
আগের পর্ব
মেরাজের মন আজ খুব ভাল। লম্পটদের শায়েস্তা করে খুব মজা পায় সে। আজকাল ঢাকা শহরে প্রায় বৃষ্টি হয়। রাস্তার পাশে কাদা জমে। দুষ্ট কাউকে পেলেই সে সিএনজি চালিয়ে দেয় কাদার উপর। কাদা ছিটকে গায়ে পড়ে। ভিক্টিম খিস্তি খেউরি করে। মেরাজ এক্সিলারেটর চেপে টান মারে আর হো হো করে হাসে। ঢাকা শহরে এটাই তার নির্মল বিনোদন।
লম্বু বাটুকে শায়েস্তা করার পড়ে সে আরো অনেকের গায়ে কাদা ছিটিয়েছে। গত মাসে একবার কি হল চা খেতে বসেছে এমন সময় এক ভুঁড়িওয়ালা নেতাজি এলেন। প্রায় থাবড়া দিয়ে মেরাজ কে ঠেলে দিয়ে দোকানদার কে বললেন,
" অই লাল্টু চা দে।"
পিচ্চি লাল্টুঃ জব্বার ভাই, জী ভাই এক্ষুনি দিতেছি। কোন চা খাবেন ভাই? লাল চা না দুধ চা?"
জব্বার আরাম করে চায়ের দোকানের খাটে বসে সিগ্রেট ধরায়। বড় করে টান দেয়। আয়েশি গলায় পাশের চ্যালাকে বলে, ওই পানখা, দেখ হালার পুতে কয় কি? আমি কি চা খামু সে জানে না! জানে না সে! হালার পুতের চান্দিতে কইশা একটা চটকানা মার। শালার পুতে জব্বার ভাই কি খায় জানে না, দোকান দিছে।"
জব্বার ভাইরা পান খায়, চা খায়। দোকানীরা উনাদের পানের জর্দার ব্রান্ড, কাচা শুকনা শুপাড়ি, চিনি কম বেশীর হিসাব রাখে। হিসাবে ভুল করে গালাগালি যেন না খাইতে হয়। অনেক সময় দোকানে ভাংচুর করে। তখন ওদের আবার ডিমোশন হয়ে যায়। দোকান থেকে আবার ফুটপাথে অথবা রাস্তায় রাস্তায় পান সিগ্রেট বিক্রি করা লাগে। আহারে বেচারা লাল্টু। কয় বছর আর বয়স পোলাডার। খুব বেশি হইলে পনের বছর হবে। এই বয়েসে মেরাজ স্কুলে যাইত। আর এই পোলাটা জীবিকার সন্ধানে নামছে। অদ্ভুত একটা টান খেয়াল করে মেরাজ। লাল্টুর জন্য ওর কিছু করার ইচ্ছা করে। কিন্তু কি করবে বুঝতে পারে না। ইচ্ছা করল ঠাটিয়ে একটা চড় লাগাবে। কিন্তু জব্বারের দলবল ভারী। একা কিছুতেই পারবে না। জব্বাররের চা খাওয়া শেষ হল।
"লাল্টু চায়ের দাম খাতায় লিখে দিস।" বলেই জব্বু মাস্তান চায়ের দোকান থেকে বাহির হয়ে গেল। যাবার সময় পাতি মাস্তান পানখা লাল্টুর মাথায় থাবড়া দিয়ে শাসিয়ে গেল।
"বেশি বাড়িস না, সাইজ হইয়া যাবি হালার পুত।"
লাল্টু প্রায় কেঁদেই দিল। আহারে পোলাডা। সারা দিনে কতই না ইনকাম হয়। খুব বেশি হলে হবে দুইশ টাকা। ওটা তো জব্বারের এক প্যাকেট গুললিভ সিগ্রেটের দামের সমান। আর এই টাকাটার জন্য লাল্টুরা সংগ্রাম করে। মেরাজ জব্বারের খবর করেই ছাড়বে। প্রতিজ্ঞা করে সেদিনই। এরপর সে প্রায়ই রাস্তায় খুঁজে ওদের।
আজ মেরাজ গুলশানের ডিসিসি মার্কেট এসেছে। এক মেয়ে আর তার মা এসেছে। সিএনজিটা সে মার্কেটের পাশে রাখে। মহিলা ও মেয়ে তাকে রিজার্ভ করে এনেছে ধানমন্ডি থেকে। ধানমন্ডির কাস্টমাররা ভালই। পয়সা নিয়ে ভেজাল করে না। যারা ভেজাল করে না তাদের সে অনেক মহৎ ভাবে। আজকাল সিএনজি ড্রাইভারদের কেউ দেখতে পারে না। ভাড়া বেশি চায়। কেউ কেউ মিটারে চুরি করে। কেঊ কেঊ তো মিটারে যেতে চায় না। মিটারে গেলেও এমন রোড দিয়ে নিয়ে যাবে যেদিক দিয়ে জ্যাম বেশি। মেরাজ এমন নয়। ধানমন্ডি থেকে গুলশানে সে আধাঘন্টায় মেয়ে ও মহিলাকে নিয়ে এসেছে ও।
মেরাজ একটা চায়ের দোকানে বসে চা খায়। আজকাল চায়ে কেমন একটা তেতো স্বাদ। কড়া কড়া লাগে। চায়ের সেই স্নিগ্ধ ভাবটা নেই আর। চায়ের দোকানদাররা ড্যানিশ মেশায়। ঘটঘট করে চামচ দিয়ে নেড়ে দেয়। দুধ চায়ে বেশি চিনি দিয়ে এই ক্যাচাল ফিনিশ করে। দুধ চা নাম না দিয়ে এর নাম দেওয়া উচিত ড্যানিশ চা। চা শেষ করে মেরাজ। মেয়ে ও মা আসছে।
মেরাজ এগিয়ে যায়। মহিলার হাতে অনেক বাজার। বাজারের ব্যাগে কি জিনিস অনুমান করা যাচ্ছে না।
ম্যাডাম আমাকে দেন, আমি তুলে দেই।" বলে সব সিএনজির পিছনে তুলে দেয়। ওজন বুঝে মনে হয় সব লোহা লক্কড়। ডিসিসি মার্কেটে লোহার তৈরী অনেক সুন্দর সুন্দর ঘর সাজানোর জিনিস পাওয়া যায়। একবার সে দাম জিজ্ঞাস করে বুঝেছে অনেক দামি এগুলা।
জিনিসপাতি তুলেই মেরাজ সিএনজি স্টার্ট দেয়। মা মেয়ে সিএনজিতে উঠে। মেরাজ সিএনজি ডানে ঘুরিয়ে রোডে নেয়। মহাখালীতে এসেই রাস্তায় জ্যাম লেগে গেছে। ফ্লাইওভারটার নিচে রেলক্রসিংটায় এমন জ্যাম স্বাভাবিক।
মেয়েঃ উফ এত জ্যাম। কি অদ্ভুত। মা আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। উফ! আজকেও আমার পার্টিটা হেল হয়ে গেল! উফ! এই সিএনজি বায়ে দিয়ে নাও না। তুমি কি চোখে দেখ না। বায়ে দিয়ে নাও।
মেরাজঃ ম্যাডাম ট্রেন চলে আসবে এক্ষুনি। ওটা গেলেই জ্যাম খুলে যাবে।
মেয়েঃ উফ শিট!
মেরাজ এর আগেও শব্দটা শুনেছে। শিট মানে তার জানা নাই। জানার প্রয়োজন মনে করে নাই। মেয়েদের রাগ হলে শিট হয় এটা ধরেই সে তখন চুপ হয়ে যায়। বড়লোকের মেয়েদের শিট বেশি। মনে মনে ভাবে সে। তার এত শিট নাই অবশ্য। জব্বার মাস্তানকে পাইলে সে অবশ্য তার শিট বাড়ে যায়। ইচ্ছে করে ওর গায়ে সব শিট ঢেলে দিতে।
জ্যাম কেটে এগিয়ে যায় সে। সংসদ ভবন দিয়ে সামনে এগিয়ে যায় সে।আসাদগেট ক্রস করে লালমাটিয়া দিয়ে এগিয়ে যায়। এদিক দিয়ে জ্যাম কম। ধানমন্ডি এগিয়ে সে সিএনজির স্পিড তুলনামূলক ভাবে কমিয়ে দেয়। জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা। তার প্রতি সন্মান দেখিয়ে এটা করে সে।
মেয়েঃ এই সিএনজি তাড়াতাড়ি চল। স্পিড বাড়াও।
মেরাজঃ স্পিড বাড়ানো যাবে না ম্যাডাম।
মেয়েঃ আজব তো। তুমি কি পাগল। ফাকা রাস্তায় এত আস্তে গাড়ি চালাও কেন? পুরাই আজব। মা তুমি কিছু বলছ না কেন?
মেরাজঃ ম্যাডাম আর মাত্র দশমিনিট মাত্র শিট কন্ট্রোল করেন প্লিজ।
মেয়েঃ আ্যাই কি বল্লা তুমি? এত্ত বড় সাহস! মা দেখ না!
মা মনে হয় বেশ মজা পেয়েছেন। উনি হাসছেন। আজকালকার মেয়েরা কি সব বলে আর মা বাবারা এসব শুনে বড়ই মজা পান। বেশিরভাগ সময় বিরক্ত হন তবে কিছুকিছু সময় বেশ মজা পান। যেমন মজা পেয়েছেন এখন।
মাঃ এত শিট শিট বলিস যে এবার বুঝ ক্যামন লাগে শুনতে! সিএনজি তুমি আস্তে চালাও।
মেরাজ ভাবে সে কি ভুল করল যে মেয়ে এত রেগে গেল। সে তো বলেছে দশ মিনিট রাগ কন্ট্রোল করতে। আসলে বড়লোক মেয়েদের রাগতে কোন কারন লাগে না। মেরাজের সিএনজি মহিলার বাসার সামনে দাঁড়ায়। মা মেয়ে নেমে যায়। বাসার দারোয়ান এসে মালপত্র নামায়। মা ভাড়া দিয়ে বাসায় চলে যায়। মেয়েটা তখনো মেরাজ কে গালি দিচ্ছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাতপা নাড়িয়ে। ইউ স্ক্রাউন্ড্রেল, ইউ ব্লাডি চিপ, মাদারফাকার দাতভাংগা সব ইংলিশ। মেরাজ গ্রামের স্কুলে এসব ইংলিশ শিখে নাই। ও সিএনজি ঘুরায়। মেরাজ সিএনজি ঘুড়িয়েই দেখে জব্বার ও তার দলবল।
ওই সিএনজি ওই ব্যাটা। এদিকে আয়। ওরা ডাকছে। রাস্তার পাশে কাদার ছড়াছড়ি। মেরাজ সিএনজি সোজা সামনে এগিয়ে ঘুড়িয়ে নেয়। সামনে এখন একদল শিকার। মেয়েটা সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, জব্বারের দল ও খিস্তিখেঊর করে এলাকাটা নরক করে ফেলেছে। সময় হয়েছে এই কীটাণুদের একটু স্নোক্রিম মাখানোর। দ্রুত এগিয়ে প্যাকের উপর চাকা চালিয়ে দেয় মেরাজ। প্যাকের দলা গিয়ে কীটদলের সারাগায়ে ভরে গেছে। ওরা কিছু বোঝার আগের মেরাজ দ্রুত সিএনজি আবার ইউটার্ন করে।
বাসার দিকে তাকায় মেরাজ। মা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে হাসছেন। হেসেই চলেছেন। উনাকে শিশুর মত লাগছে। আজকে উনার মেয়ের অনেক শিট হবে। এটা ভেবেই হয়ত হাসছেন। আমিও হাসছি। হাসি জিনিসটা ব্যাপকরকম সংক্রামক। এত উত্তেজনার মধ্যেও হাসি আসছে আমার। জব্বারদের শিটও বেড়ে গেছে। হা হা। রাস্তায় কাদা মেখে ওরাও শিট শিট করছে।আনন্দ আর আনন্দ। যাই, লাল্টুর দোকানে। লাল চা খাওয়াব লাল্টুকে। আমি নিজে বানাব। জব্বারদের দিন শেষ, লাল্টুদের দিনের শুরু।
মেরাজ চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ঠিক তখনি আবার বৃষ্টি। ঢাকার রাজপথে যে অনেক কাদা দরকার মেঘ তা বুঝে গেছে।
@চলবে।
ছবিঃ গুগল।
উৎসর্গঃ বাসার নিচের চাওয়ালাকে। যে অনেক আদর করে আমার জন্য চা বানায়।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


