somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হতভাগ্যের গল্প

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১২:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম। সেদিন সকালে নীলিমা এসে আমাকে সতেরটা ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলো। বলেছিলো, সবগুলো ওষুধ পানিতে গুলিয়ে একবারে খেতে। অথবা আমি ইচ্ছে করলে মুড়ির মতো চিবিয়ে চিবিয়েও ওষুধগুলো খেতে পারি।
হাত থেকে ওষুধগুলো নিয়ে আমি অবাক হয়ে ওঁর চোখের দিকে তাঁকিয়ে ছিলাম। সেই চোখে আমার জন্য বিন্দুমাত্র মমতা ছিলো না।
.
অথচ অবস্থাটা ঠিক এইরকম ছিলো না। বছরখানেক আগেও আমরা একসাথে ন্যাশনাল পার্কে হেটে বেড়াতাম। পার্কের সবুজ ঘাসের উপর বসে হয়তো কোনো কোনোদিন চকবার আইসক্রিম খেতাম। দশ টাকার ফুচকা একটা প্লেটে নিয়ে দুজনে ভাগাভাগি করে খেতাম।
.
নীলিমা ছিলো সিটি কলেজের ছাত্রী। তাঁর রুপ ছিলো। কিছু গুণও ছিলো। আমার মতো বেকার ছাত্রের কখনও অটো রিকসার ভাড়া নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। কলেজ ছুটি হলে আমরা এক অটোতে উঠে বসতাম। যাত্রার সময়টুকু জমিয়ে গল্প করতাম। আর অটো থেকে নামার সময়, নীলিমা হাসি হাসি মুখ করে বলতো, "দোস্ত, তুই যা। তোর ভাড়াটা আমি দিয়ে দিবো নি।"
.
কলেজে আমি একেবারেই বখাটে টাইপের ছাত্র ছিলাম। কলেজে উঠেই ধারনা হয়েছিলো- একেবারে খ্যাত টাইপের ছেলেরাই কলেজে লেখাপড়া করতে আসে। স্মার্ট ছেলেরা থাকবে লেখাপড়ার উর্ধ্বে।
যার ফলাফলও হাতে নাতে পেয়েছিলাম। কলেজের মিডটার্ম পরীক্ষায় আমি চার সাবজেক্টে ফেল করলাম।
.
রেজাল্টের ব্যাপারটা কিভাবে যেনো বাবার কানে গেলো। বাবার সাথে আমার সম্পর্ক এমনিতেই ভালো ছিলো না। এবারে বাবা একেবারেই আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন।
.
প্রতিটি মেয়ের মধ্যেই একেকটি মা লুকিয়ে আছে। এজন্যই হয়তো বখাটে ছেলেদের প্রতি মেয়েদের একটু অন্যরকম দরদ থাকে। আমার এই দুরবস্থায় দুইজন নারী সবসময় আমার পাশে ছিলো। একজন আমার নিজের মা, অন্যজন নীলিমা রহমান।
.
বাবার কাছ থেকে আমার হাত খরচ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিলো। মা মাঝেমাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে কিছু টাকা পয়সা দিতো। কিন্তু তা ছিলো একেবারেই নগণ্য। রোজ চা, সিগারেটের মতো সামান্য খরচ গুলিও আমি নীলিমার ঘাড়ের উপর দিয়ে চালিয়ে দিতাম।
.
এরকম অবস্থায় ভয়ে ভয়ে একদিন আমি নীলিমাকে প্রোপোজ করে বসলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে নীলিমা মুচকি হাসি দিলো। সে হাসির অর্থ একমাত্র যারা ভালোবাসতে জানে, তারাই বোঝে।
.
সবকিছুই ঠিকঠাক ভাবে চলছিলো। হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটলো।
আমাদের কলেজে প্রায়ই "ক্ষমতা আর টাকাপয়সা"র ভাগ নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি হতো। সেদিন আমি আর নীলিমা ক্যাম্পাসের পাশেই একটা দোকানে বসে চা খাচ্ছি। হঠাৎ শুনি ক্যাম্পাসের ভিতরে শোরগোল হচ্ছে।
ব্যাপারটা জানতে আমি এগিয়ে গেলাম। নীলিমা পেছন থেকে আমার শার্ট টেনে ধরলো। কাতর স্বরে আমাকে ভিতরে যেতে নিষেধ করলো। আমি ওঁর হাত থেকে শার্ট ছাড়িয়ে নিয়ে ভিতরে চলে গেলাম।
কখন যে মারামারিতে নিজেও জড়িয়ে পড়লাম বুঝতেই পারলাম না। হঠাৎ একটি কাতর স্বর শুনে চমকে উঠলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি নীলিমা মাথায় হাত দিয়ে একটি দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে। ওঁর হাতের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে লাল রক্ত পড়ছে।
.
হাসপাতালে আমি অনেকবারই নীলিমাকে দেখতে গিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই ওঁ আমার সাথে দেখা করে নি।
সুস্থ হবার পরও নীলিমা আর কলেজে আসে নি। ফোন করলেও ওঁ রিসিভ করে না।
.
একদিন এক বন্ধুর মুখে শুনলাম নীলিমার নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমার তখন মাথাখারাপ অবস্থা। অনেক কষ্টে ফোনে ওঁর সাথে যোগাযোগ করলাম। বললাম, অন্তত একবার আমার সাথে দেখা করতে। না হলে আমি আত্মহত্যা করবো।
.
সেদিন সকালে নীলিমা এসেছিলো। হাতে সতেরটি ঘুমের ট্যাবলেট। ওষুধগুলো আমাকে দিয়ে আত্মহত্যার জন্য অনুরোধ করেছিলো।
.
বিকেলে আমি আমাদের হিস্ট্রি স্যারের সাথে দেখা করলাম। স্যারকে বললাম, "স্যার, আমি আত্মহত্যা করতে চাই।"
স্যার অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর স্বভাবসুলভ গম্ভীরমুখে আমাকে ইংরেজিতে একটা লম্বা লেকচার দিলেন। যার সারমর্ম এই যে......
.
"পৃথিবীতে নিজের জীবনটাই সবচেয়ে মুল্যবান বস্তু। প্রেম, ভালোবাসা এগুলো জীবনের অংশমাত্র। জীবনের একটা অংশের জন্য পুরো জীবনটা নষ্ট করে ফেলা বোকামি। আত্মহত্যা করার আগে একবার কি আমার নিজের মায়ের মুখখানার কথা মনে পড়ে না? কিংবা সেই বাবার মুখটা যে কিনা গায়ের রক্ত পানি করে আমাদের জন্যে অর্থ উপার্জন করছেন!"
.
ঐদিনই আমি উপলব্ধি করলাম, পৃথিবীতে আমার বাবাকেই আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।
.
পকেট থেকে সতেরটি ঘুমের ওষুধ বের করে স্যারের হাতে দিলাম। স্যার ওগুলি গ্রহণ করলেন না। মুচকি হেসে আমাকেই ফিরিয়ে দিলেন।
.
মাঝেমাঝে যখন খুববেশি অনিদ্রা রোগে ভুগি, তখন একটা করে ওষুধ খাই। আমি একরাতের জন্য শান্তির ঘুম চাই। চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চাই না।

সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১২:৩৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×