somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা কে ভালোবাসুন কারন মা কারো চিরদিন থাকেনা। :)

০৭ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোট বেলায় আমি নাকি খুব মোটা ছিলাম। বাড়ির আশেপাশের সবাই আমাকে কোলে নিতে খুব আগ্রহী ছিল। আর আমি নাকি কারো কোলে যেতেই কোন কার্পণ্য করতাম না। সবার কোলেই খুব হাসি হাসি লুক দিতাম, ভাবটা এমন যে আমি খুব মজা পাচ্ছি। এটা নিয়ে কারো কোন সমস্যা ছিলনা একজন বাদ দিয়ে। সেই একজন নাকি ছিল আমার মা। হ্যাঁ আমার মা। মা নাকি খুব হিংসা করতো সবাইকে। কারো নজর যদি লাগে সেই ভয়ে নাকি আমাকে বেশীর ভাগ সময়েই ঘরের মধ্যে রাখা হতো। আর সবাই আমাদের ঘরেই হামলা করতো। মায়ের এই হিংসা যে কি পরিমাণ ভালোবাসার তা আমি সেই দুই-তিন বছরের বাচ্ছা বয়সেও বুঝিনি আর আজ এই বয়েসেও না। ভালোবাসা এমনই হয় বুঝি, ও শুধু আমার ওকে নিয়ে কোন ভাগাভাগি চলবেনা।

আমরা পিঠাপিঠি দুই ভাই। আমার ছোট ভাইটা আমার থেকে এক বছরের ছোট। দুই-তিন বছরের বাচ্চাকালে আমরা যতটাই শান্ত ছিলাম ছয়-সাত বছরে নাকি তাঁর বিপরীত হয়ে উঠেছিলাম। সারাদিন নাকি ছুটাছুটি করতাম। রৌদ্রে দৌড়াদৌড়ি করতাম। বাগানের গাছ থাকলেও কোন ফুল-পাতা থাকতোনা। ঘরে কোন কাঁচের জিনিস থাকতো না। এসবে কারো কোন সমস্যা ছিলনা যতদিন না, আমরা আমদের ঘর আর বাগান ছেড়ে বাড়ির আশেপাশের বাগান আর ঘর গুলোতেও হামলা করেছিলাম। বাড়ির আশেপাশের সেই লোকগুলোই যারা আমকে কোলে নিয়ে ঘুরতে খুব আগ্রহী ছিল তারাই নাকি তখন আমাদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আর এতে করে সবথেকে বেশী সমস্যা আমার সেই মা'য়েরই হয়েছিল। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়, এটা আমার শরীরের অংশ পচে ঘন্ধ বের হলেও আমার।

পড়াশুনা করাটা ছোটবেলার সব থেকে যন্ত্রনার বিষয় ছিল। আর এতো এতো প্রতিযোগীতার ভীড়ে টিকে থাকার লড়াইটাতো আছেই। আর আমি আর আমার ছোটটা মাশাল্লাহ এগুলোর ধারে কাছেও ছিলামনা, ভাবটা এমন যে তখনই বুঝে ফেলেছিলাম জীবনে পড়ালেখা ছাড়াও করার অনেক কিছু আছে। দুপুড়ের কড়া রৌদ্রে ক্রিকেট, বিকেলের বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ফুটবল। কিন্তু এতো কিছুর মাঝেও কেনো জানি সব কিছু ঠিকঠাকমতো লাইনে রেখেছিলেন আমার সেই মা। মজার একটা ঘটনা শেয়ার করি, দুপুড়ে না ঘুমালে রাত্রে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমায়া যাইতাম, পড়া হইতো না। কিন্তু আমরা দুজন দুপুড়ে ঘুমাতে চাইতাম না, আর না ঘুমালেতো হবেনা পড়াশুনা। এই সমস্যাটাও হলো আমার মা'য়ের। সংসারের সমস্ত কাজ ফেলে শুরু করলেন আমাদের ঘুম পারানোর কাজ। মা মাঝে আর আমরা দুজন দুই পাশে। সারাদিনের কাজের ক্লান্তিতে মা আমার পাঁচ মিনিটেই ঘুম। আর আমি আর আমারা দুজন একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বিছানা থেকে নেমেই দৌড়ে পালিয়ে যেতাম।

আমরা দুজন ছোটবেলা থেকেই মা'র খুব ভক্ত ছিলাম। তাকে ছাড়া আমাদের কোন কাজই হতোনা। সারাদিন এদিকে ওদিকে থাকলেও হঠাত ঘরে গিয়ে মা'কে না দেখলে সারা বাড়ি মাথায় তুলে নিতাম। মা'কে ডাকতাম তুই করে। আমাদের মা'কে খোঁজা দেখে সবাই মজা করে বলতো, "তোর মা তোর নানা'র বাড়ি চলে গেছে।" আমরা কান্না শুরু করে দিতাম। আরো জোড়ে চিল্লাইতাম, "এ মা, মা। এ মা, মা।" দম নিয়ে আবার চিল্লাইতাম। মা ছাড়া আমরা খাইতাম না। আসলে অন্য কেউ খাওয়াতে পারতোনা। ঘরে এসেই চিল্লাইতাম, "এ মা ভাত দে।" তবে সেটা খুবই কম, বেশীরভাগ সময়েই যেটা হতো সেটা হলো, আমাদের খাওয়ানোর জন্য মা লাঠি নিয়ে পাশে বসে থাকতো। ভাতে বেশ অনীহা ছিল যে। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়, ওর যেটায় ভালো সেটা আমি ওকে করিয়েই ছাড়বো।

হাইস্কুলের দিনগুলোতে কেন জানি মা আমার বেশ দূরে সরে গেলেন। প্রাইমারি স্কুলের মর্নিং শিফটের ইতি ঘটে শুরু হয়েছিল সারাদিন স্কুলে থাকা আর সেই সাথে ইতি ঘটেছিল মা'র সাথে অনেক বেশী সময় কাটানো। মনে মনে কতোটা কাছাকাছি ছিলাম সেটা কেবল সারাদিন স্কুলে থাকার সময়েই বুঝতাম। কিন্তু দূরত্ব খুব খারাপ একটা জিনিস। হাইস্কুলের কিছু বন্ধু তাদের মা'কে আম্মা বলে ডাকতো আর সেই সাথে তুমি করে বলতো। বিষয়টা প্রথমে খুব ভালো লাগে। আমিও এপ্লাই করা শুরু করি। বেশ ভালোই লাগে। আম্মা বলাতে আর তুমি বলাতে কোন দোষই ছিলনা, কিন্তু কেন জানি মা আমার আম্মাতে হারিয়ে গেলো। আমার সেই আবেগের তুই আজ তুমিতে মরে গেলো। ভালোবাসা কেমন হয় তখনও বুঝিনি।

হাইস্কুল ছেড়ে কলেজ। আমি তখন বেশ আধুনিক। আম্মা বলা শিখেছি অনেক আগেই আর এবারে শিখলাম সম্মান দেয়া। আম্মা অনেক সম্মানের ব্যাক্তি তাকে তুমি বলা ঠিকনা, আপনিতে বাধতে হবে। আম্মা আমার আপনি হলেন। আর আমি তখন ফোনে ফোনে খোঁজ রাখতাম। বাড়ি থেকে বহু দূরে তবুও কেবল সেই মানুষটাই আমার ব্যাথায় ব্যাথা পান আগে থেকেই ফোনে সাবধান করে দেন। আমার ভালোবাসা সম্মানে আটকে গেলো আর তাঁর ভালোবাসা বেড়ে গিয়ে ভয়ে দাঁড়ালো। ভয়তো তাকে নিয়েই হয় যাকে সব থেকে বেশী ভালোবাসা যায়।

আমার এখন দুইটা আম্মা। শাশুড়ি আম্মা। আমার গল্পের ভিলেন আমি হতে পারিনা। তাইতো দুইজনকেই সমান সমান শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দিয়ে যাই। আমার আম্মার এখনো আমাকে নিয়ে কোন সমস্যা নেই। আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগও নেই। আমার বউটাও কিন্তু আমার মতোই। দুইটা আম্মাকেই খুব ভালোবাসে।
এখন সমস্যা শুধু আমার, আমি এখন শুধু আমার হারিয়ে ফেলা সেই মা'কে খুঁজে বেড়াই। বার বার তাঁকে ডাকতে চাই, "এ মা" বলে। মাঝে মাঝে বাসায় গিয়ে বলতে চাই, "এ মা, মা, ভাত দে।"

এভাবেই সব মা বেঁচে থাকুক। :)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১:৪১
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চুক্তিতে নেই, তবু প্রবাসীদের আশা: NCT দিলেই মিলবে ভিসা ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৪:০০


জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল, বিগত অনির্বাচিত সরকারের সকল প্রজেক্ট পর্যালোচনা করা হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা বাদ দেওয়া হবে। কিন্তু সরকার তো আগের দেখানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুগল এ.আই. - প্রফেশনাল সার্টিফিকেট পেয়ে গেলাম

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৫


বিগত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে কোর্সেরাতে টুকটাক কোর্স করছি, মাঝে মধ্যেই সার্টিফিকেট পাচ্ছি। তবে প্রফেশনাল সার্টিফিকেট কোর্স কখনো করা হয় নি। বলে রাখা ভালো কোর্সেরা ফ্রি নয়, এখানে আপনাকে পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মদিনার মিষ্টান্ন, শ্রী ঘোষের দধি: সম্প্রীতির যে রেখা চোখে পড়ে না

লিখেছেন মুনতাসির, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৮



২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রয়াত লেখক, গবেষক ও বাম রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরকে দেশের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ষাটের দশকে যিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামে আস্ত একটা বই... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বেগম রোকেয়া, একজন মাদাম কুরী এবং একজন আএলিটা

লিখেছেন নাজনীন১, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০



মঙ্গল গ্রহের রাণী আএলিটা।



রাশিয়ান বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর একটি চরিত্র। ১৯২৪ সালের সাদা কালো ম্যুভিটি বানানো হয়েছে,সায়েন্সফিকশন উপন্যাসটি লিখেছিলেন এলেক্সে নিকোলেভিস টলস্টয়, ১৯২৩।


বাংলাদেশে এক সময়ে বিজ্ঞানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ পর্ব-২

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯



এবার জিন্নাহর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত বিতর্কিত বক্তব্যে আসা যাক। জিন্নাহ জন্মসূত্রে গুজরাটি ছিলেন এবং কেবল ইংরেজি ও গুজরাটি ভাষা জানতেন। তিনি উর্দু বলতে পারতেন না। সেক্যুলারিস্ট জিন্নাহ যেহেতু ব্যক্তিজীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×