♣এক
ছোট্ট শহর নওগাঁ। পাশ বয়েছে ছোট যমুনা নদী কিন্তু এটা যমুনার শাখা নদী নয়। মানুষ ভালবেসে হয়তো নাম দিয়েছে ছোট যমুনা। থাক সে রহস্য! তবে নওগাঁ নামটার একটা অর্থ আছে। নয়টা গাঁ একসাথে মিশে নওগাঁ শহর।
দিপু ও আমি, সবে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে গল্প করছি।এ গল্প সে গল্প, এমন সময় মনেহল,পরীক্ষা শেষ কোথাও ঘুরে আসলে মন্দ হয় না। দিপুকে বললাম,কিরে বেড়াতে যাবি? দিপু জিজ্ঞেস করলো,কোথায় যাবি? আমি উৎসুক হয়ে জবাব দিলাম,চলনা কুসুম্বা মসজিদ দেখে আসি। ও আচ্ছা বলেই দিপু উঠে পড়লো। ঘড়িতে সন্ধ্যা ৭ টা, আমারও ফেরার সময় হয়ে এসেছে।
দুদিন পর দিপুকে সাথে নিয়ে কুসুম্বা মসজিদে যাচ্ছি। শুনেছি এ মসজিদ সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো। মুগল শাসক গিয়াস উদ্দীনের সময় ১৫৫৮ সালে নির্মান হয়। নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পাশেই এই মসজিদ।নওগাঁ থেকে দেড় ঘন্টা বাসে চলা পথ,এর পর ১০ মিনিট হেঁটেই সেখানে যাওয়া যায়। বাস থেকে নেমে ঘড়িতে দেখলাম সকাল ১০ টা ।
সবে জানুয়ারির শুরু তাই শীতের প্রকট বেশী। উত্তরে শীত বেশি আবার গরমে কাঠফাটা রোদ। সকাল দশটা বাজলেও কুয়াশা এখনো কাটেনি। দিপুকে বললাম,কিরে চা খাবি?
-হু
-চল তাহলে আর একটু সামনে।
-দুধ চা পাওয়া যাবে?
-হ্যাঁ।
এখানে খাঁটি দুধ অনেক জ্বালের পর যখন লাল আর ঘন হয়। তখন সেই দুধ আর চা মিশিয়ে তৈরি হয় দুধ চা। দুধ চা খেয়ে আমার কুসুম্বা মসজিদের দিকে রওনা হলাম। যেহেতু আমি এ অঞ্চলের ছেলে,তাই আগেও এসেছি। মসজিদের পাশেই বিশাল দিঘি। সান বাধানো দিঘীর ঘাট। পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি। দিঘীর পাড়ে কয়েকটা বড় বড় নারকেল গাছ আর একটা বট । মসজিদের মুসল্লিরা এখানে ওজু করে। এর পর গেলাম মসজিদের কাছে। সাড়ে চারশো বছরের পুরনো হলে কি হবে, দেখে মনে হয় এখনো নতুন। মসজিদের চারটি খিলান, দেওয়ালে, ভেতরে অসংখ্য কারুকাজ। উপরে সিলিংয়ে তিনটে বড় মৌচাক। এ অঞ্চলে সরিষা চাষ হয়। হলুদ সরিষা ভুল থেকে মৌমাছিদের মিষ্টি মধু পেতে তেমন বেগ পেতে হয় না।
বাইরে এসে ঘড়িতে দেখি সকাল সাড়ে এগার। দিপুকে বললাম,
-কিরে দিপু আমাদের বাসায় যাবি?
-যেতে পারি কিন্তু আজই নওগাঁ ফিরতে হবে।
-আচ্ছা চল।
ওকে নিয়ে রাস্তায় নসিমনের খোঁজ করতে লাগলাম। ভাবছেন নসিমন আবার কি জিনিস! নসিমন হল পানি সেচের মেশিন দিয়ে গ্রাম কায়দায় তৈরি ভ্যান গাড়ী। এ অঞ্চলের যোগাযোগ এখনো উন্নতি হয়নি।
আমাদের বাড়ি হাটুরিয়া গ্রামে,এমন অদ্ভুদ নামের কারনে বহু বছর পূর্বে এখানে হাট বসতো। আমরা এখান থেকে যাবো বান্দাইখাড়া বাজারে। পাকিস্তান আমলে এখানে থানা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী সমস্ত বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়। একশোরও বেশি নিরীহ মানুষকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। বোদ্ধভূমি রয়েছে কিন্তু তার যত্ন হয় না। বাজারের পাশেই খরশ্রোতা আত্রাই নদী। শুনেছি,এক কালে এ নদীতে জাহাজ চলাচল করতো। পাটের ব্যবসা বেশ জমজমাট ছিল তখন। এখান থেকে ১০ কিলো পুবে রবি ঠাকুরের কুঠিবাড়ী। এখানে বসেই তিনি তার পিতার জমিদারি দেখাশুনা করেছেন। সেইআমলে এখানে কৃষকদের জন্য তিনি কৃষি ব্যাংক করেছিলেন। এখানে তিনি কয়েকটি গান ও কবিতাও লিখেন। আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে,বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে..... এই কবিতাও তিনি এখানে বসে লেখেন। গল্প করতে করতে আধা ঘন্টায় বাজারে পৌছেঁ গেলাম। বাজারে পৌঁছেই দিপুকে নিয়ে গেলাম চিদাম দাদুর হোটেলে। এখানকার সিঙ্গারা বেশ মজার। আকারে ছোট হলেও খাসির কলিজা দিয়ে তৈরি। দিপু ও আমি ৫টা সিঙ্গারা খেয়ে বেরিয়ে এলাম। শহরের মতো এখানে রিকসা নেই,ভ্যানে করে চলতে হয়। ভ্যানে করে আমরা চললাম আমাদের গ্রামে। আমাদের গ্রাম এখান থেকে ২ কিলো দক্ষিনে। ১৫ মিনিটের পথ পেড়িয়ে গ্রামে আসলাম। গ্রামের মাথায় একটা ছোট্ট বাজার। এখানে চা আর সবজি কেনাবেচা হয়। দিপুকে নিয়ে আমাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে বাসার দিকে রওনা হলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৫ রাত ১২:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



