somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রেমের অপর নাম দেহভোগ হওয়া উচিত নয়......

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রেমের অপর নাম দেহভোগ হওয়া উচিত নয়......
আমাদের বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক একদিন গল্প প্রসঙ্গে তার জীবনের একমাত্র এবং প্রথম প্রেম সম্পর্কে আমাদেরকে বলছিলেন । তিনি বললেন, “যখন আমি ডিগ্রী পড়ি সেসময় আমাদের গ্রামের একটি মেয়েকে আমরা খুব ভাল লাগত। কিন্তু' আমি কখনও তাকে এই ভাললাগার কথা মুখে বলতে পারিনি। যখন তাকে দেখতাম তখন বুকের ভেতর কেমন যেন করত ঠিক বোঝাতে পারব না। মাঝে মাঝে বাড়ি যেতাম আর তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এসব দেখে মেয়েটি একদিন বুঝল যে, আমি তাকে পছন্দ করি। এর পর মেয়েটি নিজে থেকেই আমাকে বলল যে, ”তুমি একটা ছোট চাকরি হলেও নাও, তোমার সাথে দরকার হলে গাছতলায় থাকব, কিন্তু কিছু খেয়েত বাচঁতে হবে।” মেয়েটির কথার উপর ভিত্তি করে চাকরি খুঁজতে খুঁজতে তিন চার বছর কেটে গেল আমার। চাকরি পেলাম না। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেল অন্যত্র। এখনও কখনও তার সাথে দেখা হয়ে গেলে সেই অতীতের মত চেয়েই থাকি।”
যিনি উপরোক্ত কথাগুলো বলছিলেন তার বয়স বর্তমানে একান্ন বায়ান্ন হবে। তিনি যখন যুবক ছিলেন তখনকার সময়ে সমাজে নারী পুরুষের প্রেম ভালবাসা প্রকাশে সর্বত্র এরকম সুস্থতা ছিল, দেহটা পায়নি বলে হাহাকার ছিল না। তখন কেউ কারও প্রেমে পড়লে পরস্পরের কাছাকাছি বাস করার একটিই উপায় তারা খুঁজত-সেটি হল সামাজিকভাবে বিয়ে অথবা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে। মানুষের সমাজে আদিম সমাজ ও দাসমালিক সমাজের অবসানের পর থেকে শত শত বছর নারীপুরুষের প্রেমের মানেটা অনেক লম্বা ছিল। ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর সব দেশেই মানুষকে প্রেম বলতে ত্যাগ, ধৈর্য, দায়িত্ব বোধ ইত্যাদি বোঝানো হচ্ছিল অনেকদিন ধরে এবং বেশীরভাগ মানুষও তাই বুঝত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ঘটনা নিয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার একটি ছবি “দ্যা ব্যালাড অভ এ সোলজার” দু’জন তরুণ তরুণীর প্রেমের গল্প আছে এই ছবিতে। তরুণ বয়সে নারী পুরুষের পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া এবং পরস্পরকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুলতা কত যে নির্মল সুন্দর হতে পারে তা সেখানে দেখার মত। এছাড়া আমরা অনেকেই সিনড্রেলার গল্প জানি। সিনড্রেলা কোন এক রাতে রাজার বাড়ীতে রাজপুত্রের সাথে নাচের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। রাজপুত্রের তাকে খুব ভাল লাগে। কিন্তু' রাজপুত্র তার ঠিকানা জানত না। সিনড্রেলাকে তার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নাচের অনুষ্ঠান ছেড়ে তাড়াতাড়ি করে চলে যেতে হল। রাজবাড়ীতে পড়ে থাকে তার এক পায়ের একটি জুতো। রাজপুত্র সেই জুতো নিয়ে সারা রাজ্যময় পাগলের মত ঘুরে বেড়াতে থাকে। কোন মেয়ের পায়ে সে জুতো লাগছিলনা।একদিন একটি মেয়ের পায়ে জুতোটি লেগে যায়। আর রাজপুত্র তখন তার মনের মানুষকে জীবন সঙ্গী করে ফেলে।
সিলড্রেলার গল্পটিতে নারীপুষের প্রেমের যে নির্মলতার খোঁজ পাওয়া যায় তা সমাজে একদিন ছিল। আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। একটা সময় ছিল যখন বাস্তব জীবন, গল্প, সিনেমা, নাটকে নারীপুরুষের প্রেম, ভালবাসা, বিয়ের ক্ষেত্রে পবিত্রতা, নির্মলতা এসবের একটা মূল্য ছিল। বাস্তব জীবনের নির্মলতা তখন গল্প, সিনেমায় প্রতিফলিত হত আর গল্প, সিনেমার নির্মলতা বাস্তব জীবনে দেখা যেত। বর্তমানে তরুণ, তরুণী, যুবক, যুবতী বা যে কোন বয়সের নারীপুরুষ প্রেমে পড়লেই ছলে বলে কৌশলে বা স্বাভাবিক রুচিতে পরস্পরের দেহটাকে খুব মিস করে এবং দেহ ভোগটা মোটামোটি শেষ হয়ে গেলে যে কোন একপক্ষ দু’চারটা নেগেটিভ অজুহাত দেখিয়ে পরস্পরের নিকট থেকে দূরে সরে যায় এবং অন্য একটি্ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আবার কোন একপক্ষ যখন অন্যপক্ষের প্রস্তাবে সাড়া না দেয় তখন এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, হত্যা ইত্যাদি বিষয় গুলো আজকাল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।
আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বাংলাদেশে একটি মাত্র চ্যানেল ছিল যাতে সব সময় মানবিক মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে আলোচলা, নাটক, গান নাচ, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ইত্যাদি চলতে থাকত। সেসব অনুষ্ঠানে রং ঢং অনেক কম থাকত, মৌলিকতা বেশী ছিল। বর্তমানে শত শত চ্যানেল দেখা, ইন্টারনেটের ব্যবহার মানুষের জীবনের একঘেঁয়েমিকে কাটাতে সহায়তা করছে ঠিকই, কিন্তু' বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তা অসুস্থ, অশ্লীল পথে। দেখা যায় যে, সামান্য একটি সাক্ষাতকার অনুষ্ঠানেও মেয়েরা এমন পোশাক পরে হাজির হয় যা দেখে শিশু, বৃদ্ধ, যুবক সকলেই সভ্য সমাজে পেশাকের প্রয়োজনের কথা ভুলে যাবে। আজকাল সবকিছুতে নগ্নতা ও দেহটাকে পণ্য হিসেবে দামী প্রমাণ করার প্রবণতা সর্বত্র। মানুষের যোগ্যতার মূল্যায়ন কম। যার ফলে নারীপুরুষ পরস্পরের দেহটাকে যতটা চিনে পরস্পরের মনকে ততটা চিনেনা, চেনার তাগিদও বোধ করেনা । মানুয়ের প্রতি মানুষের মায়া, ভালবাসা, দায়িত্ববোধ সবকিছু আজ বিলুপ্ত প্রায়। অনেক মানুষ হিংস্র জানোয়ারের মত শরীরের ক্ষুধা মেটানোকেই জীবনের মূল্য লক্ষ করে ফেলেছে।
সভ্যতা বিকাশের পর মানুষের সমাজে নারী পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সুস্থ যত নিয়ম কানুন সৃষ্টি হয়েছে তা সবটাই এখন বাহ্যিক লোক দেখানো বিষয় হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থার ফলে সবচেয়ে বেশী বিপদে পড়েছে মেয়েরা। যৌন জীবনে নিয়ন্ত্রণহীন পুরুষদেরকে আমরা জংলী জানোয়ার বলে গালি দিচ্ছি, কখনও কখনও তারা শাস্তি পাচ্ছে, কিন্তু মেয়েরা কোথায় যাবে? সারা পৃথিবীতে অগণিত গণিকালয় আছে। কিন্তু' ভদ্র পরিবার, সভ্য সমাজের মেয়েরা পুরুষদের দ্বারা শারিরীকভাবে প্রায়শ: ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবসময় তারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটায়। তাদের সব সময় ধর্ষিত হওয়ার ভয়, প্রতারিত হওয়ার ভয়। তিনমাস বয়সী কন্যা শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সামাজিক সম্পর্কের পবিত্রতা সবখানে মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। নারীদেরকে এত সতর্ক হয়ে জীবন যাপন করতে হয় যে জীবনটাকে তাদের আর জীবন মনে হয়না।
সমাজ বা রাষ্ট্রের উর্ধ্বতন স্তরে যারা আছেন তারা আন্তরিক ভাবে চাইলে এসব সমস্যা দূর করার ব্যবস্থা নিতে পারেন। শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় বড় কবি সাহিত্যিকদের রচনাবলী যুক্ত করা এবং বাধ্যতামূলক পাঠ্য বিষয় হিসেবে ভাল গল্প, উপন্যাস, নাটক, ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রচার মাধ্যম গুলোর সস্তা, ব্যবসায়ীক কৌশল বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন থাকা উচিত। নারীপুরুষের সম্পর্ককে সুশৃঙ্খল ভাবে উপভোগ করার জন্য পারিবারিক, সামাজিক সুস্থ', রুচিশীল মূল্যবোধের পাশাপাশি বিজ্ঞান সম্মত শিক্ষা চালু থাকতে হবে। শিশু বয়স থেকে নারী পুরুষের পোশাক পরিচ্ছদ, আচার আচরণ এবং মেলামেশার ক্ষেত্রে সুস্থ সামাজিক বোধের চর্চা পরিবার, সমাজ, শিক্ষাঙ্গনে থাকতে হবে। শিশু,কিশোর, তরুণ,যুবক, বৃদ্ধসহ সব বয়সের নারীপুরুষের মধ্যে সমাজে একসাথে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার একটি স্বপ্ন সৃষ্টি করতে হবে- যে স্বপ্ন আমাদের সবসময় ভাল কিছু করতে ব্যস্ত রাখবে। অবাধ যৌনাচার মানুষের দেহকেই শুধু অসুস্থ করে তুলে না, মানুষের মনকেও বিকলাঙ্গ, বিকৃত করে তোলে। সমাজকে করে তোলে অসভ্য, দায়িত্বহীন, অমানবিক। তাই দেহভোগ আর প্রেম এই দুটো বিষয়ের পার্থক্য আমাদের সকলের বুঝতে হবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে বোঝাতে হবে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল এই মহান ব্যক্তিরা তাদের সাহিত্যে প্রেমকে যেভাবে দেখিয়েছেন সেভাবে করে যদি আমরা বুঝতে পারি তবে আমাদের মন ভাবনা-চিন্তায় বড় হবে এবং নারী পুরুষ সকলে মিলে আমরা সমাজে সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারব।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:২৭
৭টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

তাবলিগে গিয়ে যা শিখলাম না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

আমি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি, তখন আমার কয়েকজন বন্ধু তাবলিগ করত। তাবলিগের প্রতি আমার কখনোই আগ্রহ ছিল না। তবে ওরা নিজেরা রান্না করত, আর আমি রান্না করতে পছন্দ করি। তাই একদিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×