার আশা ছেড়ে স্টেশন থেকে টলতে টলতে মাছের বাজারে যায়। মাছের বাজারে বিশাল ভিড়। বিরাট একটা ইলিশ মাছ কিনতে তার পুরো পকেট খালি হয়ে যায়। মাছবিক্রেতা তার হাতে ইলিশ ধরিয়ে দিয়ে বলে, রইস ভাই আইজ আপনার বিরাট ভাইগ্য। আর একঘণ্টা পর ইলিশের বাজারে লালবাত্তি জ্বইলবে। জলের মতো টাকা ঢাইললেও ইলিশ পাওয়া যাইবে না।
রইসুদ্দিন মাছ বিক্রেতার নাম মনে করতে পারে না। তার মাথার মধ্যে পত্রিকার চিন্তা। মাছ বিক্রেতাকে টাকা দিয়ে মুখ ফেরাতেই দেখে রতন তার সামনে দাঁড়িয়ে। রতনের হাতের মধ্যে পত্রিকা। রইসুদ্দিনের মন ভালো হয়ে যায়। রতনকে বলে, কিরে স্টেশনে দেখলাম না কেন তোকে?
-- স্টেশন থাইকা নাইমাই মাছের বাজারে আইছিলাম।
-- মাছের বাজারে কেন?
-- মায়ে ইলিশ মাছ খাইতে চাইছিলো ম্যালা দিন থাইকা। কিইনা দিতে পারি নাই। আমাগো ওইহানে ইলিশের দাম ম্যালা টাকা। তাই ট্রেন থেকে নাইমা আপনাগো বাজারে আইছিলাম।
-- কিনতে পারলি?
-- না এইহানেও ম্যালা টাকা দাম চায়।
রতনের বিষণ্ণ মুখের দিকে চেয়ে রইসুদ্দিনের মন আবার খারাপ হয়ে যায়। বেচারা রতন! পহেলা বৈশাখ তার কাছে মুখ্য নয়। সে ইলিশ কিনতে চায় তার মাকে খুশি করার জন্য, অথচ ইলিশের রাজকীয় মূল্যের কারণে সে কিনতে পারছে না অনেকদিন যাবত। ধূর্ত ব্যবসায়ীদের ধরে থাপরাইতে মন চায় রইসুদ্দিনের। কি একটা অপসংস্কৃতির ঢেউ ছাড়িয়ে দিলো বাঙ্গালীর দিলের ভেতর। বাঙালী এখন ভাসছে আর ভাসছে। রইসুদ্দিনের পকেট এদিকে শূন্য। ‘আর কয়েকটা দিন গেলেই ইলিশের দাম তরতর করে নেমে যাবে। তখন কিনতে পারবি’-- রতনকে এই কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না সে। হাতের মাছটা রতনকে দিয়ে বলে, এটা নিয়ে যা।
রতন মাছ নিতে চায় না। রইসুদ্দিন তার হাতে জোর করে মাছটা ধরিয়ে দেয়। রতনের চোখে মুখে কেমন একটা আনন্দের দ্যুতি খেলা করে। রইসুদ্দিন সেটা দেখে অদ্ভুত রকমের একটা সুখ অনুভব করে। দু’জনে মাছের বাজার থেকে বের হয় হাঁটতে হাঁটতে। রইসুদ্দিন বলে, হ্যাঁরে রতন তুই বাংলা বারোটা মাসের নাম বলতে পারবি?
-- হ মায়ে আমারে শিখাইছে। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র ।
-- বাহ! শাবাশ।
রতনকে বিদায় দিয়ে রইসুদ্দিন বাড়ির পথ ধরে। স্বামীকে শূন্য হাতে ফিরতে দেখে রইসুদ্দিনের বিবি জরিনা বেগম বলে, ওমা খালি হাতে ক্যান? ইলিশ কই? পেপারও তো দেখি না। বাজারে যান নি?
রইসুদ্দিনের হুঁশ ফেরে এবার। রতনকে ইলিশ দেয়ার আনন্দে সে পেপার নিতেও ভুলে গেছে এবং ব্যাপারটা তার মনেই নেই। অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে যে এমন ঘোরলাগা আনন্দ কাজ করতে পারে রইসুদ্দিন সেটা উপলব্ধি করে ভেতরে ভেতরে মহাবিস্মিত হয়। সে তার বিবি জরিনা বেগমের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো তাকে প্রশ্ন করে, তুমি বাংলা বারোটা মাসের নাম বলতে পারবে?
জরিনা বেগম বিরক্ত হয়ে বলে, মাস তো চলে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের হিসাবে। বাংলা এতোগুলো মাসের নাম এখন কে মনে রাখছে?
রইসুদ্দিন বলে, তাহলে বৈশাখ মাসের কথাও ভুলে যাও। ইলিশের দাম চড়া।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১০:৫৯
১২টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×