
আমাদের কওমি জননী সত্যি কি অসাম্প্রদায়িক? হলে কতোটা? প্রশ্ন থাকলো সবার কাছে। তেতুল হুজুর মাওলানা শফি খুব ভক্তিভরে তাকে কওমি জননী উপাধি দিয়েছিলেন। এমনি এমনি তো আর নয়। অত্যন্ত মহব্বত করতেন। সবসময় বলতেন, আমার ছোটো বোন। বিস্তারিততে আসছি। প্রথমবার ক্ষমতায় থাকাকালীন সরাসরি নির্দিষ্ট ধর্মের (হিন্দু) মানুষদের উদ্দেশ্যে বলে বসেন যে, আপনারা দুই নৌকায় পা রাখবেন না। দুই নৌকায় পা রাখলে তীরে পৌছনো যায় না, ডুবতে হয়। আমাদের কওমি জননী কিছুতেই বুঝতে চান না যে বাপদাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি ঘরবাড়ি ক্ষেতখামার ফেলে শখের বশে সারা দেশ থেকে হিন্দুরা খুশিখুশি ভারতে যেয়ে উদ্বাস্তু হয়নি। পরিস্থিতি বরাবরই তাদের বাধ্য করেছে জন্মভূমি ত্যাগে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষবাষ্পের ভিক্টিম যারা, উল্টো তাদের কাঁধেই দেশান্তরি হবার দোষ চাপিয়ে দিলেন! হিন্দুদের যেন এই দেশের প্রতি কোনও টান নেই, আনুগত্য নেই।
আমাদের তেতুল হুজুরের পেয়ারের ছোটো বোন সুযোগ পেলেই জনগনকে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিতে সিদ্ধহস্ত। মওকা পেলেই জাতিকে জানাতে ভোলেন না, তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী, নিয়মিত ফজরের নামাজ পড়েন, প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় উঠে কোরআন তেলাওয়াত করেন, তাহাজ্জুদ পড়েন ইত্যাদি। অভিনেত্রী তারানা হালিমের সঙ্গে পুরনো সাক্ষাৎকার মনে পড়ছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপলক্ষে নেহাতই ব্যক্তিগত নিজস্ব ধর্মচর্চার বিষয় আমজনতাকে অবগত করানোর কোনওরকমের কোনও সুযোগ হাতছাড়া করেন না। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে তার ধর্মীয় ভাবাবেগ প্রচন্ডরকম তীব্রতা পায়। স্বাভাবিকভাবেই এখন এসব নিয়ে আগের আর সে আড়ম্বর নেই। কারণ ভোট নেই, প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, ক্ষমতা হারানোর ভয় নেই। তাই চুপ। ৯৬ এ নির্বাচনকালীন দীর্ঘ সময় মোল্লাদের মতো মাথায় কালো টুপি পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন সর্বত্র। রাজনৈতিক জীবনে তেতুল হুজুর মার্কা লোকজনদের খুশি করবার কোনওরকমের কোনও সুযোগ হাতছাড়া করেননি। বিভিন্ন ভাষণে ইসলাম ইসলাম প্রোফেট প্রোফেট জিকির তুলে তুবড়ি ছুটিয়েছেন মুখে। ঢাকার পল্টন ময়দান, গুলিস্তানস্থ আওয়ামী লীগ পার্টি অফিসের সামনে বেশ কবার তার ভাষণ শুনেছি। সাধারণ মানুষদের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের স্পর্শকাতর জায়গা নাড়াচাড়াতে কারও চেয়ে ভালো কম যান না কওমি জননী, বরং বেশ পটুই বলবো। এ সত্য যারা অস্বীকার করে, তারা নগ্নভাবে দলকানা ও বিবেকহীন।
বহু আগে একবার ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ মুসলমানদের জিহাদ করা ফরজ, যথা সময়ে ইসলামের দুশমন কাফির মুরতাদ মুশরিক মুনাফেক বিধর্মীদের পাইকারি কতল করাও প্রকৃত ইমানদার মোমিনের জন্য অবশ্য পালনীয় ইত্যাদি। ধর্ম নিয়ে ভয়ঙ্কর কথাবর্তা সম্পূর্ণ কারণহীন বেলাগাম বলে বেড়াচ্ছিলো প্রচারমাধ্যমে। জিহাদি জোশে টগবগ করে ফুটছিলো শেষ বয়সে এসে। পারলে তখনই খোলা তরবারি নিয়ে পবিত্র জিহাদের উদ্দেশ্যে রাস্তায় নেমে বিধর্মী কাফির মুরতাদ মুশফিক মুনাফিকদের আল্লার পথে গলা কাটা শুরু করে দেয় আরকি। সে সময় আওয়ামী লীগকে প্রকৃত ইসলামের পথে আসা, ইসলামের নীতিমালা পূর্ণরূপে অনুসরণ করে চলারও নসিহত দেন। মোল্লা হানিফ আরও বলেন, ধর্মকে জিহাদি ইমানি জোশে আকড়ে না ধরলে আওয়ামী লীগের সামনে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। পাবলিক ক্রমশ দূরে সরে যাবে। ভোট পাবে না। হিন্দুয়ানী দলের ইমেজ থেকে বেরোতে হবে। নইলে সামনে দুর্দিন। মোল্লা হানিফের এসব জঙ্গি জেহাদি মার্কা কথাবার্তা নিয়ে মিডিয়ায় প্রচুর আলোচনা সমালোচনা হয়েছিলো। তার এ সব বক্তব্য ছিলো কমপ্লিটলি আইএস, আল কায়েদা, বোকো হারাম ইত্যাদি জঙ্গি, জেহাদি সংগঠনের ভাষ্য। ভীষণ আশায় ছিলাম, নেত্রী তাকে তিরস্কার করবেন, গালমন্দ করবেন। সে সময় তার জন্য সবচেয়ে সঠিক কাজ হতো, জঙ্গিটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দল থেকে বের করে দেয়া। আর কিছু না হলেও অন্তত মুখে লাগাম পরতে অবশ্যই বলবেন। কিন্তু বাস্তবে কীসের কি, একশান তো দূর, সামান্য প্রতিবাদ কিম্বা সমালোচনাও করলেন না। পরিবর্তে দেখলাম, উল্টো তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে বসলেন। বললেন, এগুলো সব নাকি পবিত্র ধর্ম গ্রন্থেই বলা আছে। এসবের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনওরকমের কোনও বিরোধ নেই। আওয়ামী লীগেরও পূর্ণ আস্হা আছে এতে। আওয়ামী লীগই প্রকৃত সত্য সঠিক ইসলামের ঝান্ডাধারী, অনুসরণকারী দল। কওমি জননী নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে বসলেন মোল্লা হানিফকে।
এবারের দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর দেশের এখানেওখানে একের পর এক আক্রমণ; মন্দির প্রতিমা ভাঙচুর নিয়ে কওমি জননীর একটি বক্তব্য ছিলো ভীষণরকম আপত্তিকর। সেখানে তিনি বলেন যে, ভারতের সরকার যেন ওখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করে। সে সবের প্রতিক্রিয়া হয় এদেশে। লও ঠেলা! কওমি জননী কাঠমোল্লাগিরির ষোলোকলা পূর্ণ করলেন এ মন্তব্যের মাধ্যমে। এখানে তিনি আরেক দেশের কাঁধে সমস্ত দোষ চাপিয়ে, সুক্ষ্ণভাবে প্রকারান্তরে হিন্দুদের ওপর দেশব্যাপী এখানেওখানে ঘটে চলা এসব আক্রমণ, অত্যাচার নির্যাতনকে জাস্টিফাই করে বসলেন! শুধু জাস্টিফাইই করলেন না, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি এসব ধর্মান্ধ কট্টরপন্থী উগ্র জেহাদি মনমানসিকতার ঘৃণ্য অপরাধীদের বরং উৎসাহিত করলেন, যেন আগামীতেও এসব অব্যাহত রাখে। তার বক্তব্য অনুসারে, এটা ভারতে মুসলমানদের নির্যাতিত হবার সাধারণ প্রতিক্রিয়া। ওখানে হলে এখানেও হবে। ধন্য তেঁতুল হুজুরের পেয়ারের বোন! এ বক্তব্য তার অবস্থান থেকে শুধু অন্যায়ই নয়, বলবো রীতিমতো জঘন্য অপরাধ। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান পদে থেকে একথা কিছুতেই তিনি বলতে পারেন না।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



