০৫.০৭.১৯৯০
আরেকটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে শুনলাম। প্রথমটা পণ এত বেশি চেয়েছিল যে, হলো না। ছেলেটা দেখতে ছিল উত্তম কুমারের মতো। আমি আরেকটু সুশ্রী হলে হয়তো ওরা এ দিকটাতে একটু ছাড় দিত।
গত জন্মে বোধ হয় বড়লোকের অহংকারী, সুন্দরী মেয়ে ছিলাম। মানুষকে মানুষ বলে গণ্যই করতাম না। তার শাস্তি স্বরূপ এ জন্মে হয়েছি গরিবের কুশ্রী মেয়ে। আবার নাম রেখেছে চাঁদনী।
ধুর! আর লিখব না। মেজাজ খারাপ লাগছে। কাল আবার রিমির বিয়ে। সকাল সকাল উঠতে হবে।
০৭.০৭.১৯৯০
রিমিটা চলে গেল। কাল রাতে ও বাড়িতেই ছিলাম। দুই পক্ষের লোকেরা মিলে অনেক মজা হলো। ছেলের বাড়ির ওরা তো এখানে সম্পর্ক করতে চাইছিলই না। ছেলে রিমিকে না পেলে আত্মহত্যা করবে, এমন হুমকি দেয়ায় রাজি হলো। কত্ত বড়লোক ওরা । পণও দেয়া লাগেনি। অবশ্য প্রেমের বিয়েতে ওসব লাগেও না।
সবার কপালে কি সব হয়? বাবা নেই, দাদার সংসারে কড়াকড়ির মধ্যে মানুষ। যেখানে পান থেকে চুন খসলেই খবর খারাপ হয়ে যায়, সেখানে ওসব ভাবাও যায় না।
কিন্তু বয়সের দোষ বলে একটা কথা আছে। পিসতুত ভাই ঠাট্টার ছলে অনেকবার আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করত, সে আমাকে ভালোবাসে। আমি সায় না দিলেও তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম। বোধোদয় সেদিন হলো, যেদিন সে পিশির পছন্দের মেয়ে ঘরে নিয়ে এলো। আর আনবেই বা না কেন? আমি তো আর সেই কপাল নিয়ে জন্মইনি যে, আমার জন্য কেউ রিমির বর যেমন করল অমন করবে? যা হোক, নিয়তিকে মেনে নিতেই হবে। কাল নাকি পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে।
০৮.৭. ১৯৯০
আমার বিয়ে মোটামুটি ঠিক। সকালে দেখতে এসেছিল। কথাবার্তায় সবই মিলেছে। দাদা ছেলের প্রশংসায় যতই পঞ্চমুখ হন না কেন, আমার জন্য যে কোনো রাজপুত্র আসবে না, তা আগে থেকেই জানতাম। তবে সকাল থেকেই কেমন অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করছিল। ইশ! মশা খুব বিরক্ত করছে। আজ আর লিখতে মুড পাচ্ছি না।
১৩.৭.১৯৯০
অনেক দিন পর ডায়রী ধরলাম। আমার বিয়ের কাজ ঝড়ের হতিতে এগোচ্ছে। বাড়িতে অনেক লোক। নিকটাত্মীয়রা মোটামুটি সবাই চলে এসছে। তাই নিরিবিলি লেখা হচ্ছিল না। আমিই যে পাত্রী!
পিশতুতো বোন ঝুমু এসেছিল বরকে নিয়ে। গয়নায় গা- ভর্তি ছিল ওর। জামাইবাবু ওর সব অবদার পূরণ করে। করবেই বা না কেন? প্রেমের বিয়ে এমনই হয়। আর আমারটা তো হবে একটা চুক্তি মাত্র। ওই ছেলে কি আমার সুখ-দুঃখের কথা ভাববে? ঝুমুকে দেখার পর নিজেকে নতুন করে অসুখী মনে হচ্ছিল। ষোল তারিখে আমার বিয়ে। পাত্র, অমিত দাস। সেনাবাহিনীতে চাকুরী করে। ছেলের মা-বাবা নেই। কাকার কছে মানুষ। সেই কাকা অসুস্থ থাকায় বিয়েতে এত তাড়াহুড়া । তিনি ভাতিজার বউ দেখে মরতে চান। বউদি ডাকছে। কাল-পরশুর মধ্যেই সব আত্মীয়স্বজন এসে যাবে। আর বোধ হয় লেখা হবে না।
১৮.০৭.১৯৯০
না । আমি শ্বশুরবাড়িতে না, এ বাড়িতেই। এমন অবস্থায় লিখতে পারার কথা নয়। কলিজাটা ছিড়ে যাচ্ছিল। কাউকে কিছু বলতে পারছিলাম না। লিখে যদি একটু হালকা হওয়া যায়।
একটু দেরিতে বরযাত্রী এলো। তাও মাত্র পনেরোজনের মতো। শুভদৃষ্টির সময় তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মুখ এমন ফ্যাকাশে, যেন কেউ তাকে জোর করে বন্দুক ধরে বিয়ে করাতে নিয়ে এসেছে। সাত পাক ঘোরা হলেই দাদাকে বলল, তার অতি দরকারি কাজ আছে, যেতে হবে। না গেলে চাকুরী থাকবে না।
তখন আবার দেশে গন্ডগোল চলছিল। দাদা এত সাধল, তাও তারা কেউই থাকল না। আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, আসি।
দাদাকে বলল, আমাকে খুব তাড়াতাড়ি একদিন এসে নিয়ে যাবে।
জানতাম, জীবন খুব প্রেমময় হবে না। তাই বলে এতটা অবহেলা? আর লিখতে পারছি না। মাথাটা ঘুরছে।
১৯.৭.১৯৯০
চোখে পানি সামলাতে পারছি না আমি। এও কি সম্ভব? সকালে দুটি চিঠি এলো। একটা আমার আরেকটা দাদার নামে। প্রেরক অমিত দাস। চিঠিটা নিয়ে আমার ঘরে রেখে দিলাম। পড়তে ইচ্ছা করছিল না।
একটু পর দেখলাম, দাদা তৈরি হচ্ছে আমার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার জন্য। বৌদি আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, বড় ভাল কপাল নিয়ে জন্মেছিস।
আমি কিছু বুঝলাম না। ঘরে এসে চিঠিটা খুললাম।
চাঁদনী,
জানি তোমার মন ভালো নেই। সে দায় আমার। আসলে আমার এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। বরযাত্রী নিয়ে রওনা হব, এমন সময় বাড়িওয়ালার বাসার টেলিফোনে খবর এলো কাকা মারা গেছেন। তুমি তো জানো, আমি এতিম । তার কাছেই মানুষ। তার বড় সাধ ছিল আমার বউ দেখার। সে কথা ভাবতেই তোমার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। তখন যদি আমি না যেতাম তবে তুমি হতে লগ্নভ্রষ্টা। আর আমাদের মা-ঠাকুমারা এখানো সব দায় মেয়েদের কাধেই দেন। আমার জন্য তোমার এই পরিণতি কখনোই মেনে নিতে পারছিলাম না। তাই আত্মীয়দের মৃত্যু সংবাদ না দিয়ে বেশি সংকটাপন্ন অবস্থার কথা বলে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। পরে আমি কয়েকজন পড়শি আর বন্ধূদের নিয়ে তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে হয়তো দাদাকে সত্যটা বলতে পারতাম। কিন্তু কথাটা একবার আত্নীয় মহলে ফাস হয়ে গেলে তোমার অলক্ষ্মী অপবাদ দিতে কেউ থামত না। এর চেয়েও বড় কথা,কাকা নেই- এ কথা একবার মুখ দিয়ে বের করলে আমি আর স্থির থাকতে পারতাম না।
আমি বোধ হয় এলোমেলো কি সব লিখছি। আসলে সব দায়িত্ব আমার কাধে। তাই তাড়াহুড়া করে শেষ করতে হচ্ছে। আর হ্যাঁ, আমি আমার লক্ষ্মী বউটাকে খুব তাড়াতাড়ি নিতে আসব। তুমি ভালো থেকো।
তোমার অমিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১৭ সকাল ১১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



