somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি ভালো হইয়া গেছি

২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


লেখতে বসলে লেখা আসে না। আর গাড়িতে চড়ে দূরে কোথাও যাওয়ার সময় মাথার মধ্যে লেখার অভিনব থিমগুলো এসে ভীড় করে। অবসর মন সেগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একসময় গভীর চিন্তার সমুদ্রে তলিয়ে যায়। যেহেতু চলন্ত গাড়িতে বসে ভাবলেও লেখা যায় না সেহেতু ভাবনাগুলো ক্রমশ জট পাকাতে থাকে। চিন্তার জট বলে কথা! বড় কঠিন জট। এ জট সহজে ছুটে না। একসময় গাড়ির পথ ফুরায় চিন্তা ফুরায় না। ঘুরেফিরে আসে- চেইন রিয়েকশানের মতো। অস্থির লাগতে শুরু করে। চোখেমুখে বিষাদের ছায়া পড়ে। দূরের যাত্রাকে চিন্তাজট থেকে মুক্ত রাখতে বাইরের দৃশ্যগুলো দেখি। কাঁচের জানালা দিয়ে দ্রুত পেছন দিকে হারিয়ে যাওয়া ধানক্ষেত, পাহাড় বন-বনানী, শ্যমল শোভার নিবিড় বসতি অন্তর্দৃষ্টিকেও নাড়া দিয়ে যায়। কিন্তু সবসময় দৃশ্যেও কাজ হয় না। বিশেষ করে রাতের জার্নিতে তো দৃশ্যের সাথে দৃষ্টিযোগের সুযোগই থাকে না। আসলে জার্নির ক্লান্তি কিংবা চিন্তাজট থেকে মুক্তির মোক্ষম উপায় হচ্ছে মিউজিক শোনা। গানের সুর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি দূরীভূত করে দেহমনে আনন্দের স্ফুরন তুলতে পারে।মিউজিকের দেহমনে উদ্যম জাগনিয়া একটা শক্তি আছে। এসব ভেবে আজকাল লং জার্নিতে গান শোনি। আমার ফোনে প্রিয় গানগুলো লোড করা থাকে। কোথাও যাওয়ার সময় হেডফোন সঙ্গে নিতে ভুল করি না। এমনিতে ভাড়ায় চালিত কার-লাইটেসগুলোতে মিউজিকের অভাব হয় না। না চাইতেই জনপ্রিয় হিন্দী গান বেজে উঠে। ড্রাইভারগুলো এ ব্যাপারে খুব সচেতন। গাড়ীর হেডলাইট ভেঙ্গে গেলেও সারাই করবে না কিন্তু মিউজিক বক্স একটু বিগড়ালে সেটা সঙ্গে সঙ্গে সরাই করাই ফেলবে। কারণ মিউজিক প্লেয়ার ছাড়া গাড়িকে রুচিবান যাত্রীরা পছন্দ করে না। তাছাড়া বিয়ে বাড়ীর সাজুগুজু করা মেয়েদের পরিবহনের সময় দু একটা হট টাইপ গান বাজাতে না পারলে তো ড্রাইভারদের প্রেসটিজই পাংচার! কোনো কোনো ড্রাইভার আবার গানবাজনা পছন্দ করেন না। তারা বাদ্যবাজনার পরিবর্তে সুরের নামে বেসুরা কন্ঠের ওয়াজ কিংবা ইসলামী সংগীত বাজান। গাড়িতে চলার পথে মাঝে মধ্যে এরকম ওয়াজপ্রেমীদের দেখা পাওয়া যায়। কেউ পূন্যকাজ মনে করে তন্ময় হয়ে ওয়াজ শুনেন আবার ভিরুদের কেউ কেউ জার্নির বিপদ বালা মসিবত এড়ানোর জন্যেও শোনেন। সে যাই হোক, কিছুদিন আগে ভাড়ায় চালিত লাইটেসে করে বেশ দূরে একটা যায়গায় যাচ্ছিলাম। ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে আমি বসা। পিছনে অপরিচিত আরো পাঁচজন যাত্রী। অনেকদুর যাওয়ার পর হটাৎ পেছন থেকে কেউ একজন ড্রাইভারকে মিউজিক প্লেয়ার অন করার জন্য অনুরোধ করলেন। ভারী রকমের ধার্মিক টাইপ ড্রাইভার মুখে গাম্ভীর্য ধরে রেখে সোজা বললেন, ভাই আমি গান বাজনার মত পাপকাজ পছন্দ করি না! রাতের বেলা দুরের পথে যাচ্ছি বিপদ মুসিবত হতে পারে। গান বাদ দিয়ে মনে মনে আল্লাহর কথা স্মরন করেন। পেছন বসা লোকটাও নাছোড়বান্ধা। ইসলাম ধর্মে মিউজিকের বিধান নিয়ে সে এক বিরাট তর্ক বাধিয়ে দিলো। এক পর্যায়ে শুরু হল ড্রাইভার এবং যাত্রীর মধ্যে তুমুল বাক-বিতন্ডা । আমি কোনো কথা না বলে তর্ক উপভোগ করতে থাকি । একজন আরেকজনকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করতে শুরু করার একপর্যায় আরেক যাত্রী দুজনকে থামিয়ে দিলেন। খানিকক্ষণ পর ড্রাইভার বললেন, ভাই আপনাদের মতো বয়স থাকতে আমি খুব বেশী গানবাজনার ভক্ত ছিলাম। তাবলীগের হুজুরদের মেহনতে এখন আমি ভালা হইয়া গেছি। আপনারা বয়সে তরুন কিছু বুঝতে পারছেন না এখন বাধ্যবাজনা ভালো লাগছে। দিন এমন যাবে না। বয়স হলে একদিন ঠিকই বুঝতে পারবেন। আপনারাও আমার মতো বাদ্যবাজনা গান ইত্যাদি বেহুদা জিনিষ অপছন্দ করবেন । তখন আর গান বাজনা চেয়ে পরজনমের শান্তির চিন্তায় মশগুল হবেন। কথাগুলো শোনার পর পেছনের যাত্রীর থেকে আর কোনো প্রতিউত্তর শোনা গেলো না। আমরা সবাই গাড়িতে চুপ করে বসে থাকলাম। আরো প্রায় আধঘন্টা পর আমার সাথে ড্রাইভারের আলাপ জমে উঠলো । আলাপের বিষয় হচ্ছে আজকালকার যুগের গান। ড্রাইভার বড় আক্ষেপ করে বললেন ভাই আজকালকার গানে আওয়াজ আর বাধ্য বাজনাই সব। গানের কথা কিছুই না। গানে এখন আর সারগর্ভ কথা লেখা হয় না । দেখেন আজ দেশে কতো গায়ক, কত ব্যান্ড হইছে। কিন্তু কেউ কি হাসনরাজা কিংবা আমির উদ্দিনের মতো কোনো গান লেখতে পারছে? পারে নাই। আমির উদ্দিন হাসন রাজা কেউ শিক্ষিত ছিলো না। তবু তাদের গানগুলোতে সারগর্ভ কথা আছে। একটু আগে গান নিয়ে ঝগড়া বাধানো ড্রাইভারের হঠাৎ গানের স্বপক্ষে কমপ্লিমেন্টের উদ্দেশ্য না বুঝেও কথায় সায় দেই। আর সেই সুযোগে মোবাইল ফোনে হাসন রাজার একটা গান প্লে করে বসি -কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে....
রঙ্গে রঙিলা কানাই.....
কিছুক্ষণ গান চলার পর দেখি ড্রাইভার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলেন। গাড়ি এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। আমরা নীরবে গানের মধ্যে ডুবে যাই। হঠাৎ শোনি ড্রাইভার গুনগুন করে গাইছেন- 'স্বর্গপূরী ছাইড়া কানাই আইলা এই ভূবনে...'

সুযোগ পেয়ে পেছনের ঐ যাত্রী তখন ড্রাইভারকে কটাক্ষ করে বলে উঠলো ভাই আপনি সত্যি ভালো হইয়া গেছেন? এমন কথা শোনে সুরের ভুবনে তন্ময় হওয়া ড্রাইভার যেন চেতনা ফিরে পেল। বেশ উচ্চ স্বরে বলে উঠলো, ভাই আমি সত্যিই ভালো হইয়া গেছি। আমি এখন আগের মতো গান শুনি না। ওয়াজ শুনি! ওয়াজের কথাগুলো শুনলে শান্তি পাই।

ড্রাইভার বেচারা ওয়াজ শুনুক আর গান শুনুক সেটা যার তার রুচির ব্যাপার। আমি গান অনুরাগী মানুষ। গানে প্রাণের স্পর্শ পাই। গাড়িতে কিংবা বাড়িতে যেখানেই হোক প্রিয় গানের সূর আমার ভালো লাগে। আমি তন্ময় হয়ে শুনি। তবে গাড়িতে চড়লে গান শোনার আগ্রহটা একটু বেড়ে যায়। কেউ গানের পরিবর্তে ওয়াজ বাজালেও কিছু করার না থাকলে কি করা ওয়াজই শোনি। ওয়াজীর কথা আমার মাথায় না ডুকলেও সুর ঠিকই মাথায় জোর করে হলেও ডুকানোর ব্যবস্থা আর কী। আমার মনে হয় সুরের ভুবন রহস্যময়তায় ভরা এক অন্য ভুবন। যত কঠিন হৃদয়ের মানুষই হোক না কেন সুর তার মনকে নাড়িয়ে দিতে পারে। মোমের মতো গলিয়ে দিতো পারে। আগুনের মতো জ্বালিয়ে দিতে পারে। সেই সুর কোথায় লাগছে সেটা বিষয় না। বুঝা না বুঝার ব্যাপারও না। সুরের প্রাণস্পন্দন জাগানিয়া একটা ধর্ম আছে যা দেশকাল জাতি ধর্ম বর্ণ কিংবা ভালো মন্দেরও উর্ধে। এইজন্যই হয়তো যে পাকিস্তান নাম শুনলে ভেতরে বাহিরে ঘৃণা জাগ্রত হয় সেই পাকিস্তানের নুশরাত ফতেহ আলী খান, রাহাত ফতেহ আলী খান কিংবা আবিদা পারভিন শুনলে প্রান উদ্বেলিত না হয়ে পারে না। এটাই সুরের সীমানাহীন ভুবন!!!

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:১০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিকাশ নূরা এবং হিরো আলমকে যারা প্রধানমন্ত্রী ভাবতেন ;)

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



একজন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা থাকার চাইতেও জরুরী বিষয় হচ্ছে তার অন্তর্দৃষ্টি থাকা। অন্তর্দৃষ্টি, অন্তরচক্ষু বা জ্ঞানচক্ষু সম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে কখনোই ধোঁকা দেওয়া বা ধোঁকায় ফেলানো সম্ভব নয় কারণ এরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×