somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খাবার গ্রহণে রাসূল (সাঃ) এর কতিপয় সুন্নত

০২ রা মার্চ, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খানা খান ও পান করুন এবং অপব্যয় করবেন না। তিনি (আল্লাহ) অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।
রাসূল (রাঃ) তার প্রিয় সাহাবিদের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ-প্রত্যেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তার প্রতিটি কর্ম ও পদক্ষেপ মানবতার অনুসরণযোগ্য। সফলতা ও কামিয়াবির মাধ্যম। জীবন পথের পাথেয়। তার কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করলে ‍মুমিনের জীবনে বয়ে যাবে প্রশান্তির ফল্গুধারা।
রাসূল (রাঃ) কীভাবে খাবার খেতেন, খাবার গ্রহণে তার কী পদ্ধতি ছিল- সংক্ষিপ্তভাবে তা তুলে ধরা হলো।
১.খাবার হাত ধুয়ে শুরু করা
খাবার গ্রহণের আগে দুই হাত ক্ববজি পর্যন্ত ধৌত করা সুন্নত। রাসূল (রাঃ) খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার আদেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) পানাহারের আগে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন। (মুসনাদে আহমাদ)
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (রাঃ) খাওয়ার পর কুলি করতেন এবং হাত ধৌত করতেন। (মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)
২. দস্তরখান বিছিয়ে খাওয়া
দস্তুরখানের উপর খানা খাওয়া। আনাস (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (রাঃ) পায়াবিশিষ্ট বড় পাত্রে খাবার খেতেন না। কাতাদা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে কীসের ওপর খানা খেতেন? তিনি বললেন, ‘চামড়ার দস্তরখানের ওপর। ’ ( বোখারী : ৫৩৮৬)
৩. খানার সময় বসা
বিনয়ী অবস্থায় সামনের দিকে ঝুঁকে একজন আল্লাহর মুখাপেক্ষী বান্দার মত বসে খাওয়া। খানা খাওয়ার সময় বাম পা বিছায়ে দিবে এবং ডান পা খাড়া রাখবে, অথবা দুই হাটু খাড়া রেখে কিংবা দুই হাটু ফেলে দুই পায়ের উপর বসবে। এই তিনটা থেকে যে কোন এক নিয়মে বসা সুন্নত।
হাদীসে আছে নবী (সাঃ) বাম পা উঠিয়ে, ডান পায়ের উপর বসতেন। অপর এক হাদীসে নবী (সাঃ) উভয় পা উঠিয়ে বসার কথা উল্লেখ আছে।
৪. খাবার শুরু করা
মাজখান থেকে খাবার শুরু করবেন না । নিজের ডান পার্শ্ব থেকেই খাবে। চার দিকে হাত মারবেন না।
রাসূল (রাঃ) আজীবন ডান হাত দিয়ে খাবার খেতেন। বাম হাত দিয়ে খাবার খেতে নিষেধ করেছেন তিনি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) বলেন, ‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে। ’ (বুখারী : ৫৩৭৬; মুসলিম : ২০২২)
৫. খাবার গ্রহণের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা
রাসূল (রাঃ) খাবার গ্রহণের আগে সব সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতেন। তার সঙ্গীদেরও বিসমিল্লাহ বলতে উৎসাহিত করতেন। রাসূল (রাঃ) বলেন, ‘আল্লাহর নাম নিয়ে ও ডান হাত দ্বারা খানা খাও। এবং তোমার দিক হতে খাও। ’ (বুখারী : ৫১৬৭, তিরমিজি : ১৯১৩)
৬. বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে
খানার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়তে ভুলে গেলে স্মরণ হওয়া মাত্র “বিসমিল্লাহি আওয়্যালাহু ওয়া আখীরাহ” পড়া। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) বলেন, “যখন তোমরা খানা খেতে শুরু করো তখন আল্লাহর নাম স্মরণ করো। আর যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে যাও, তাহলে বলো, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়াআখিরাহ। ” (আবু দাউদ : ৩৭৬৭, তিরমিজি : ১৮৫৮)
৭. হাত চেটে খাওয়া
রাসূল (রাঃ) খাওয়ার সময় সর্বদা হাত চেটে খেতেন। না চাটা পর্যন্ত কখনো হাত মুছতেন না। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাতকে মুছবে (ধোয়া) না। ’ (বুখারী : ৫২৪৫)
হাদিস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, খাবার শেষে যে ব্যক্তি বর্তন চেটে খাবে, তাহলে সেই প্লেট ঐ ব্যক্তির জন্য দোয়া করে এবং বলে আল্লাহ পাক তোমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে দিন যেভাবে তুমি আমাকে শয়তান থেকে স্বাধীন রেখেছ।
৮. আঙুল চেটে খাওয়া
খাবার শেষে হাতের আঙ্গুল সমূহ চেটে খাওয়া। এবং খাবারের পাত্রগুলো আঙ্গুল দ্বারা ভালভাবে চেটে খাওয়া। প্রথম মধ্যমা আঙ্গুল, তারপর শাহাদাত আঙ্গুল, এরপর বৃদ্ধাঙ্গুল ও অন্যান্য আঙ্গুল এবং বর্তনও চেটে নিবে। আঙুল চেটে খাওয়ার ফলে বরকত লাভের অধিক সম্ভাবনা থাকে। কারণ খাবারের বরকত কোথায় রয়েছে মানুষ তা জানে না। রাসূল (রাঃ) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না।’ (ইবনে মাজাহ : ১৯১৪)
হযরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) খাবারের পর আঙ্গুল ও প্লেট চেটে খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময় তিনি আরো বলেছেন খাদ্যের কোন অংশে বরকত নিহিত আছে তা তোমরা কেউ জানো না। (সহীহ মুসলিম॥ মিশকাত : ৩৬৩)
৯. পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া
খাবার গ্রহণের সময় কখনো কখনো থালা-বাসন থেকে এক-দুইটি ভাত, রুটির টুকরো কিংবা অন্য কোনো খাবার পড়ে যায়। সম্ভব হলে এগুলো তুলে পরিচ্ছন্ন করে খাওয়া চাই।
রাসূল (রাঃ)-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত, তাহলে তিনি তুলে খেতেন। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) বলেন, ‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না। ’ (তিরমিজি : ১৯১৫; ইবনে মাজাহ : ৩৪০৩)
ইমাম গাজালী রহ: বলেন- রুটির টুকরো ও ছিলকাগুলো তুলে নাও। হাদীস শরীফ এ বর্ণিত হয়েছে যে, যারা এরকম করবে তাদের জীবন যাপনে আল্লাহ পাক প্রশস্ততা ওয়সাআত দান করবেন। তাদের বাচ্চাগুলো সুস্থ, নিরাপদ ও ত্রুটি মুক্ত থাকবে। এবং ঐ রুটির টুকরো গুলো জান্নাতী হুরগণের মহর স্বরুপ হবে। (কিমিয়ায়ে সা'য়াদত)
১০. হেলান দিয়ে না খাওয়া
কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে খাবার খেতে তিনি নিষেধ করেছেন। হেলান দিয়ে খাবার খেলে পেট বড় হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়। আবু হুজাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (রাঃ)-এর দরবারে ছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, আমি টেক লাগানো অবস্থায় কোনো কিছু ভক্ষণ করি না। (বুখারী : ৫১৯০, তিরমিজি : ১৯৮৬)
১১.খাবারের দোষ-ত্রুটি না ধরা
শত চেষ্টা সত্ত্বেও খাবারে দোষ-ত্রুটি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করা নিতান্ত বেমানান। রাসূল (রাঃ) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূল (রাঃ) কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না। (বুখারী : ৫১৯৮; ইবনে মাজাহ : ৩৩৮২)
১২. খানা সময় একেবারে চুপ থাকা
খানা সময় একেবারে চুপ থাকা মাকরূহ। তাই খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পরস্পর ভালো ভালো কথা বার্তা বলবেন। তবে অহেতুক কথা দুঃশ্চিন্তাযুক্ত কথা এবং ঘৃণিত কথা বার্তা বলবেন না।
১৩. খাবারে ফুঁ না দেওয়া
খাবার ও পানীয়তে ফুঁ দেওয়ার কারণে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে। রাসূল (রাঃ) খাবারে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। কোনো কিছু পান করার সময়ও তিনি ফুঁ দিতেন না। (ইবনে মাজাহ : ৩৪১৩)
১৪. খাবারের পর মিসওয়াক করা
খাবারের পর মিসওয়াক করা সাওয়াবের কাজ । তাই সম্ভব হলে মেসওয়াক করবেন।
১৫. খাবারের পর ভালোভাবে হাত ধুয়া
খাবারের পর ভালোভাবে হাত ধুয়ে মুছে ফেলবে। এতে সাবান ও হ্যান্ডওয়াস ব্যবহার করা যাবে।
১৬. খাবারের শেষে দোয়া পড়া
খাবার শেষে রাসূল (রাঃ) আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতেন ও দোয়া পড়তেন। আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (রাঃ) খাবার শেষ করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা। ’ তিনি কখনো এই দোয়া পড়তেন: ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’ (বুখারী : ৫৪৫৮)
আল্লাহ তা’আলা খাবারের মাধ্যমে আমাদের প্রতি অনেক বড় দয়া ও অনুগ্রহ করেন। এ দয়ার কৃতজ্ঞতা আদায় করা সভ্যতা ও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত।

রাসূল (রাঃ)-এর সুন্নতগুলো জীবনে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে, জীবন সুন্দর ও সার্থক হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।



সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া,সতেজ,অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে গাছ !... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন-উচাটন

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ৯:৫০


তিড়িং বিড়িং ফাল পাড়ি,
যাচ্ছে রে মন কার বাড়ি?
পুড়ছে তেলে কার হাঁড়ি,
আমি কি তার ধার ধারি!

পানে চুনে পুড়ল মুখ,
ধুকছে পরান টাপুর-টুপ;
তাই বলে কি থাকব চুপ?
উথাল সাগর দিলাম ডুব।

আর পারি না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভয়ংকর সেই খবরের পর… সন্তানের হাতটা শক্ত করে ধরুন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৩ ই মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫

আজ সকালে খবরটি পড়ে আমার মনটা একদম ভেঙে গেল। ভাবতেই ভয় লাগছে—আমাদের সন্তানদের আমরা আসলে কতটা অরক্ষিত পরিবেশে বড় করছি! ছোট্ট একটি নিষ্পাপ শিশু, যে পৃথিবীটাকে ঠিকমতো চিনতেই শেখেনি, তাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু খতরে মেঁ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


শুধুমাত্র মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে শুভেন্দু। তার বক্তব্যের মূলপ্রতিপাদ্য হলো হিন্দু খতরে মেঁ! আশ্চর্যের বিষয় হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা নাকি মুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে, কিছুদিন পরেই নাকি পশ্চিমবঙ্গ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময় খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ১৩ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩০

দিনগুলো কেমন যেন দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে!
দেখতে দেখতে মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে,
এইতো সেদিন থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করলাম,
আর এদিকে দেখি চার মাস শেষ হয়ে পাঁচ মাস চলছে। অথচ আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×