somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রণয়ের অপেক্ষা

৩০ শে মে, ২০১৬ বিকাল ৫:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখন আমি ক্লাশ টেনে পড়তাম। খুব দূরন্তপনার বয়স ছিল সেটা। দূরন্তপনার মধ্যে সবচাইতে বেশি যে কাজটা করতে পছন্দ করতাম, স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে বা ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই দল বেঁধে সাইকেল নিয়ে এখানে-ওখানে ঘুড়ে বেড়াতে। সে সময়টাতে কত জায়গায় যে ঘুড়ে বেড়িয়েছি, তার কোন ইয়াত্তা নেই।

এমনই একদিন টিফিন পিরিয়ডে সাইকেল নিয়ে আমাদের পাশের এলাকায় ঘুড়তে যাই। সেখান থেকে ফেরার পথে একটা হাই স্কুল পরে। আমরা যখন সে পথ ধরে ফিরছিলাম, সে স্কুলের এক মেয়ে আমাদের ভেংচি কাটে। আমি সে দিকে তাকানোর জন্য যখন সাইকেলটা একটু স্লো করি, তখন আমার পিছনে থাকা বন্ধুর সাইকেলটা আমাকে ধাক্কা দেয় আর আমরা দু'জনই পরে গিয়ে খুব ব্যাথা পাই। মেয়েটা তা দেখে এক ভৌ-দৌড় দিয়ে স্কুলের ভিতরে চলে যায়।

তার কিছুদিন পর আবার সে দিকে ঘুড়তে যাই। ফেরার পথে সেদিনও সেই মেয়েটার সাথে দেখা হয়। তবে সেদিন আর ভেংচি কাটা মুখে নয়, হাত দিয়ে ইশারা দেয় সাইকেল থামানোর জন্য। ভেবেছিলাম সেদিনের ঘটনার জন্য মেয়েটাকে ইচ্ছেমত বকবো, কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে সাইকেল থামিয়ে কাছে যাওয়ার পর মেয়েটা সেদিনের ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, খুব বিনম্র ভাবে মাথা নিঁচু করে ক্ষমা চেয়েছিল মেয়েটি। লজ্জাবনত সে মুখ দেখে আর বকা দেয়ার ইচ্ছে জাগে নি। তখন তার নাম জিজ্ঞেস করার পর বলল জান্নাত, ক্লাশ এইটে পড়ে।

সেদিন থেকেই মেয়েটার প্রতি যেন কি এক আকর্ষণ বোধ করতাম। প্রায়ই ওদের স্কুলের সামনে যেতাম। মাঝে মাঝে দেখা হতো, কেমন আছো, লেখাপড়ার কি খবর টুকটাক কথা হতো। এভাবে কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন টিফিনে ওদের স্কুলের সামনে যেতাম, কথা বলতাম।

এভাবে চলতে চলতে একটা সময় আমরা দু'জন দু'জনের বেস্ট ফ্রেন্ডে বলতে গেলে তার চাইতেও বেশি কিছু হয়ে যাই। এক জন আরেক জনকে না দেখলে যেন একদিনও থাকতে পারতাম না।

আমার স্কুল ছিল এক শিফটের। তাই ছুটি দিত ৪ টা বাজে আর জান্নাতের স্কুল দু'শিফটের হওয়ার কারনে ছুটি হতো ৫ টায়। ছুটির পর প্রাইভেট পড়ে বাসায় না গিয়ে সাইকেল নিয়ে জান্নাতের স্কুলে চলে যেতাম। তারপর দু'জন একসাথে পায়ে হেঁটে গল্প করতে করতে ওকে ওর বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে তারপর আমি বাসায় ফিরতাম। ওদের স্কুলের খুব কাছেই নদী ছিলো। মাঝে মাঝে ছুটির পর বাসায় না ফিরে দু'জন নদীর পাড়ে বসে গল্প করতাম তারপর সূর্য যখন দিগন্ত রেখা ছুঁই ছুঁই করতো, তখন বাসায় ফিরতাম।

জান্নাত বেলী ফুল খুব পছন্দ করতো। কিন্তু ওদের নিজেদের কোন বেলী ফুল গাছ ছিলো না। একদিন ও পাশের বাসার গাছ থেকে ফুল চুরি করতে যায় আমাকে মালা গেঁথে দেয়ার জন্য। কিন্তু ফুল চুরির সময় পাশের বাড়ির আন্টি ওকে দেখে ফেলে খুব বকাঝকা করে। ও আমাকে সেই ঘটনা বলছিল আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল। ওর চোখের চল মুঁছে দিয়ে বলেছিলাম "কাল তোমাকে একটা বেলী চারা এনে দিবো, তুমি তখন নিজের গাছের ফুল দিয়ে আমাকে মালা গেথে দিও"। একথা শুনে ওর মুখে অদ্ভুত সুন্দর এক হাসি ফুঁটে ওঠে আর তারপর আমার গাল টানতে থাকে, যেটা ও খুশি হলে সব সময় করতো।

পরদিন বিকেলে ওর সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় নার্সারি থেকে একটা বেলী ফুল চারা কিনি। জানতাম ও খুব খুশি হবে। মনের মধ্যে বারবার তখন ওর সেই হাস্যেজ্জল মুখটাই ভেসে উঠছিল। ভাবতে ভাবতে এক হাতে সাইকেল চালাচ্ছিলাম, অন্য হাতে ওর জন্য কেনা যত্নের সে বেলী চারা। কিছুতে যেন দেরী সইতে পারছিলাম না। তাই খুব তাড়াহুড়ো করে যাচ্ছিলাম।

হঠাৎ করেই সব ভাবনা যেন কোথায় মিলিয়ে গেল। সব কিছু যেন মূহুর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর আবার ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান হলো। কি হলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি সাদা শার্টটা লাল হয়ে গিয়েছে, রাস্তা থেকে ছিটকে পাশে চলে এসেছি, সাইকেলটা দুমড়ে-মুচড়ে অনেক দূরে পরে আছে, আর বেলী চারাটা রাস্তার অপর পাশে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তারপর আর কিছুই জানি না।

যতদূর মনে পরে, ১২ দিন পর যখন জ্ঞান ফিরে, আমি তখন প্রথম সেই বেলী চারাটাই খুঁজেছিলাম। কিন্তু ক্ষণিক পরে সম্বিত ফিরে পেলাম। আশপাশের পরিবেশ, আর মাথায়, হাতে আর বুকের বাম পাশে ব্যান্ডেজ দেখে মনে পড়লো আমার সাথে এর মাঝে কি হয়েছে। জান্নাত দেখতে আসেনি জিজ্ঞেস করতে সবাই চুপ হয়ে গেল। সবাই চুপ কেন চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতেও কেউ উত্তর দিচ্ছিল না। জোড় করে হাসপাতালের বেড ছেড়ে যখন উঠে যাবো, যা শুনলাম তা আমায় দ্বিতীয় বারের মত অজ্ঞান করে দিলো।

আমার এক্সিডেন্টের খবর জান্নাতের কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে ও হাসপাতালে আসে। আমি এতটা গুরুতর ভাবে আহত ছিলাম যে, ডাক্তারেরা বলে দিয়েছিলেন আমি হয়তো আর বাঁচবো না। সে কথাটা জান্নাতের কানেও চলে যায়। আর তারপর বিন্দুমাত্র দেরী করে ও হাসপাতালের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যা করার আগে ও একটা চিরকুট রেখে যায়। তাতে লেখা ছিলো। "সব সময় আমি তোমার অপেক্ষায় থাকতাম, কখন আসবে তুমি। আজ কেন তুমি আমার আগে চলে গিয়ে আমার অপেক্ষায় থাকবে? তার চাইতে আমিই আগে চলে যাচ্ছি, জানি তুমি আসবে। অপেক্ষায় থাকবো"।

আজ আমি আর সাইকেল চালাই না, স্কুল থেকে যখন ছেলে গুলো সাইকেল নিয়ে বের হয়, দৌড়ে গিয়ে বলি "বেলী চারা নিয়েছ, বেলী চারা? নিয়ে যেও কিন্তু। ও তোমার অপেক্ষায় থাকবে"। ওদের কেউ কেউ আমায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়! তুচ্ছ-তাচ্ছল্য করে, হাসাহাসি করে। কারন, আমি যে আজ একটা বদ্ধ পাগল...

(এ গল্পটা লেখার পিছে কোন শিক্ষামূলক উদ্দ্যশ্যে ছিল না। তবে লেখা শেষ করে যখন নিজেই নিজের গল্প পড়ছিলাম, তখন একটা শিক্ষনীয় বিষয় পেলাম।

জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। এ জীবন অনেক মূল্যবান, একবার গেলে আর কখনও ফিরে আসবে না। জান্নাত আমার জন্য আত্মহত্যা করলেও আমি কিন্তু আত্মহত্যা করার সুযোগ পাইনি। কারন জান্নাতের মৃত্যু সংবাদ আমার সব কিছুকে বিস্মৃত করে দেয়। আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখো, প্রার্থনা করো, সে নিশ্চয়ই তোমাকে তোমার সেরাটা দিবেন। তবে সে জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। আত্মহত্যা কোন সমাধানের পথ নয়। সেদিন যদি জান্নাত আত্মহত্যা না করতো, তবে আজও আমরা হাত ধরে পথ চলতে পারতাম।)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১৬ বিকাল ৫:০২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×