somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতিকথা; শাহ্‌ আলম স্যার

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ সকাল ১১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বরাবরই আমি পড়ালেখায় ভীষণ অমনোযোগী ছিলাম। যত উপরের ক্লাসে উঠেছি অমনোযোগিতার মাত্রা কেবলই বেড়েছে। তার প্রধান কারণ ছিল গল্পের বইয়ের নেশা। পাঠ্য বইয়ের মলাট খুলে গল্পের বইয়ে লাগাতাম। তারপর রাত ভর পরতাম। এমন ও হয়েছে বিদ্যুৎ চলে গেছে, মোমের আলোয় পরতে পরতে ঘুমিয়ে পরেছি। চুল পুরে গেছে সে আগুনে। এমনই নেশা ছিল। ফলাফল যা হবার তাই। টেনে টুনে পাশ।
এর মধ্যে আবার অঙ্কে আমি বরাবরই কাঁচা। বইয়ের নেশায় তা আর কখনই পাকতে পারল না। শেষ পর্যন্ত এসএসসি টেস্ট পরীক্ষার খাতা দেখে শাহ আলম স্যার বললেন তুই তো অংকে ফেল করবি। আমার বাসায় আশিস, আমি দেখিয়ে দেব। তখন পরীক্ষার মাস কয়েক বাকি। আম্মার পিড়াপীড়িতে স্যারের কাছে গেলাম। স্যার কি যত্নে করে শেখালেন! শুধু অংক না, স্যার সবগুলো বিষয়ের খোঁজ নিতেন।
কোনদিন কোণ ছাত্র তাকে জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি কত টাকা দিতে হবে। এমনকি কোনদিন কোণ ছাত্র তার হাতে টাকাও দিতে পারে নি। আমরা ব্যাচের সবাই টাকা এক জায়গায় করে ভাবির কাছে অথবা তার ছোট্ট ছেলেটার হাতে দিয়ে দৌড়ে পালাতাম। স্যার জানতেও পারতেন না কে কত দিল। তার সে আগ্রহও ছিল না।
অদ্ভুত একজন মানুষ, আমরা অবাক হয়ে দেখতাম অনেক বড় ভাইয়ারা হঠাত হঠাত স্যারের সাথে দেখা করতে আসতেন, স্যার ভারী গলায় এক একজনকে অদ্ভুত অদ্ভুত সব নামে ডাকতেন তারা ভীষণ খুশি হত। স্যার জানতে চাইতেন,
এখানে কি?
স্যার কিছু না, এই গাধার দল কিছু না হলে ওদের পড়ার ডিস্টার্ব করছিস ক্যান? এক লাথি খাবি।
শুনে ভাইয়ারা আমোদে আহ্লাদিত হতেন, কেউ কেউ এগিয়ে এসে বলতেন, স্যার একটা লাথি দিবেন! এমনভাবে বলতেন যেন স্যারের লাত্থি বহু আকাঙ্ক্ষিত কিছু।
স্যার হাতের লাঠিটা নিয়ে তাড়া করতেন। আর ভাইয়ারা সব দৌড়ে পালাত। ফিরে আসতেন ঠোটের কোনে এক অপার্থিব হাসি ছড়িয়ে। স্যারের সেই হাসিমুখটা চোখ বুঝলে এখনো স্পষ্ট দেখতে পাই।
স্যার থাকতেন স্কুল হোস্টেলের নিচতলায়। খুব সাধারণ জীবন যাপন ছিল এই অসাধারণ মানুষটির। গোলাপ খুব ভালবাসতেন, নিজ হাতে জানালার পাশে লাগিয়েছিলেন একটা গোলাপ চাড়া। একদিন স্যারের কাছে পড়তে গিয়ে দেখি বিশাল এক গোলাপ ফুটেছে। পড়া শেষে মাথায় ভূত চাপল ফুলটি চুরি করব। চুরিও করলাম কিন্তু পালাতে গিয়ে পরে গেলাম, হাতে ভীষণ চোট পেলাম।
আব্বু হাসপাতালে নিয়ে গেলেন ডাক্তার তার বন্ধু মানুষ, দেখে জানতে চাইলেন ওর না পরীক্ষা?
হ্যাঁ।
তাহলে?
কি তাহলে?
হাতে তো ফ্র্যাকচার হয়েছে, ব্যান্ডেজ করতে হবে।
কি বল? পনের দিন পর ওর পরীক্ষা।
কিচ্ছু করার নেই, আমি ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি, পরীক্ষার আগে একবার দেখিয়ে যেও। আল্লাহ ভরসা।
পরের দিন হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে স্যারের কাছে গেলাম।
এই হারামি তোর হাতে কি হয়েছে?
স্যার পরে গিয়েছিলাম (কেঁদেই ফেললাম)
আয় আমার কাছে বলে কাছে টেনে নিলেন। সম্পূর্ণ অপরিচিত কণ্ঠে বললেন, ফুল ছিঁড়েছিস ঠিক আছে দৌড়ে পালাতে গেলি ক্যান?
আমি তখন লজ্জায়, দুঃখে মরে যাই অবস্থা। পিঠে সন্তান স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ভয় নেই কিচ্ছু হবে না, মন দিয়ে লেখাপড়া কর। নদীর ঘাটে (নামটা মনে নেই) বাক্সে একশ টাকা দিস।
স্যার কি বলব?
গাধা তোর কিছু বলতে হবে না।
অদ্ভুত বিষয়, পরীক্ষার তখনও পাঁচ দিন বাকি। আমার পীড়াপীড়িতে আব্বু ডাক্তার আংকেলকে দিয়ে জোর করে ব্যান্ডেজ খোলালেন।
আব্বু এবং ডাক্তার সাহেব যার পর নাই অবাক হলেন, আমার হাত সম্পূর্ণ ঠিক।
এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলাম, আমি প্রথম বিভাগ পেলাম।
মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যেটা ব্যাখ্যাতীত। কিন্তু শাহ্‌ আলম স্যার ব্যখ্যাতীত নন। একজন মহান মানুষ। স্যারকে শ্রদ্ধা করতাম, আজো করি।
কিছুদিন আগে বাড়িতে গিয়ে স্যারের সাথে দেখা হল। পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। আশ্চর্য স্যার লজ্জা পেলেন। কেন লজ্জা পেলেন? এখনকার সময়ে কি এটা ব্যকডেটেড? হবে হয়ত কিন্তু স্যার যে শ্রদ্ধা যে ভালবাসা তার ছাত্রদের কাছ থেকে পেয়েছেন সে অর্জনটা তো তারই।
ঝালকাঠি সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের আমি ছাত্র, তৃতীয় শ্রেণী থেকে দশম এর মধ্যে কতজন স্যারের কাছে পরেছি এখনো বেশ কজনের কথা মনে পরে। দু একজনের সাথে দু একবার দেখাও হয়েছে। সালাম জানিয়েছি কুশল বিনিময় করেছি। কিন্তু শাহ্‌ আলম স্যারের মত আর কোণ স্যার অন্তরের অন্তঃস্থলে এতটা গভীর করে আসন পেতে বসতে পারেন নি।
স্যার আপনি যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।

[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ দুপুর ১২:০৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত একজন নারীসহ দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে বোঝা গেল যে, পররাষ্ট্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৭ বিনীত, অবনত বৃক্ষ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৯

পথে যেতে চোখে পড়লো নুয়ে পড়া বৃক্ষের শাখাগুলো। মনে হলো স্রষ্টার কাছে সে যেন নিবেদিত প্রার্থনায় অবনত। সব অহংকার, সব আত্মগরিমা, কৃতিত্বের ভার সে ধীরে ধীরে ঝরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তর....দ্রুত বাস্তবায়ন হোক।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তর....

বর্তমান সচিবালয়ের আয়তনঃ ঢাকার আবদুল গনি রোড- সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয় প্রায় ৩২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে মাত্র ১৭ লাখ বর্গফুট যায়গায় অপরিকল্পিত ভবন নির্মিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কোন ইসলাম পালন করছি! কাদের ফলো করছি!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

খোদা ও নবীজীকে অবমাননা করলে অর্থাৎ ধর্মীয় অবমাননা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে, এমন আয়াত কোরআনে পেলাম না!
অনেক খুঁজলাম.........আমি পাই নাই। আপনি পেয়েছেন কি?



পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে যে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ঢাকা দক্ষিণের নতুন সমীকরণ: রাজনৈতিক খেলায় ইশরাক কোথায়?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২

রাজনীতির মাঠে অতি-উৎসাহ কখনো কখনো যে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াতে পারে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে, দলবল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×