somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ ছাড়ে কেন?

০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হিন্দুরা বাংলাদেশ ত্যাগ করছে এ নতুন নয়। সেই ছোট বেলা থেকেই এটা দেখে এসেছি। এমনকি আমাদের মফস্বল শহরের কেনা বাড়িটাও এক হিন্দুর কাছ থেকে কেনা। তখন আমার বয়স মাত্র ছয় কি সাত। আমার বাবার কি অদ্ভুত শখ চাপল ঢাকার বাড়ি বিক্রি করে তিনি নিজ জেলা ঝালকাঠি শহরে বাড়ি কিনবেন। যাই হোক এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় তার বাড়ির কাছেই ঘর সমেত একটা বাড়ি পাওয়া গেল যা তখন অর্ধ লক্ষ টাকায় আমার বাবা কিনলেন। আমি সত্তরের দশকের শেষের দিকের কথা বলছি।
বাড়ি রেজিস্ট্রি হওয়ার পরে ঐ হিন্দু পরিবারটি রাতের কোন এক সময় বিদায় নেয়। আর আমার মা-বাবা আমার ছোট বোনটাকে নিয়ে রাত বারোটার দিকে ঘরে উঠলেন। পরের দিন সকালে আমাদের প্রতিবেশী জানতে পারল যে তার কাকা-কাকি মা সব সম্পত্তি বিক্রি করে চলে গেছেন। কেন যে তারা ঐ সময় ওভাবে ভারতে চলে গেলেন আজো সেই রহস্য তাদের আত্মীয়েরা বের করতে পারেননি। উল্লেখ্য যে আমাদের সেই প্রতিবেশীরা কিন্তু আজো তাদের ভিটে মাটিতেই বসবাস করছেন।

এরপরেও আমাদের চোখের সামনে থেকে অনেক হিন্দু পরিবারকে দেখলাম ভারতে চলে যেতে। তাদের আত্মীয় যারা এখনো এ দেশে থাকেন তারা মাঝে মাঝে ভারতে যান এবং এসে বলেন ওরা এখানেই বেশি ভাল ছিলেন। এর সত্যতা স্বাভাবিক বিচারেই মেলে। কেননা এমন কিছু অর্থ প্রতিপত্তি সম্পন্ন মানুষও ভারতে পারি জমিয়েছেন যারা আমাদের কাছেও অনেক সম্মানিত ছিলেন। আর এটা স্বীকার করতেও বাধা নেই মানুষ হিসেবেও তারা ভাল মানুষ ছিলেন।

নিজের এলাকা বলেই শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়েই বলতে পারি এই লোকগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের খেয়ালেই দেশ ছেড়েছেন কোন রকম চাপে নয়। এর কারণ সম্পর্কে স্থানীয় হিন্দুদের সাথে কথা বলে যেটা বুঝেছি তা হল। প্রথমত তারা তাদের মুল দেশ বা প্রিয় দেশ হিসেবে প্রথমেই ভারতকে বেছে নিয়েছে। তাদের মাথায় যেটা কাজ করে তা হল ভারত হিন্দু রাষ্ট্র। কাজেই যেহেতু তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী সেহেতু ওটাই তাদের আসল ঠিকানা।
দ্বিতীয়ত- এ দেশে থাকলে যদি কোনদিন কোন সমস্যা হয়ে যায়। অর্থাৎ এক ধরনের শঙ্কা তাদের মধ্যে সর্বদাই কাজ করে। অথচ তার পেছনে নেই যৌক্তিক কোন কারণ। আমি মূলত যারা ইতিমধ্যেই দেশান্তরি হয়েছেন তাদের কথা বলছি।

আমি যে মফঃস্বল শহরটির কথা বলছি তা ছিল এক সময় হিন্দু অধ্যুষিত। যদিও এখন আর তা নয়। তথাপি কোনদিনই আমাদের ওখানে হিন্দু মুসলমান বিবাদ হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, আমরা আমাদের প্রতিবেশী হিন্দু পরিবারের পূজার প্রসাদ সব সময়ই পেতাম। তাদের পূজা দেখতে না গেলে তারা রাগ করত। আমাদের বন্ধুদেরও বেশিরভাগই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। যে কারণে আমাদের বাসায় দুই ঈদে তাদের জন্য আলাদা করে মুরগীর মাংস রান্না করা হত। যাতে তারা ঈদ উৎসবে অংশ নিতে পারে। যে ব্যবস্থা বর্তমানেও চালু আছে।
আমার বাসা আর আমাদের পেছনের হিন্দু পরিবারের বাসার মাঝে একটি মাত্র দেয়াল যার ওপাশে তাদের পারিবারিক মন্দির আর এপাশে আমি প্রতিবছর গরু কোরবানি দেই। আমাদের মাঝে কখনোই এ নিয়ে বিরোধ হয়নি।

তার মানে এই নয় যে, সারা বাংলাদেশের চিত্রটাই এমন। অবশ্যই এর উল্টোটাও আছে। তবে তাও বিশেষ কিছু এলাকা ভেদে। যা সমগ্র বাংলাদেশের চিত্র নয়। কাজেই এটা বলাই যায়, শুধু যে চাপে পরেই হিন্দুরা এ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয় এ কথাটাও বোধ হয় সর্বৈব সঠিক নয়। ভারতে চলে যাওয়ার পেছনে তাদের মানসিক একটা তাড়নাও লক্ষ করা যায়। আসলে যার কোন অর্থই নেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ২৩ অক্টোবর ২০১৫ বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন দেশ ছেরে যাচ্ছে তা খোজার চেষ্টা করেছে। তারা এর কারণ খুঁজতে গোপালগঞ্জের উলপুর নামক এক সময়কার শতভাগ হিন্দু অধ্যুষিত একটি গ্রামকে বেছে নিয়েছিল। এখন যেখানে বেশিরভাগই মুসলমান।
কারণ হিসেবে তারা যেটা পেয়েছে তা হল। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাষায়, “কারণ... হয়তো এখানে তাদের স্বাধীনতা নেই। সেটাই মনে করে।”
ঐ প্রতিবেদনেই আরও কিছু স্থানীয় মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়। তার মধ্যে একজন গ্রামের বাজারে কাঁচি হাতে চুল কাটায় ব্যস্ত ক্ষৌরকার নিখিল সরকার। গত ৪০ বছর ধরে এটাই তার পেশা। তিনি বলছিলেন, মূলত নিরাপত্তার কথা ভেবেই অনেকেই ভারতে পাড়ি জমানোর একটা পথ খোলা রাখেন।
“মনে করেন যে এই পাশেও আছে, আবার হয়তো ঐ পাশেও (ভারতে) ছেলে-পেলে পাঠায়ে দেছে, ভাই-বেরাদার পাঠায়ে দেছে। অহনে এখানে যারা আছে, তারা শান্তিতে নাই, একটা দোটানার মধ্যে আছে।”
উলপুর দক্ষিণপাড়ার রায় বাড়িতে বসে এই সমস্যা নিয়ে কথা হচ্ছিল কয়েকজন গৃহিণীর সঙ্গে।
“ভবিষ্যতে চলে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। ছেলে-মেয়ে বড় হচ্ছে। এদের ছেলে-মেয়েদের আর এদেশে রাখার ইচ্ছে নাই”, বলছিলেন একজন।
“আমারও ঐ একই কথা। আমাগো দিন তো চলি গেল। কিন্তু আমাগো যে নাতি-পুতি, এগো ভবিষ্যৎ তো এই জায়গায় হবি না,” বললেন তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক জন।

উল্লেখিত প্রতিবেদনেও এমন কিছু বের হয়ে আসেনি যাতে আমরা বলতে পারি যে হিন্দুরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। বরং এটাই বলা যায় যে তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। স্ব ইচ্ছায় দেশ ছেড়ে যাওয়া আর দেশ ছাড়তে বাধ্য করা নিশ্চয়ই এক কথা নয়।
তারপরেও যদি দেশের কোথাও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এ ধরনের সমস্যায় পরেন তারা বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের শরনাপন্ন হতে পারেন। দেশে বিচার ব্যবস্থা আছে তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। তাদের সাহস যোগাতে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা কি কোন ভুমিকা গ্রহন করেছেন। ঐক্য পরিষদের নেতারা সর্বদাই বলেন বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার হার কমছে। এটা তো অনস্বীকার্য। কেননা “১৯৫১ সালে যে আদমশুমারি ছিল তাতে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২২ শতাংশ। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে আসলো ১৪ শতাংশে। আর সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে।”
কিন্তু কেন এভাবে তারা চলে যাচ্ছেন সে ব্যাপারে তারা সুস্পষ্ট করে কিছু বলেন না। আর দেশান্তরী হওয়া বন্ধেও তাদের কোন পদক্ষেপ চোখে পরে না। যে নিরাপত্তা হীনতার কথা তারা বলেন এটাতে মনে হয় এক ধরনের জুজু’র ভয় তাদের পেয়ে বসেছে। যে ভয়টা কাটানোর দায়িত্বও আমাদের সকলের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এ ব্যাপারে কোন পক্ষ থেকেই কোন কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এটা বোঝানো দরকার যে দেশ ছাড়াটা কোন সমাধান নয়। বরং মাতৃভূমিতে তাদের অধিকার আদায় করে নিতে শক্ত অবস্থান নেয়াটাই বেশি জরুরী।
মুসলমানদের পাশাপাশি এ দেশটা একইভাবে তাদেরও এই বোধটা যেমন তাদের মাঝে উন্মেষ ঘটা দরকার তেমনি আমরা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ রয়েছি তাঁদেরও দায়িত্ব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখা। তাদের বিপদে আপদে পাশে দাঁড়ানো।

[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৫ সকাল ১১:০৯
২৩টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে ইসলামপন্থা বনাম গণতন্ত্র: মানুষ যখন নাগরিক থেকে অনুসারী হয়ে উঠছে!

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৪৩


কিছুদিন আগেও আমরা বলতাম, "দয়া করে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেশাবেন না"। সরল এই কথাটির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বোধ ছিল - ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনীতি এক জিনিস নয়। গত দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার হিসেবে আপনার স্ট্র্যাটেজি কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬



গত আড়াই দিনে, অর্থাৎ, ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:১০-তে ব্লগার ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা থেকে শুরু, এরপর থেকে আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, সময় বিকাল ৪টা ৪২... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো প্রয়োজন নেই! আপনি কি মনে করেন?

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৪



বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে শিক্ষাগত যোগ্যতাবিহীন বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে স্থানীয় সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা 'ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর লক্ষ্য অনুযায়ী আধুনিকায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টোকাই থেকে হিরো"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৬



টোকাই থেকে হিরো! বাংলা ছবির  অশ্লীল যুগে মুক্তি পাওয়া এক ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রেক্ষাপটে অনেকটা এইরকম - বস্তিতে বেড়ে উঠা; মানুষের লাথি- উষ্টা খেয়ে বড় হওয়া এক টোকাই (ছবির... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুখরিত জীবনের চলার পথে, ব্লগের মুখরিত দিন

লিখেছেন মেহবুবা, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


ব্লগ স্কুল, মজারু
ছোটন চলে স্কুলেতে বই শ্লেট হাতে ,
বদরুল ভাই কাঁদছে ভীষন যাবে সাথে সাথে,
চান্কু হল লক্ষ্মীছাড়া পান্কু হয়ে ঘোরে ,
চিটি যাবে সবার আগে উঠল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×