somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৈষম্য‌ের ব্যবচ্ছেদ

১৭ ই আগস্ট, ২০১৭ রাত ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুসলীম সমাজে যে ফেরাউন অভিশপ্ত শাষকের প্রতীক ততকালিন মিশরীয়দের কাছে সেই ফেরাউনই ছিলেন ‘দ্যা গ্রেট রামেসিস’ (২য় রামেসিস) নামে পরিচিত। তাদের জন্যে তিনি ছিলেন মহান উদার প্রজা বৎসল এক জন শাষক (যার মমী সংরক্ষিত আছে তিনি প্রথম না দ্বিতিয় রামেসিস তা নিয়ে সংশয় আছে যদিও)। এই শাষক স্বজাতির জন্যে যতটুকু মহান ছিলেন তার থেকে অনেক ভয়ঙ্কর ছিলেন বনি ইসরাঈলিদের জন্যে। তারা তার সম্রাজ্যে বসবাস করতো কৃতদাস হিসেবে পশুর মত। এই বৈসম্য তাকে নিয়ে গেছে নিষ্ঠুর শাষকদের কাতারে।
.
এক জন বা এক দল মানুষ যখন যে কোন একটা অযুহাত দেখিয়ে আরেক জন বা আরেক দল মানুষকে নিজের থেকে আলাদা এবং অবশ্যই নিম্ন স্তরের গোত্র বা জাত হিসেবে চিহ্নিত করে তার ফল সব সময়ই হয় ভয়ঙ্কর। ইউরোপের সাদা চামড়ার মানুষ গুলো এক সময় মধ্য আফ্রিকায় ঘোড়ায় চড়ে কালো মানুষ শিকারে বের হতো। ধরে বেঁধে নিয়ে ব্রাসেলসের চীড়িয়া খানায় কালো মানুষ প্রদর্শনের নজির গড়ে তারা। ব্যাঙের ব্যাবচ্ছেদ করে যেমন মানুষের সাথে মিল খুঁজা হতো, কালো মানুষ ব্যাবচ্ছেদ করে মানুষের সাথে তাদের অমিল খুঁজতো তারা। সাধারন মানুষকে বুজানো হতো যে দেখতে মানুষের মতো মনে হলেও ওরা আসলে পুরোপুরি মানুষ না। মূলত মানুষই না, মানুষ সদৃশ্য বানর গোত্রীয় প্রানী যাদের সাথে যা খুশী তাই করা যায়। আর এই ধারনাই সেই রামেসীস বা তারও আগে থেকে এখন অবদি সকল নৃশংস মানুষকে এক সুতায় গেঁথে রাখছে।
.
হীটলারের নাৎসী বাহিনী মেডিকেল পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে এমন কিছু কাজ কর্ম করে যা সাধারন মানুষ কল্পনা করতে গেলেই অসুস্থ হয়ে পড়বে। দ্বিতিয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে নুরেমবার্গ ডক্টর’স ট্রায়ালে নাৎসি বাহিনীর বিশ জন ডাক্তার সাথে তিন জন প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিচার হয় তাদের ‘ইউথেনাসিয়া প্রোগ্রামের জন্যে (Euthanasia Program-অনারোগ্য রোগীদের যন্ত্রণা লাঘবে তাদের মেরে ফেলার ধারনাকে Euthanasia বলে)। এই প্রোগ্রামের আওতায় তারা প্রায় দুই লক্ষ মানসিক এবং শারীরিক অসুস্থ মানুষকে জীবনযাপনের অযোগ্য ঘোষনা দিয়ে বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মেরে ফেলে। যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে তারা হাজার হাজার ইহুদির উপর চালায় নজির বিহিন মেডিকেল পরীক্ষা। মানুষ কত কম অক্সিজেনে বাঁচতে পারে, শরীর বেঁধে রক্ত চলাচলে বাধা দিয়ে রাখলে কত দিনের মাথায় সেখানে গ্যাংঘ্রীন হয়, পাথুরে বরফে বা তীব্র গরমে কতক্ষন মানুষ বেঁচে থাকে, কোন জীবানু মানুষকে কতক্ষনে মারতে পারে তার পরীক্ষার পরে যে সব উচ্ছিষ্ট মানুষ বেঁচে থাকতো তাদের মারা হতো বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে। এই নাৎসিরা ট্রায়ালে স্বীকার করে যে ইহুদিদের তারা বিবেচনা করতো ইঁদুর হিসেবে। অর্থাৎ ইহুদিরা মানুষ না, দেখতে একই অন্য কোন প্রানী। আর এই বিশ্বাসই তাদের শক্তি দিতো এক জন মানুষ হয়ে আরেক জন মানুষের শরীরে ঠান্ডা মাথায় ভয়ঙ্কর জীবাণু ঢুকিয়ে দিতে।
.
ড. ডেভিড লিভিঙস্টোন স্মিথ্ (এক জন দার্শনিক যিনি মনোবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন) তার ‘Less Than Human: Why We Demean, Enslave and Extraminate Others’ নামের বইটিতে বর্ণনা করেছেন মানব জাতির ইতিহাসে মানুষের উপর আরেক জন মানুষের রক্তহীম করা বর্বরতার ঘটনাগুলোর পেছনের মানুষ গুলোর ভয়ঙ্কর মানসিকতা, এই মানসিকতার উৎপত্তি, তার ধারন এবং লালনের মূল কি হতে পারে তার বিস্তারিত। তিনি দেখিয়েছেন এসব বর্বরতার সময় শিকারী মানুষ তার শিকার মানুষটিকে মূলত মানুষ হিসাবেই বিবেচনা করেনা। সে মনে করে এটা স্রেফ একটা প্রানী, ইঁদুর, শুকর বা বানরের মত, যাকে যেভাবে খুঁশী অত্যাচার করা যায়।
.
আমার মনে হয় এই ভয়ঙ্কর ধারনার সূত্রপাত হয় ঠিক ঐ সময় থেকে যে সময়ে সমাজে বৈসম্যের সূত্রপাত হয়। যখন এক জন বা এক দল মানুষ যে কোন একটা অযুহাত দেখিয়ে আরেক জন বা আরেক দল মানুষকে নিজের থেকে আলাদা এবং অবশ্যই নিম্ন স্তরের গোত্র বা জাত হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু করে। যখন একদল মানুষ সম্পদ বন্টন, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা সর্ব ক্ষেত্রে নিজেদের রাজ গোত্র মনে করা শুরু করে। একই অপরাধে নিজেদের জন্যে আরামদায়ক আলাদা বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে। আর বাকিরা যখন 'বয়েলিঙ ফ্রগ সিন্ড্রমে' ভুগতে থাকে। মানে দেখিনা এর পর কি হয়, দেখিনা এরপর কি করে এর বাইরে আর কিছু করার থাকেনা তাদের।
.
০৮০৪২০১৭
.
ছবি: প্রথম আলো

সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০১৭ রাত ১০:২৬
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০০১ সালেও বিএনপিকে ডোবানোর দায়িত্ব নিয়েছিল টুকু!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৫১


ভয়াবহ লোডশেডিং। মধ্যরাতে ঢাকবাসীর হাঁসফাঁস। হঠাৎ করে এতো লোডশেডিং হওয়ার কোন কারণ নেই অথচ মধ্যরাতে ভয়াবহ লোডশেডিং। গ্রামে বিদ্যুৎ থাকেনা বললেই চলে। গ্রামে বিদ্যুৎ যাওয়ার সময় আছে কিন্তু আসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইশ্বর ও ধর্ম নিয়ে পাদ্রির লেখা ৪ হাজার পাতার স্বীকারোক্তি!

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৬

১৭২৯ সালের এক শীতের সকালে ফ্রান্সের এক ছোট্ট গ্রামের ক্যাথলিক পাদ্রি জাঁ মেসলিয়ার (Jean Meslier) মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর ঘর থেকে উদ্ধার হয় হাজার হাজার পাতার এক গোপন পাণ্ডুলিপি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বাষ্ট্রপতি নির্বাচন নাকি রাষ্ট্রীয় খরচে তামাশা!!!

লিখেছেন শাহিন-৯৯, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


বাংলাদেশে সম্মানিত রাষ্ট্রপতি (হবু)


নির্বাচন, এই শব্দটি শুনা মাত্র যে বিষয়টি আমাদের মাথায় আসে তা হচ্ছে ভোট প্রদানের যোগ্য ভোটারদের স্বাধীন ভোটের মাধ্যমে একজন যোগ্য ব্যাক্তিকে দায়িত্ব অর্পণের জন্য নির্বাচিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভাড়াটে কান্নাকারী

লিখেছেন রাজসোহান, ১৩ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



লোকে ভাবে আমরা কান্না বিক্রি করি। আমরা কান্না বিক্রি করি না। আমরা শব্দ বিক্রি করি।

শোকসভায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নীরবতা। বক্তা বক্তৃতা শেষ করে বসে পড়লেন, পরের বক্তা এখনো মাইকের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে তে কি দেখতে চাই না

লিখেছেন অপলক , ১৪ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



ওপার বাংলা আর এপার বাংলা মানে কোন দেশের কোন অঞ্চল বোঝায়, সেটা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু দু'বাংলার সংস্কৃতি বেশির ভাগটাই আলাদা। শব্দ উচ্চারন থেকে শুরু করে মন মানসিকতা, পোশাক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×